গণহত্যা লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
গণহত্যা লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

১৫ ডিসেম্বর, ২০০৮

শ্রীরামসি ও রানীগঞ্জের নির্মম হত্যাযজ্ঞের স্মৃতি আজো কাঁদায় জগন্নাথপুরবাসীকে

পাকিস্তানি হানাদারদের হাতে শহীদ হন ১৫৪ বাঙালি

সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি : মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ১৯৭১ সালের ৩১ আগষ্ট সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলার শ্রীরামসি গ্রামে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী যে জঘন্যতম গণহত্যা চালিয়েছিল তা আজও সবার মনে শিহরণ জাগায়। দুটি গ্রাম মিলিয়ে সেদিন পাকিস্তানি হানাদারদেও হাতে নির্মমভাবে শহীদ হন ১৫৪ জন।
এলাকাবাসী জানান, ৩১ আগস্ট বেলা ১০টার দিকে কয়েকটি নৌকা যোগে পাকিস্তানি সেনারা শ্রীরামসি বাজারে এসে আলবদর আল শামসদের এলাকার লোকদের বিদ্যালয়ে উপস্থিত করার জন্য নির্দেশ দেয়। পাকিস্তানি বাহিনীর নির্দেশে দেশীয় রাজাকাররা এলাকার সচেতন ও শিক্ষিত অশিক্ষিত যুবকদের ডেকে একটি রুমে জড়ো করে। সেখানে সবার হাত পেছনে নিয়ে বেঁধে ফেলা হয়। পরে শতাধিক শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী ও যুবককে বেঁধে নৌকায় নিয়ে গিয়ে এক সঙ্গে এলোপাতাড়ি গুলি ছুঁড়ে হত্যা করে পাকিস্তানি হানাদাররা। অন্যান্য দলকেও একইভাবে বেঁধে পার্শ্ববর্তী পুকুর পারে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে ব্রাশ ফায়ার করে পাষাণের মতো হত্যা করে নরপিশাচরা। আহত হয়ে যারা কোনো রকমে বাঁচার তাগিদে পুকুরে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন তাদের ওপরও পুকুর পার থেকে গুলি ছুঁড়ে কাপুরুষের মতো হত্যা করা হয়। শুধুমাত্র বয়সে যারা খুবই বৃদ্ধ তাদের প্রায় অক্ষত অবস্থায় ছেড়ে দেয় হানাদাররা। কেউ কেউ নরপশুদের অত্যাচার থেকে প্রাণ বাঁচাতে গ্রাম ছেড়ে অন্যত্র পালাতে সক্ষম হন।
পাকিস্তানি হানাদারদের নিষ্ঠুর এ হত্যাকাণ্ডে শহীদ হন ১২৪ জন বিভিন্ন বয়স ও পেশার লোক। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছেন শিক্ষক তহশিলদার, পোস্টমাস্টার, ডাক পিয়ন, ইউপি মেম্বার, ছাত্র যুবক, বৃদ্ধ, প্রবাসী ও বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষ। গুটি কতক আহত হয়ে বেঁচে যান। ঘাতকেরা এ বর্বর পৈশাচিক গণহত্যার পরও ক্ষান্ত হয়নি। শুর" করে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ। শ্রীরামসি বাজারে কেরোসিন তেল ছিটিয়ে প্রায় আড়াইশ থেকে তিনশ ঘরবাড়ি দোকানপাট জ্বালিয়ে দেয়। গুলির শব্দে ও আগুনের লেলিহান শিখা দেখে গ্রামবাসী ছুটে পালান। জনশূণ্য অবস্থায়ও পাকিস্তানি হানাদাররা গ্রামে হামলা চালিয়ে ঘরবাড়ি পুড়িয়ে ফেলে। হানাদার সৈন্যরা চলে যাওয়ার পর চারদিকে মৃতদেহ ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে থাকে। ভয়ে আতঙ্কে পালিয়ে যাওয়া গ্রামবাসীর কেউই প্রায় সপ্তাহ খানেক গ্রামে ফেরেননি। তখন শিয়াল, কুকুর ও শকুনেরা লাশ নিয়ে টানাটানি শুর" করে। এরপর আস্তে আস্তে লোকজন গ্রামে এসে ৪/৫ টি করে মৃতদেহ একেক গর্তে কবর দেন। শ্রীরামসি বধ্যভুমিতে শায়িত শহীদদের মধ্যে ৩৪ জনের নাম জানা গেছে। তারা হলেন মৌলানা আব্দুল হাই, সত্যেন্দ্র নাথ চক্রবর্তী, এহিয়া চৌধুরী, আশরাফ হোসেন, শফিকুর রহমান, ফিরোজ মিয়া, সুনু মিয়া, আলা মিয়া, সমুজ মিয়া, নজির মিয়া, আব্দুল মন্নান, ওয়ারিছ মিয়া, মানিক মিয়া, আব্দুল জলিল, দবির মিয়া, মরম উল্লাহ, মন্তাজ আলী, সওয়াব উল্লাহ, রইছ উল্লাহ, আব্দুল মজিদ, আব্দুল লতিফ, এখলাছ মিয়া, মোক্তার মিয়া, সমীর আলী, জহুর আলী, নুর মিয়া, আব্দুল মন্নান, আছা মিয়া, তৈয়ব আলী, রোয়াব আলী, মছদ্দর আলী, তোফাজ্জল আলী, ডা. আব্দুল মন্নান এবং রুপু মিয়া। অন্যান্য শহীদদের নাম পাওয়া যায়নি। গুলিবিদ্ধ হয়েও ঘটনাক্রমে ৮ জন বেঁচে যান। তারা হচ্ছেন জোয়াহির চৌধুরী, আলকাছ মিয়া, কফিল উদ্দিন, তপন চক্রবর্তী, সুন্দর আলী, আমজাদ আলী ও জাফর মিয়া। তারা আজো সেদিনের ঘটনার কথা মনে করে আঁতকে ওঠেন। ইতিহাসের কলঙ্কজনক ও জঘন্যতম এ গণহত্যার সংবাদ এ সময় বিবিসি থেকে প্রচার করে বিশ্ববাসীকে জানানো হয়। একই সময়ে জগন্নাথপুর থানার রাণীগঞ্জ বাজারেও তাণ্ডবলীলা চালায় পাকিস্তানি হানাদাররা। কিছুসংখ্যক আলবদর আলশামস ও রাজাকারদের সাহায্যে বাজারে আগুন জ্বালিয়ে দোকান ঘরবাড়ি ছারখার করে দেয় তারা। নৃশংসভাবে হত্যা করে ৩০ জনের মতো নিরীহ ও শান্তিপ্রিয় বাঙালিকে। মারাত্মক আহত হয়েও বেঁচে যান ৫ জন। প্রায় ২০০ দোকানপাট ভস্মীভূত হয়।
নিষ্ঠুর সে হত্যাযজ্ঞের শহীদদের স্মরণে শ্রীরামসি উচ্চ বিদ্যালয় প্রাঙ্গনে স্থানীয় মুক্তি সংগ্রাম স্মৃতি ট্রাস্ট একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মিত করেছে। প্রতি বছর এখানে শহীদদের স্মরণে বিভিন্ন অনুষ্ঠানমালার আয়োজন করা হয়। তবে শ্রীরামসি গ্রামকে শহীদনগর নামকরণ করতে এলাকাবাসী দীর্ঘদিন ধরে দাবি জানালেও তা আজো বাস্তবায়িত হয়নি।

