রাজনীতি লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
রাজনীতি লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

২ সেপ্টেম্বর, ২০০৮

স্বাধীনতা- মার্চের দিনগুলি ও ৭ মার্চের বিতর্ক

নির্মল সেন

১ মার্চ ১৯৭১ সাল। প্রেস ক্লাবে বসেছিলাম। হঠাৎ শুনলাম একটি কণ্ঠ। সেই কণ্ঠের অধিকারী প্রেস ক্লাবে ঢুকেই বলল, ‘সর্বনাশ হো গিয়া।’ আমি তার দিকে তাকালাম। সে লোকটি আর কেউ না, পাকিস্তান ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি আসরার আহমদ। তখন সারা পাকিস্তানে এই ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নই একমাত্র অবিভক্ত ছিল। আমি আসরারের দিকে তাকালাম, বললাম ‘কেয়া হুয়া?’ আসরার সবেমাত্র পিআইএ বিমানে রাওয়ালপিন্ডি থেকে ঢাকায় পৌঁছেছে। সে বলল, পাকিস্তানে প্রেসিডেন্ট আগা মোহাম্মদ ইয়াহিয়া জাতীয় সংসদের অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করেছে। এর ফল যে ভালো হবে না তা সবাই জানে। ৭ ডিসেম্বর নির্বাচন হয়েছে, শেখ মুজিবুর রহমান সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা নির্বাচিত হয়েছেন। তারই প্রধানমন্ত্রী হওয়ার কথা। কিন্তু প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া নানা টালবাহানা করে শেখ সাহেবকে মন্ত্রিসভা করতে ডাকছেন না। কারণ পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর অন্য একটি ধারণা এবং পরিকল্পনা ছিল। সেনাবাহিনী ভেবেছিল, শেখ সাহেব নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে না। বাকি দলগুলো সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে। তাই তাদের কাছে নির্বিঘ্নে ক্ষমতা হস্তান্তর করবে। কিন্তু জনতার রায় ছিল ভিন্ন। তারা শেখ সাহেবকে সংখ্যাগরিষ্ঠতা দিল। কিন্তু সামরিক বাহিনী শেখ সাহেবকে ক্ষমতা দিতে রাজি নয়। তাই নানা টালবাহানা শুরু করেছিল। সর্বশেষ ইয়াহিয়া বলেছিল, ৩ মার্চ জাতীয় সংসদের অধিবেশন বসবে। কিন্তু সেই অধিবেশন না বসার খবর নিয়েই বিভ্রান্ত হয়ে আসরার ঢাকায় এসেছিল।
এছাড়া আসরারের ঢাকা আসার অন্যতম কারণ ছিল, এ পরিস্থিতিতে কি করা যায়, তা পরামর্শ করতে হবে। তার সাধারণ সম্পাদক মিনহাজ বার্না পাকিস্তান টাইমসের প্রতিনিধি। তিনি ঢাকায় থাকেন। তার সঙ্গে আলাপ করতে হবে। আর ইউনিয়নের প্রধান নেতা হলো খন্দকার গোলাম মোস্তফা, যিনি সমধিক কেজি মোস্তফা নামে পরিচিত। তার সঙ্গে পরামর্শ না করে ইউনিয়ন চলতে পারে না। এই দুই কারণে আসরার ঢাকায় এসেছিল। কেজি মোস্তফা যে সারা পাকিস্তানের সাংবাদিকদের মধ্যে এত জনপ্রিয় তা বোঝাতে হলে একটি ঘটনার কথা বলি।