সূত্র: ভোরের কাগজ, ১৫ ডিসেম্বর, ২০০৮

৫ ডিসেম্বর, ২০০৮

বাংলাদেশ জেনোসাইড স্টাডি গ্রুপ

BGSG বাংলাদেশের গণহত্যা নিয়ে একটি তথ্যসমৃদ্ধ আর্কাইভ তৈরি করেছে। Kean University বাংলাদেশের গণহত্যা নিয়ে নিয়ে কোর্স চালায় তার জন্য এই আর্কাইভের প্রয়োজন। কিন্তু এর পাশাপাশি এরা ইহুদি গণহত্যা ও অন্য গণহত্যা নিয়েও কাজ করার প্রত্যাশা করে। নিউ জার্সির Holocaust Commission এর সাথে এই আর্কাইভ সম্পর্কিত।
নিজেদের সম্পর্কে বর্ণনা করতে গিয়ে বলেছে
The group has Bangladesh genocide as its primary agenda; however, the group will also honor the issue of human rights and genocide in other countries. The goal of this organization is to work with the relevant organizations that work for human rights and voice against crime against humanity. Thus, the study and the work of this group shall not be limited only on Bangladesh Genocide.

BGSG বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন ধরণের সেমিনার, সিরিজ বক্তৃতা, আলোচনা সভা, মুক্তিযুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্থদের সাথে কিংবা তাদের পরিবারের সাথে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা বিনিময়, গণহত্যার ছবি নিয়ে প্রদর্শনীর আয়োজন, ভিডিও প্রদর্শনীর আয়োজন ইত্যাদি পদ্ধতিতে আন্তর্জাতিক বাতাবরণে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য কাজ করে।

বিস্তারিত তথ্যের জন্য BGSG'র ওয়েবসাইট ভ্রমণ করুন।

২২ আগস্ট, ২০০৮

ফয়েজ লেকের হত্যাকান্ড

এই অংশটুকু নেয়া হয়েছে রশিদ হায়দারের এডিট করা “১৯৭১: ভয়াভয় অভিজ্ঞতা” (ঢাকা, জাতীয় সাহিত্য প্রকাশনী, ১৯৮৯) বইয়ের আব্দুল গোফরানের “ফয়েজ লেকের গণহত্যা” অধ্যায় থেকে।

পাহাড়তলির আকবর শাহ মসজিদের কাছে আমার একটা দোকান ছিল। ১০ই নভেম্বর, ১৯৭১ সকাল ৬ টার দিকে প্রায় ৪০-৫০ জন বিহারি আমার দোকানে এসে জোর করে আমাকে নিয়ে যায়। তারা আমাকে ফয়েজ লেকে নিয়ে যায়। সেখানে আমি দেখতে পাই পাম্প হাউজের উত্তর পাশে লেকের ধারে অনেককে হাত বেঁধে রাখা হয়েছে। বিহারিদের হাতে ছুড়ি, তলোয়ার বা শার্প অন্য কোন অস্ত্র ছিলো। বিহারিরা প্রথমে বাঙ্গালিদের মারধোর করছিল আর অস্ত্রধারীদের কাছে নিয়ে যাচ্ছিল। একদল অস্ত্রধারী বিহারিরা অসহায় মানুষগুলোর পেটে ঘুষি মারছিল আর তলোয়ার দিয়ে মাথা বিচ্ছিন্ন করছিল। আমি বেশ কয়েক গ্রুপ বাঙ্গালিকে এভাবে মেরে ফেলতে দেখি। একজন বিহারি আমার দিকে আগায় আর আমার সোয়েটার খুলে নেয়। তখন আমি তাকে ঘুসি মেতে লেকে ঝাঁপ দেই। অন্যপাড়ে যেয়ে আমি খোপের আড়ালে লুকাই। তারা আমার খোঁজে আসলেও আমি ভাগ্যক্রমে লুকিয়ে থাকতে সক্ষম হই। ঝোপের আড়ালে থেকে আমি আরো অনেককে একইভাবে হত্যা করতে দেখি।

দুপুর দুইটা পর্যন্ত এই হত্যাকান্ড চলতে থাকে। এ সময়ের দিকে তারা ১০-১২ জন বাঙ্গালির একটি দলকে আনে। আর তাদেরকে দিয়ে গর্ত খুড়িয়ে লাশগুলো কবর দেয়ায় এবং তাদেরকেও মেরে ফেলে অবশেষে। তারপর আনন্দে চিৎকার করতে করতে বিহারিগুলো চলে যায়। তখনো অনেক লাশ আশেপাশে পড়ে ছিল।

সংগ্রহ করা হয়েছে সামহোয়ারইনব্লগ থেকে।
লিখেছেন: রাশেদ

২১ আগস্ট, ২০০৮

এক মৌলভির কথা

এই অংশটুকু নেয়া হয়েছে Amita Malik's The Year of the Vulture (New Delhi: Orient Longmans, 1972, pp. 102-4) থেকে। এটি শেখ মুজিবের নিজ গ্রামের কাহিনী।

১৯শে এপ্রিল, ১৯৭১ তারিখে সকাল ৮ টার দিকে প্রায় ৩৫ জন আর্মি লঞ্চে করে আমাদের গ্রামে আসে। কিছুদিন আগে আমি শেখের বাবা মাকে বলেছিলাম গ্রাম ছেড়ে যেতে কিন্তু তাঁরা রাজি হন নাই। আর্মিরা এসে আমাকে দেখতে পেয়ে জিজ্ঞাসা করে, এই মৌলভি, শেখের বাবা মা কোন বাড়িতে থাকে। আমি তাঁর বাবাকে ডেকে আনি। আমরা একটা চেয়ার দিয়েছিলাম কিন্তু আর্মিরা তাঁকে মাটিতে বসতে বাধ্য করে। তারপর শেখের মা আমার হাত ধরেন, আর আমি তাঁকে চেয়ারে বসতে সাহায্য করি। আর্মিরা শেখের বাবার পিঠে স্টেন গান আর আমার পিঠে একটি রাইফেল ধরে আর বলে দশ মিনিটের মাঝে তোমাদের মেরে ফেলবো।

তারা শেখের বাড়ি থেকে একটি ডায়েরি আর কিছু ঔষধ নেয়, আর আমার কাছে চাবি খুঁজে। আমি চাবি দিলে তারা ট্রাঙ্ক ভেঙ্গে তল্লাশি চালায়; যদিও পাঁচটি চামুচ ছারা আর কিছুই মেলে নাই। তারা একটি ছবি দেখে আমাকে জিজ্ঞাসা করে এটা কার। শেখ মুজিবের বলায় তারা সেইটাও নিয়ে যায়।

তারা আমাকে রাইফেল দিয়ে মেরে শেখের বাবার পাশে টেনে নেয় আর আবারো মেরে ফেলার হুমকি দেয়। আমি জিজ্ঞাসা করি শেখের বাবাকে কেন মারবে? তারা বলে “"Is lire, keonki wohne shaitan paida kira hai" ["Because he has produced a devil."]” আমাকে কেন মারবা যে কিনা মসজিদের ইমাম? তারা বলে “Aap kiska imam hai? Aap vote dehtehain" ["What sort of an imam are you? You vote."]” ক্যাপ্টেন তখন আরো বলে ৮ মিনিট গেছে আর ২ মিনিট পরে গুলি করা হবে। তখন একজন মেজর দৌড়ে আসে লঞ্চ থেকে আর নির্দেশ দেয় আমাদের না মারার। আর শেখের বাড়ি পুড়িয়ে দেয়া হয়।