পাকিস্তানের শেষ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের সম্মেলন বসেছে ইসলামাবাদে। তখন ইউনিয়নে আলোচনা চলছিল, প্রুফ রিডার ও কাতিবদের ইউনিয়নে সদস্য পদ দেওয়া হবে কি-না। পূর্ব পাকিস্তানে প্রুফ রিডাররা আগেই ইউনিয়নের সদস্য ছিল। কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তানে কাতিবরা ছিল না। রাওয়ালপিন্ডি সম্মেলনে আমি একটি প্রস্তাব তুললাম, এবারে কাতিবদের ইউনিয়নের সদস্যপদ দেওয়া হোক। পশ্চিম পাকিস্তানের সদস্যরা একযোগে চিৎকার করে উঠল, না হবে না। আমি বললাম আপনারা কি জানেন আমার প্রস্তাবের সমর্থক কেজি মোস্তফা। এ কথা শুনে সবাই চুপ করে গেল। সবাই পরে বলল তোমার প্রস্তাব এক বছরের জন্য স্থগিত থাক। শুধু কেজি মোস্তফা নামের গুণে এটা সম্ভব হয়েছিল। এ ধরনের ছিল সারা পাকিস্তানের সাংবাদিকদের মধ্যে কেজি মোস্তফার জনপ্রিয়তা। আজকে কেজি মোস্তফা ঢাকায় থাকেন। মাঝেমধ্যে বিভিন্ন পত্রিকায় লেখালেখি করেন। তবে ইয়াহিয়ার ঘোষণায় যে প্রতিক্রিয়া হলো তা আমরা অচিরেই টের পেলাম। সেদিন দুপুরে হোটেল পূর্বাণীতে আওয়ামী লীগের সংবাদ সম্মেলন ছিল। সে সম্মেলন ছাত্র এবং জনতা, অফিস কর্মচারীসহ সবাই ঘেরাও করল। তাদের দাবি এখনি বাংলাদেশ স্বাধীন করতে হবে। সমস্ত বাংলাদেশে আকাশ-বাতাস মথিত হলো একটি শ্লোগানে। সেই শ্লোগানটি হলো বাংলাদেশের স্বাধীনতা চাই; স্বাধীন বাংলা চাই। অবাঙালিদের সঙ্গে আমরা থাকব না। সেদিন বুঝিয়ে-সুঝিয়ে জনতাকে শেখ সাহেব নিবৃত্ত করলেন। বলা হলো, রেসকোর্সে ৭ মার্চ শেখ সাহেব ভাষণ দেবেন। আমরা সেই ৭ মার্চের ভাষণের জন্য গভীর প্রতীক্ষায় ছিলাম। এর মধ্যে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ স্বাধীনতা ঘোষণা পাঠ করেছে। স্বাধীনতার পতাকা উত্তোলন করেছে। শেষ পর্যন্ত ৭ মার্চ এলো। তারপর ৭ মার্চ রেসকোর্স লোকে লোকারণ্য। দক্ষিণ রমনা কালীবাড়ি, উত্তরে ঢাকা ক্লাব, মানুষ যেন উপচে পড়ছে। চারদিক মানুষ যেন আসছে আর আসছে। সবার হাতে লাঠি। এ যেন রেসকোর্সে যুদ্ধ করে বাংলাদেশ স্বাধীন করবে। সবার কণ্ঠে স্বাধীনতা চাই। আজকে এ মুহূর্তে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা চাই, মঞ্চে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতারা। তাদের কণ্ঠে আমাদের নেতা পাকিস্তানের পার্লামেন্টে যাবেন না। শেখ মুজিব পাঞ্জাবিদের পার্লামেন্টে যাবেন না। পাঞ্জাবিদের পার্লামেন্ট মানি না মানি না, সবাই হাতে অস্ত্র ধর বাংলাদেশ স্বাধীন কর।
শেখ সাহেব জনসভায় আসার আগেই জনসভা মুখরিত হয়ে উঠল। এক দফা এক দাবি, বাংলাদেশের স্বাধীনতা। আমাদের নেতা পাঞ্জাবিদের পার্লামেন্টে যাবেন না।