আমি সাথে সাথে মসজিদে যায় আর প্রায় ৫০ জনের মত গ্রামবাসীকে দেখতে পাই। আর্মিরা এরই মধ্যে তিনজন বালককে টেনে বের করে গুলি করে মারে। খান সাহেব (শেখ মুজিবের চাচার) একজন কিশোর ভৃত্য ছিল এরশাদ নামে। আর্মিরা আমাকে তার কথা বললে আমি বলি যে সে একজন কাজের ছেলে। কিন্তু তখন এক রাজাকার মৌলভি (পাশের গ্রামের) বলে যে ঐ ছেলেটা শেখ মুজিবের আত্মীয় যা আদতে মিথ্যা ছিল। আর্মিরা এরশাদকেও লাইনে নিয়ে যায়। ছেলেটা পানি খেতে চাইলেও দেয়া হয় নাই। ঢাকা থেকে আসা একটি কিশোর যে সেখানে তার বাবার সাথে কাজ করতো তাকেও মেরে ফেলে আর্মিরা। এরশাদকে তার মায়ের সামনে গুলি করে মারে। গুলির পরে এরশাদ একটু নড়াচড়া করলে আবার তাকে গুলি করে। আর্মিরা ঐদিন মোট ছয়জন নির্দোষ কিশোরকে হত্যা করে কোন কারন ছাড়াই। তোরাব ইয়াদ আলীর মা বারবার বলেও ছেলেকে কবর দেয়ার জন্য নিয়ে যেতে পারেন নি, কারন আর্মিরা চাচ্ছিল এইসব মৃতদেহ দেখিয়ে সবাইকে ভয় দেখাতে। এই বিধবার ১০ বছরের সন্তান মিঠুকেও তারা গুলি করে। কারন ছিল মিঠু মুক্তি বাহিনীকে সাহায্য করেছিল।

সংগ্রহ করা হয়েছে সামহোয়ারইনব্লগ থেকে।
লিখেছেন: রাশেদ

১৬ আগস্ট, ২০০৮

গণহত্যার ভিডিও

সংগ্রহ করা হয়েছে সামহোয়ারইনব্লগ এবং সচলায়তন থেকে। লেখক: রাশেদ

ড. নূরুল উলার ডকুমেন্টারি

এই অংশটুকু নেয়া হয়েছে Amita Malik's The Year of the Vulture (New Delhi: Orient Longmans, 1972, pp. 79-83) থেকে।

শিক্ষকদের অন্তেস্টিক্রিয়ার সময়ে বাংলা ডিপার্টমেন্টের প্রফেসর রফিক উল ইসলাম আমাকে ফিসফিস করে বলেন যে টিভি স্টেশনে একটি ডকুমেন্টারি আছে ২৫ শে মার্চের গণহত্যার। সাথে সাথে আমি জামিল চৌধুরিকে জিজ্ঞাসা করি এই ব্যাপারে। তিনি আমাকে কনফার্ম করেন ব্যাপারটা। তিনি আরো জানান ইঞ্জিনিয়ারিং ইউনিভার্সিটির একজন প্রফেসর এই ভিডিওটি ধারন করেছিলেন। ৫ই জানুয়ারিতে আমি অনুমতি পাই টিভি কেন্দ্রে এই ভিডিওটি দেখার।

প্রায় ২০ মিনিটের এই ভিডিওটিতে দেখা যায় জগন্নাথ হল থেকে লাশ বয়ে কিছু মানুষ বের হচ্ছে। লাশগুলো বেশ সারিবদ্ধভাবে রাখা হয়। এভাবে আস্তে আস্তে লাশের স্তুপ করে ফেলা হয়। শেষ হবার পরে যারা লাশগুলো বয়ে এনেছিল তাদেরকে লাইনে দাঁড় করিয়ে রেখে গুলি করে মেরে ফেলা হয়।

এই ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ (ইলেকট্রিক্যাল ডিপার্টমেন্টের শিক্ষক ড. নূরুল উলার নিজের ভাষায় বলে যাওয়া) লিখেছেন এম. এম. আর. জালাল


গণহত্যার ছবি
নূরুল উলা

একাত্তরের পঁচিশে মার্চ রাতে একটু তাড়াতাড়ি ঘুমাতে গিয়েছিলাম । সেদিন খবরের কাগজে পড়েছিলাম বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে ইয়াহিয়া খানের সমঝোতা আসন্ন । তাই সবাই একটু নিশ্চিন্ত ছিলাম । মাঝরাতে প্রচন্ড এক বিস্ফোরণে ঘুম ভেঙ্গে গেল।

একটু বিরতির পরই শুরু হলো অবিরাম গোলাগুলি আর মর্টারের আওয়াজ । আমরা সবাই শোবার ঘর আর বাথরুমের মাঝামাঝি প্যাসেজে আশ্রয় নিলাম ছিটকে-আসা কোনো বুলেট থেকে রক্ষা পাবার আশায় । একটু পরে কৌতূহল সংবরণ করতে না পেরে হামাগুড়ি দিয়ে জানালার কাছে গিয়ে বাইরে কি হচ্ছে তার একটা আভাস নেবার চেষ্টা করলাম।

আমি তখন থাকতাম ফুলার রোডে পুরাতন এ্যাসেম্বলি হলের উল্টোদিকে, প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকদের তৈরী চারতলার ফ্লাটে । আমার জানালা থেকে জগন্নাথ হল ছাত্রাবাস আর তার বিরাট মাঠ সরাসরি চোখে পড়ে । সে রাত ছিলো নিশ্ছিদ্র অন্ধকার, কিন্তু তার মাঝেও বুঝলাম জগন্নাথ হল ছাত্রাবাস আর তার চারপাশের রাস্তাগুলো মিলিটারি ছেয়ে গেছে । কিছু পরে দেখলাম হলের কতকগুলো ঘরে আগুন ধরে গেল । সেই আলোয় আবার দেখলাম কিছুসংখ্যক সৈন্য টর্চ হাতে প্রতিটি ঘরে তল্লাশি চালাচ্ছে । বেশিক্ষণ তাকাবার ভরসা পেলাম না । করিডোরে ফিরে এসে গোলাগুলির শব্দের মধ্যেই জেগে সারারাত কাটিয়ে দিলাম।