এর মধ্যে শেখ সাহেব জনসভায় এসে পৌঁছলেন। তখন লাখ জনতার কণ্ঠে বাংলাদেশের স্বাধীনতার দাবি, তারা বারবার বলছে, পাঞ্জাবিদের পার্লামেন্টে আমাদের নেতা যাবেন না। এরপর বজ্রনির্ঘোষের মতো গগনবিদারী কণ্ঠে তার ভাষণ শুরু করলেন। এমন সুলিখিত ভাষণ কোনোদিন শুনিনি। কি ভাষণ? আর শেখ সাহেবের কি গগনবিদারী কণ্ঠ? গোটা জনসভায় এক উন্মাদনা সৃষ্টি করল। শেখ সাহেবের ভাষণের মাঝে মাঝে পেছনের দিকে তাকাচ্ছিলেন। পেছনে ছিল ছাত্রলীগ নেতারা। তিনি এবারের সংগ্রাম, মুক্তি সংগ্রাম বলে একটু থামলেন এবং পেছনে ছাত্রলীগ নেতা সিরাজুল আলম খানের কাছে কি যেন জিজ্ঞাসা করলেন। তারপর তিনি বললেন, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। জয় বাংলা, জয় পাকিস্তান। শেখ সাহেবের মঞ্চে সামনের সারিতে চেয়ারে আমি ও আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী বসে ছিলাম, যেন মন্ত্রমুগ্ধের মতো। শেখ সাহেবের ভাষণের প্রতিটি অক্ষর গোগ্রাসে গিলছিলাম। এরপর সভা ভাঙল। জনতার একটি অংশের মনে যেন কিছু না পাওয়ার ক্ষোভ থেকে গেল। তারা সবাই ওইদিনই চেয়েছিল শেখ সাহেব স্বাধীনতা ঘোষণা করুক। কিন্তু তা শেখ সাহেবের পক্ষে আদৌ সম্ভব ছিল না। তিনি অনুভব করেছিলেন, সংগ্রামের সময় উপস্থিত না-ও থাকতে পারেন। এই দুরদৃষ্টির ফলে তিনি বলেছিলেন আমি যদি নির্দেশ দিতে না পারি তাহলে তোমাদের কাছে নির্দেশ রইল যার যা আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করবে। এরচেয়ে স্বাধীনতা সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ার আর কি নির্দেশ থাকতে পারে? আজকে যারা বলেন, শেখ সাহেব সেদিন স্বাধীনতার ঘোষণা দেননি, তারা কি বলতে পারেন এর চেয়ে স্বাধীনতার ঘোষণা বেশি কী হতে পারে? আজকেও একদল লোক বলেন, জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন। সেই স্বাধীনতার ঘোষক সম্পর্কে আমি বলতে চাই, স্বাধীনতার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে নির্মাণ করেছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি সব তৈরি করে গিয়েছিলেন এবং সে ক্ষেত্রে জিয়াউর রহমান নিশ্চয়ই সাহস দেখিয়েছেন। কিন্তু সে সাহস হলো একজন বেতার ঘোষকের সাহস। তার আগে এবং পেছনে সবকিছু প্রস্ট‘ত করে রেখেছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান। তবে একথা সত্য, শেখ সাহেব ৭ মার্চের বক্তব্যের শেষদিকে বলেছিলেন, ‘জয় বাংলা, জয় পাকিস্তান’।