ভোর হতেই আবার উঁকি মেরে দেখলাম, কোথাও কাউকে চোখে পড়লো না; কেবল রাস্তায় পড়ে আছে অনেক ইটের টুকরো আর মাঠের ওপর বিছানো দুটো বড় বড় সাদা চাদর । কিছুটা আশ্বস্ত হলাম এই ভেবে যে তেমন বেশি খুন-জখম হয়তো হয়নি।

কিন্তু এরপরই যে দৃশ্যের অবতারণা হলো; কোনদিন কল্পনা করিনি সে দৃশ্য আমাকে জীবনে কখনো দেখতে হবে; আর কামনা করি, এরকম ভয়াবহ ঘটনা যেন কাউকে স্বচক্ষে দেখতে না হয়।

তখন বেশ সকাল হয়ে গেছে। মাঠের পশ্চিমদিকে অর্থাৎ যেদিকে জগন্নাথ হলের প্রধান ছাত্রাবাস, সেদিক থেকে হঠাৎ আবির্ভূত হলো জনাবিশেক পাকিস্তানী সৈন্য, সঙ্গে দু'জন আহত ছাত্র। ছেলে দুটোকে সৈন্যরা বেশ যত্ন করেই কাঁধে ভর দিয়ে এনে চাদর দুটোর পাশে বসাল– মনে হলো হাসপাতালে নিয়ে যাবে। একটু পরই চাদর দুটো টেনে সরিয়ে ফেলল – দেখলাম চাদর দিয়ে ঢাকা ছিলো বেশ কয়েকটি মৃতদেহ।

আহত ছেলে দুটো বসেছিলো পূর্ব দিকে মুখ করে, লাশগুলো তাদের পেছনে। দুজন সৈন্য আরেকটু পূর্বে সরে গিয়ে তাদের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে তাদের দিকে উচিয়ে ধরলো হাতের রাইফেল – কয়েক মুহূর্তের জন্য দেখলাম ছেলে দুটো হাত বাড়িয়ে কাকুতি-মিনতি করছে। তার পরই চললো গুলি।

কোন সৈন্য দুটো কিংবা তিনটার বেশী গুলি খরচ করেনি। শেষের গুলিটা করলো শুয়ে থাকা লাশের ওপর মৃত্যু সুনিশ্চিত করার জন্য। ওদের হাতে যে আগ্নেয়াস্ত্র ছিলো সেটা মাঝারি ধরনের আর তা থেকে যে গুলি বেরিয়েছে তার শব্দ তেমন প্রচন্ড নয়।

জীবনে এই প্রথম স্বচক্ষে মানুষ মারা দেখলাম, আর সেটাও আহত লোককে ঠান্ডা মাথায় গুলি করে মারা। মানসিক শক পূর্ণভাবে উপলদ্ধি করার আগেই নিজের নিরাপত্তার কথা ভাবতে হলো - কারণ তখন রাস্তা দিয়ে সামরিক গাড়ী মাইকে কারফিউ এর ঘোষণা প্রচার করতে করতে গেল আর সেই সঙ্গে জানিয়েও গেল কেউ যেন জানালা দিয়ে বাইরে না তাকায় । কিন্তু তাকানো বন্ধ করলাম না, কারণ আমার দৃঢ় বিশ্বাস ছিলো যে, যদি জানালার কাঁচ বন্ধ রাখি আর ঘরে কোন আলো জ্বালানো না থাকে তাহলে বাইরে থেকে কিছু দেখা যাবে না। কেবল আশা করছিলাম সবচাইতে খারাপ যা হবার তা হয়ে গেছে, আর কিছু ঘটবে না, আর কিছু দেখতে হবে না। তখনও জানতাম না এ কেবল আরম্ভ।

অল্পক্ষণ পরে, কিছু সৈন্য আরো কয়েকজন আহত লোক নিয়ে এলো, এবারও পশ্চিম দিকের ছাত্রাবাস থেকে । তাদের ঠিক আগের মতন অর্থাৎ লোকগুলোর কাছে নিয়ে এসে আগ্নেয়াস্ত্র উঁচিয়ে ধরল। তারপর শুরু হলো গুলি, অনেকটা এলোপাথাড়ি। কেউ বসে ছিল, কেউ দাঁড়িয়ে, তাদের ওপর সামনে, বেশ কাছাকাছি থেকে গুলি চালাচ্ছে । আর পেছন থেকে উঠছে ধূলি । বুঝলাম কিছু গুলি দেহ ভেদ করে মাটিতে ঠেকছে। মাঠের ওপর পড়ে থাকা লোকের সংখ্যা বাড়তে থাকল।