আমি জানি, আমার এ বক্তব্য নিয়ে বিতর্ক আছে, কানাডা থেকে একদল ছেলে লিখে জানিয়েছেন, আপনি মিথ্যা লিখেছেন। কানাডা কেন? ঢাকারও অধিকাংশ লোকের বিশ্বাস আমি মিথ্যা বলেছি। তবে আমার দৃঢ় বিশ্বাস, আমার স্মৃতি আমাকে বিভ্রান্ত করেনি। এবং আমার মতে, সেদিন জয় পাকিস্তান বলে শেখ সাহেব সঠিক কাজ করেছিলেন। একজন বিজ্ঞ রাজনীতিবিদ হিসেবে পরিচয় দিয়েছিলেন। ৭ মার্চের ভাষণ সম্পর্কে আমি একটি ভিন্ন কথা শুনেছি। বিশেষ করে বামপন্থী মহল এটা বলেছে। তারা সমালোচনা করেছে, শেখ সাহেব স্বাধীনতা ঘোষণা দিলেন না কেন? আবার একই মুখে বলেছেন শেখ সাহেব বুর্জোয়া নেতা। তিনি কিছুতেই স্বাধীনতা ঘোষণা দিতে পারেন না। আমার মত হচ্ছে, জয় পাকিস্তান না বলে কোনো উপায় ছিল না। তখনো আলোচনা শেষ হয়নি। ক’দিন পর ইয়াহিয়াদের সঙ্গে আলোচনা করার কথা। একটি লোকও স্বাধীনতা সংগ্রামের জন্য প্রস্তুত নয়। সেদিন যদি জয় পাকিস্তান না বলে শুধু ‘জয় বাংলা’ বলতেন এবং স্বাধীনতার ঘোষণা দিতেন তাহলে ইয়াহিয়া বাহিনী মারমুখী আক্রমণ করত। লাখ লাখ লোক প্রাণ হারাতো। তখন এই মহলটিই বলত জনতাকে কোনো প্রস্তুত না করে এ ধরনের স্বাধীনতা ঘোষণা বালখিল্যতা। এ জন্যই অসংখ্য লোকের প্রাণহানি হয়েছে এবং এর জন্যই শেখ মুজিবের বিচার হওয়া উচিত।

এছাড়া জয় পাকিস্তান বলা সম্পর্কে আমার সঙ্গে শেখ সাহেবের আলাপ হয়েছিল। আমি বললাম, আপনি জয় পাকিস্তান বললেন কেন? শেখ সাহেবের মুখ কালো হয়ে গেল। এরপর তিনি বললেন, ‘আমরা খাবার টেবিলে ছেলেমেয়ে সবাই খেতে বসতাম। প্রথমে আমরা এক হাতের পাঁচটি আঙ্গুল অপর হাতের একটি আঙ্গুল অর্থাৎ ছয়টি আঙ্গুল দেখাতাম। অর্থাৎ এই ছয়টি আঙ্গুল ছিল ছয় দফা। পরে পাঁচটি আঙ্গুল নামিয়ে ফেলতাম। বাকি থাকত একটি আঙ্গুল। অর্থাৎ এক দফা। অর্থ হচ্ছে ছয় দফার শেষ কথা হচ্ছে এক দফা বাংলাদেশের স্বাধীনতা। সেদিন পাঁচ আঙ্গুল নামিয়ে ফেলার পর আমার কনিষ্ঠপুত্র রাসেল জিজ্ঞাসা করেছিল। তুমি আজকের জনসভায় জয় পাকিস্তান বলতে গেলে কেন?