পরবর্তীকালে বিদেশী টেশিভিশনের সাংবাদিকরা আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, সেই সময় আমার মানসিক অবস্থা কেমন ছিল, আর কি করে আমার মাথায় এই হত্যাকান্ডের ছবি তোলার চিন্তা মাথায় এল। আসলে ছবি তোলার আইডিয়া আমার নয়। পর পর দু”বার এভাবে আহত আর নিরস্ত্র মানুষদের ঠান্ডা মাথায় খুন করা দেখে বুঝলাম আরো খুন হবে, আজ একটা সামগ্রিক গণহত্যা হবে। তখন বোকার মত বলে উঠলাম - আমাদের হাতেও যদি অস্ত্র থাকতো। তখন পাশ থেকে আমার চাচাতো ভাই নসীম বলে উঠলো - ভাইজান, ছবি তোলেন।

তখন মনে পড়লো আমার বাসায় ভিডিও ক্যামেরাসহ একটা ভিসিআর আছে। জাপানে তৈরী প্রাথমিক যুগের এই পোর্টেবল ভিসিআর ছিল বেশ ভারি আর আমার জানামতে দেশে প্রথম। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ক্যামেরা সেট করে একটা কালো কাগজ ফুটো করে ক্যামেরার লেন্সটা তার মাঝে গলিয়ে দিয়ে জানালার কাচের ওপর রাখলাম। ঠিক যতটুকু ক্যামেরার লেন্স, বাদবাকী পর্দা দিয়ে ঢাকা থাকল আর জানালা সামান্য ফাঁক করে সরু মাইক্রোফোনটা একটু বের করে রাখলাম । ইতোমধ্যে আরো-দুটো ব্যাচকে ধরে এনে হত্যা করা হয়েছে। ছবির রেকর্ডিং-এ ধরা পড়েছে বাদবাকী তিনটি গণহত্যা। এর মধ্য সবচাইতে ভয়াবহ ছিল শেষেরটি।

তখন বন্দী আনা শুরু হয়েছে মাঠের পূর্বদিক থেকে। যাদের নিয়ে আসা হচ্ছে তাদের পরনে লুংগী, গেঞ্জি অথবা খালি গা। বুঝলাম সব ঘুমন্ত অবস্থায় ধরা পড়েছে। আগের লাশগুলোর কাছে নিয়ে এসে ওদের ওপর গুলি করা হচ্ছে।

এরপর মাঠ হঠাৎ করে ফাঁকা হয়ে গেল। ইতোমধ্যে মাঠে বেশ কিছু লাশ জমে উঠেছে । ভাবলাম এবার বুঝি এই হত্যাযজ্ঞের শেষ। কিন্তু না, একটু পরে দেখলাম প্রায় জনা চল্লিশেক অস্ত্রধারী সৈন্য মাঠের উত্তরদিকে লাইন করে দাঁড়াল। এরা ছিলো লম্বা আর ফরসা, মনে হলো পাঞ্জাবী সৈন্য। এরা কিন্তু কখনই প্রত্যক্ষভাবে হত্যাকান্ডে অংশগ্রহণ করেনি। যারা গুলি চালিয়েছিলো তারা ছিল অপেক্ষাকৃত বেঁটে আর কালো। এবার এমনি ধরনের জনা-দশেক সৈন্য মাঠের পূর্বদিক থেকে আবির্ভূত হল, সঙ্গে প্রায় পঁচিশ-ছাব্বিশজন মানুষ। ভাবলাম বোধ হয় লাশ সরাবার জন্য এনেছে।

কিন্তু মানুষগুলো পড়ে থাকা লাশগুলোর কাছে আসার সাথে সাথে ওদের সঙ্গের সৈন্যরা আবার একটু পূর্বদিকে সরে গিয়ে রাইফেল তাক করল। কিছুক্ষণের জন্য চারদিক স্তব্ধ। এর মধ্যে দেখলাম একজন লোক, মুখে তার দাড়ি, হাঁটু গেড়ে বসে করজোরে প্রাণভিক্ষা চাইছে। তারপরই শুরু হলো গুলি। গুলির পর গুলির বর্ষণ হচ্ছে আর মানুষগুলো মাটিতে লুটিয়ে পড়ছে আর তাদের দেহ-ভেদ-করা গুলির আঘাতে মাঠ থেকে উঠছে ধূলা।

গুলি যখন থামলো দেখলাম একমাত্র দাড়িওলা লোকটা তখনো বেঁচে আছে। মনে হলো ওর দিকে সরাসরি কেউ গুলি চালায়নি । লোকটা আবার হাতজোড় করে প্রাণভিক্ষা চাইতে শুরু করল। একজন সৈন্য তার বুকে লাথি মেরে তাকে মাটিতে শুইয়ে দেবার চেষ্টা করল। কিন্তু লোকটা তবু হাঁটু গেড়ে রইল । তখন তার ওপর চালালো গুলি। তার মৃতদেহ আর সবার সাথে একাকার হয়ে গেল।

মাঠের উত্তরদিকে যে সৈন্যরা এতক্ষণ লাইন দিয়ে দাঁড়িয়েছিল তারা এখন সংঘবদ্ধভাবে চলে গেল। আর হত্যাকান্ডে অংশগ্রহণকারী সৈন্যদের কেউ কেউ পড়ে থাকা দেহগুলোর চারপাশে ঘুরে ঘুরে মনোযোগের সঙ্গে দেখল আর মাঝে মাঝে শেষবারের মতো গুলি করল মৃত্যু নিশ্চিত করার জন্য।

কিছুক্ষণ পর সব সৈন্য চলে গেল। চারদিক নিস্তব্ধ আর ফাঁকা, কেবল জগন্নাথ হলের মাঠের ওপর পড়ে আছে অসংখ্য লাশ। দেখলাম রাস্তার ওপর দিয়ে একটা ভ্যান চলে গেল, তার ওপরে একটা গোল এন্টেনা ঘুরছে। বুঝলাম মাইক্রোওয়েভ ডিটেক্টর, কেউ কোন কিছু ব্রডকাস্ট করছে কিনা ধরার জন্য। আমি জানি আমার ভিডিও ক্যামেরা থেকে সামান্য কিছু তরঙ্গ ছড়াতে পারে, তাই তাড়াতাড়ি সেটা অফ করলাম।

ভিডিও টেপ রিওয়াইন্ড করে চেক করে যখন দেখলাম সব ছবি ঠিকমতো উঠেছে তখন সেটা খুলে ভিতর থেকে যন্ত্রাংশ সরিয়ে নিয়ে সেটাকে অকেজো করে দিলাম। বেলা তখন দশটার বেশী হবে না। যেকোনো সময় আমাদের ওপর হামলা হতে পারে আশঙ্কায় ওখানে বেশিক্ষণ থাকা সমীচীন মনে করলাম না। কারফিউ সত্ত্বেও আমরা আত্মীয়-স্বজন ও পরিবার নিয়ে এলাম পুরনো ঢাকায়। আসার ঠিক পূর্ব মুহূর্তে অর্থাৎ বেলা একটার দিকে একটা বুলডোজার দিয়ে মাটি খুঁড়তে দেখেছি। কিন্তু তারপর সেখানে কি হয়েছে বলতে পারব না । অনুমান করি, লাশগুলো পুঁতে ফেলার উদ্দেশ্যেই মাটি খোঁড়া হচ্ছে। স্বাধীনতা লাভের পর জেনেছি, আমার অনুমান ছিলো সত্যি।

১৫ আগস্ট, ২০০৮

একাত্তরের নারী নির্যাতন ও গণহত্যা

সংগ্রহ করা হয়েছে সামহোয়ারইনব্লগ থেকে।
লিখেছেন: রাশেদ

নিচের লেখাটি Century of Genocide: Eyewitness Accounts and Critical Views By Samuel Totten, William S. Parsons and Israel W. Charny (New York: Garland Publishing, 1997) বইয়ের দশম চাপ্টার (পৃ. ২৯১-৩১৬) থেকে অনুবাদ করা ও সংক্ষেপিত। এই চাপ্টারের নাম Eyewitness Accounts: Genocide in Bangladesh by Rounaq Jahan.

এই চাপ্টারে একাত্তরের গণহত্যার বেশ কিছু সাক্ষীর কথা বলা হয়েছে। প্রথম দুই অংশে ২৫ শে মার্চ কালো রাতে ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে ঘটে যাওয়া হত্যাকান্ডের সাক্ষী দুইজনের কথা বলা হয়। একজন ছিলেন জগন্নাথ হলের ছাত্র আর অন্যজন বুয়েটের একজন টিচার। ৩য় ও চতুর্থ সাক্ষী বর্ণনা দেন পাকিস্তানিদের নারী নির্যাতনের। আর পঞ্চম সাক্ষী এক গ্রামে ঘটে যাওয়া কিছু নিরপরাধ কিশোর হত্যার কিছু বিবরন তুলে ধরেন। আর শেষ সাক্ষীর কথা থেকে বিহারীদের কিছু তান্ডবলীলার কথা জানা যায়।


জগন্নাথ হলের হত্যাকান্ড

এই অংশটুকু নেয়া হয়েছে রশিদ হায়দারের এডিট করা “১৯৭১: ভয়াভয় অভিজ্ঞতা” (ঢাকা, জাতীয় সাহিত্য প্রকাশনী, ১৯৮৯) বইয়ের কালি রঞ্জনশীলের “জগন্নাথ হলে ছিলাম ” অধ্যায় থেকে (পৃ. ৫)।

আমি দক্ষিন ব্লকের ২৩৫ নাম্বার রুমে ছিলাম। ২৫ তারিখ রাতে গোলাগুলি আর বোমা-শেল ফাটার শব্দে আমার ঘুম ভেঙ্গে যায়। হতভম্ব হয়ে চিন্তা করছিলাম কি করা যায়। তারপর আমি ছাত্র সংসদের জেনারেল সেক্রেটারি সুশীলের কাছে যাবার জন্য ক্রল করে ৪র্থ তলায় উঠলাম। তার রুমে আরো কিছু ছেলে এরই মধ্যে এসে পড়েছিল কিন্তু সুশীল তখন রুমে ছিল না। ছাত্ররা আমাকে বলল ছাদে যেতে যেখানে আরো বেশ কিছু ছেলে আশ্রয় নিয়েছিল। কিন্তু আমি (হয়ত কিছুটা স্বার্থপরের মত) ভাব্লাম নিজের মত করে থাকি; আর তাই চতুর্থ তলার উত্তর কোনার দিকে চলে গেলাম আস্তে আস্তে ক্রল করে। জানাল দিয়ে আমি দেখছিলাম আর্মিরা সার্চলাইট দিয়ে ছাত্রদের খোঁজে রুমে রুমে তল্লাশি চালাচ্ছিল। আর খুঁজে পেলেই তাদেরকে শহীদ মিনারের কাছে নিয়ে যেয়ে গুলি করছিল। পাকিস্তানি আর্মিরা মাঝে মাঝেই মর্টার ব্যবহার করছিল হলের দিকে তাক করে। অ্যাসেম্বলির সামনের টিন শেড আর উত্তর ব্লকের বেশ কিছু রুমে আগুনও ধরিয়ে দেয় তারা।