আমি কি রাসেলের প্রশ্নের জবাব আপনাকে দেব? আমাকে স্বাধীনতার ঘোষণা দিতে হলে অনেক পথ অতিত্রক্রম করতে হবে। ইয়াহিয়ার সামরিক সরকারকে শেষ কথা বলতে হবে। পশ্চিম পাকিস্তানের নেতাদের সঙ্গে কথা বলতে হবে। সবচেয়ে ভয়াবহ হচ্ছে ভুট্টো। তার সঙ্গেও কথা বলতে হবে। আমি এই আলোচনা শেষ না করে কিছু করলে পৃথিবীতে আমি জবাবদিহি করতে পারব না। আমি এখন ভালো অবস্থানে আছি। সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা হয়েও আমাকে ক্ষমতা দেওয়া হচ্ছে না। এই প্রেক্ষিতে আমি কিছুটা ধমমৎবংংরাব হতে পারি মাত্র, এর বেশি কিছু নয়। আমাকে আমাদের সেনাবাহিনী ও সরকারের কর্মচারীদের সঙ্গে আলাপ করতে হবে। সেই আলাপ এখনো শেষ হয়নি। সবদিকে এত অপ্রস্তুত রেখে একটি দেশকে আমি সংগ্রামের মুখে ঠেলে দিতে পারি না। আপনি কি বোঝেন না ওইদিন চারদিকে শত্রু বেষ্টিত অবস্থায় আমার অন্য কিছু বলার ছিল না। এই হচ্ছে ৭ মার্চ শেখ সাহেবের বক্তব্য সম্পর্কে আমার ব্যাখ্যা। আমার এই বক্তব্যের বিরুদ্ধে এখনো অনেক মন্তব্য শুনি। কিন্তু তাদের কি স্মরণ নেই, ২৫ মার্চ কি অগোছালো অবস্থায় স্বাধীনতা সংগ্রাম শুরু হয়েছিল? এটা যদি ৭ মার্চ হতো তাহলে আরো লাখ লাখ প্রাণ আমাদের হারাতে হতো। একথা কি সত্য নয়? যারা সেদিন শেখ সাহেবের সমালোচনা করেছিলেন, তারা বুকে হাত দিয়ে বলুন, শেখ সাহেব কি ভুল করেছিলেন? ওই ভুলটুকু না করলে আপনারা কোথায় পালিয়ে যাবেন সে সন্ধানও করার সময় পেতেন না। শেখ সাহেব যে জয় পাকিস্তান বলেছিলেন তার অন্যতম সাক্ষী আমার অনুজপ্রতিম সাংবাদিক লন্ডন প্রবাসী আবদুল গাফফার চৌধুরী। আমি জানি না, সে কথা আজ তার মনে আছে কিনা। তবে তিনি আমার সঙ্গে জনসভায় প্রথম সারিতে বসে ছিলেন।

লেখক : সাংবাদিক ও রাজনীতিক
----------
সমকাল, ২৪ মার্চ ২০০৮

২৪ আগস্ট, ২০০৮

ভারতীয় জুজুর কাল্পনিক ধুয়া

’৭৫ এর ট্র্যাজেডি ॥ মার্কিন দলিলে -৪
অজয় দাশগুপ্ত

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট নারকীয় হত্যাকাণ্ডে বাংলাদেশে রাজনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের পর থেকেই রাষ্ট্রপতি খন্দকার মোশতাক আহমদ এবং তার সহচররা বাংলাদেশে ভারতীয় হস্তক্ষেপের সম্ভাবনার কথা বলতে থাকে। বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার মধ্য দিয়ে ক্ষমতাসীন কর্তৃপক্ষ যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য দেশের প্রতি নতুন সরকারকে দ্রুত স্বীকৃতি প্রদানের অনুরোধ জানায় এ যুক্তিতে যে, এর ফলে ভারত বাংলাদেশে সামরিক অভিযান চালানো থেকে বিরত হবে। পাকিস্তান ১৫ আগস্টেই খন্দকার মোশতাক আহমদের সরকারকে স্বীকৃতি জানানোর পেছনেও একই অজুহাত দেখায়। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দফতর এবং ভারতে অবস্থিত তার দূতাবাসও বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে সৈন্য চলাচলের ওপর সতর্ক নজর রাখে।

প্রকৃত পরিস্থিতি কী ছিল সেটা কি তারা জানত না, এ প্রশ্ন উঠতেই পারে।
১৯৭৫ সালের ২৬ আগস্ট বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতীয় দূতাবাসের প্রথম সচিব রণেন সেন ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাসের কর্মকর্তাদের সঙ্গে দেখা করেন।