কিছু সময় পরে ৪০-৫০ জন পাকিস্তানি আর্মি দক্ষিণ ব্লকে আসে আর ডাইনিং রুমের জানালা ভেঙ্গে ভিতরে প্রবেশ করে। আর লাইট জ্বালিয়ে যেসব ছাত্র সেখানে আশ্রয় নিয়েছিল তাদের উপরে গুলি বর্ষণ করে। আর্মিরা যখন সেই রুম থেকে বের হয়ে আসে, তখন তারা হলের কেয়ারটেকার প্রিয়নাথদাকে মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে বিভিন্ন রুমের দিকে নিয়ে যাচ্ছিল। সেই সময়ে আমি তাদের দেখতে পারছিলাম না কারন আমি বাথরুম থেকে বের হয়ে ৪র্থ তলার সানশেডে লুকিয়েছিলাম। কিন্তু গোলাগুলির শব্দ, ছাত্রদের আহাজারি আর আর্মিদের ভাংচুরের শব্দ ঠিকই শুনতে পাচ্ছিলাম।

আর্মিরা চলে গেলে আমি আবার বাথরুমে এসে লুকাই। জানালা দিয়ে দেখতে পেলাম সলিমুল্লাহ হলেও আগুব জ্বলছে। শহরের উত্তর আর পশ্চিমাংশও জ্বলছিল।

সকাল বেলাতে ছাত্রদের গলার আওয়াজ পেয়ে আমি বের হই। দেখি কিছু ছাত্র প্রিয়নাথদার মৃতদেহ বয়ে নিয়ে যাচ্ছে নিচের দিকে আর আর্মিরা তাদের পাহারা দিচ্ছে। আর্মিরা আমাকেও বলে ছাত্রদের সাহায্য করার জন্য। হল থেকে মৃতদেহগুলো নিয়ে নিয়ে আমরা বাইরের মাঠে জড়ো করছিলাম। সেই সময়ে আমরা কয়েকজন ছিলাম ছাত্র, কয়েকজন মালি, গেট রক্ষকের দুই ছেলে আর বাকিরা ছিল পয়পরিস্কারকারী। পয়পরিস্কারকারীরা আর্মিদের বলল যে তারা তো বাঙ্গালি না, তাদের যেন যেতে দেয়া হয়। আর্মিরা তাদের আমাদের কাছ থেকে আলাদা করে নেয়। আর্মিরা সারাক্ষণ আমাদের লাথি মেরেছিল আর চিৎকার করছিল “"We will see how you get free Bangladesh! Why don't you shout Joy Bangla”। আমাদের তিনটি গ্রুপে ভাগ করে আমি যেই গ্রুপে ছিলাম সেটাকে নিয়ে তারা ইউনিভার্সিটির কোয়ার্টারে যায় আর পাঁচ তলার সবগুলো রুম চেক করে এবং মূল্যবান জিনিসপত্র সব লুট করে। নিচের তলায় আমরা স্তপ করে রাখা মৃতদেহ দেখেছিলাম বেশ কিছু।

ফিরে আসার পরে আমাদের দিয়ে মৃতদেহগুলো শহীদ মিনারে নিয়ে আগে থেকেই সেখানে রাখা আরো অনেক মৃতদেহের সাথে জড়ো করায়। আমার সাথী ও আমি যখন সুনীলদার (হলের গার্ড) মৃতদেহ বয়ে নিচ্ছিলাম তখন পাশের বস্তি থেকে মহিলাদের চিৎকার শুনতে পাই। আর্মিরা ঐসময়ে পয়পরিস্কারকারীদের উপরে গুলিবর্ষণ করছিল। আমি বুঝলাম যে আমাদেরও সময়ে এসেছে কারন যারা আমাদের আগে লাইনে ছিল তাদেরকে একসারিতে দাড় করিয়ে আর্মিরা গুলি করছিল। আমি ঐসময়ে দেখেছিলাম ড. দেবের (ফিলোসফি বিভাগের প্রফেরস) মৃতদেহ। আমি তখন ওনার মৃতদেহের পাশে শুয়ে পড়ি সুনীলদার লাশ ধরে থাকা অবস্থায় আর গুলির অপেক্ষায় থাকি। কিছুক্ষণ পরে চোখ মেলে দেখি তারা সবাই চলে গেছে।

তারপর আমি যাই পাশের বস্তিতে। সেখানে ইদু ভাই (পুরান বই বিক্রেতা) আমাকে অভয় দেন। তারপর পুরান ঢাকা হয়ে নদী পার হয়ে (মাঝি টাকা নেন নাই) শিমুলিয়া, নওয়াবগঞ্জ হয়ে আমি এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে বরিশালে আমার গ্রামে চলে আসি।

জনপ্রিয় পোস্টসমূহ