ঢাকাস্থ যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত ২৭ আগস্ট ওয়াশিংটনে পররাষ্ট্র দফতরে যে বার্তা পাঠিয়েছেন তাতে বলা হয় : রণেন সেন জানান, ‘বাংলাদেশে ভারতের একমাত্র স্বার্থ হচ্ছে স্থিতিশীলতা বজায় রাখা। এখানে কী ধরনের সরকার ক্ষমতায় কিংবা কী অর্থনৈতিক নীতি অনুসরণ করা হচ্ছে তা নিয়ে ভারতের মাথাব্যথা নেই। তবে যদি হিন্দুরা মনে করে যে তাদের ওপর হুমকি সৃষ্টি হয়েছে এবং ভারতে আশ্রয়লাভের চেষ্টা চালায়, সেটা ভারতের জন্য গভীর উদ্বেগের কারণ হবে।’
বোস্টার তার প্রতিবেদনে বলেন, ‘অভ্যুত্থান ঢাকাস্থ ভারতীয় হাইকমিশনকে সম্পূর্ণ বিঘ্নিত করে। অভ্যুত্থানের সকালে ভারতীয় হাইকমিশন অফিস এবং এর স্টাফদের বাসস্থানগুলোর সব টেলিফোন সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়। ঢাকায় ভারতীয় অভিমত হচ্ছে, অভ্যুত্থান যে নিঁখুতভাবে সংঘটিত হয়েছে তাতে স্পষ্ট যে কিছু বৈদেশিক শক্তির অবশ্যই সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। এ ঘটনায় কোন বিদেশি শক্তি জড়িত সে বিষয়ে রণেন সেন কারো নাম বলেননি।’

এ সাক্ষাৎকার প্রসঙ্গে বোস্টারের মন্তব্য : ঢাকায় ভারতীয়রা ভারতের প্রতি বাঙালিদের মনোভাবের গভীরতা উপলব্ধি করে এবং ভারতের অভিপ্রায় নিয়ে অব্যাহত জল্পনা-কল্পনা রয়েছে সেটাও তারা জানে। আমরা মনে করি, ‘বাঙালিরা যে ভীতির (ভারতের তরফে) মধ্যে রয়েছে বলে অব্যাহতভাবে আমাদের কাছে জানাচ্ছে সেটা দূর করার জন্যই রণেন সেন আমাদের কাছে এসব কথা বলেছেন। সম্ভবত তারা এটাও চেয়েছে যে, আমরা তা বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষকে জানিয়ে দেই।’

বঙ্গবন্ধু সরকারের বিরুদ্ধে যে চক্রান্ত হচ্ছে সেটা নিশ্চিতভাবেই ভারত জানত। যেমন জানত যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃপক্ষ। ১৭ আগস্ট যুক্তরাষ্ট্র পররাষ্ট্র দফতর তাদের বিভিন্ন দূতাবাসের জন্য যে সারসংক্ষেপ প্রেরণ করে তাতে ‘বাংলাদেশে অভ্যুত্থানের বিষয়ে ভারতের প্রতিক্রিয়া’ অংশে বলা হয় : ১৬ আগস্ট নয়াদিল্লিতে ভারতের একজন কর্মকর্তা নয়াদিল্লিস্থ মার্কিন দূতাবাসকে জানায়, ভারত সরকার কয়েক মাস আগেই একদল হতাশ ও ক্ষুব্ধ রাজনীতিক এবং খন্দকার মোশতাক আহমদ ও মুজিব কর্তৃক সম্প্রতি পদচ্যুত একজন ক্যাপ্টেনের নেতৃত্বে সামরিক অফিসারদের অভ্যুত্থান পরিকল্কপ্পনা জানতে পেরেছিল। এ সময়ে ওই কর্মকর্তা আরো জানান, তারা নতুন সরকারের পররাষ্ট্রনীতি বিশেষ করে পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে খন্দকার মোশতাক আহমদের সুপরিচিত অবস্থানের বিষয় নিয়ে উদ্বিগ্ন। ভারতে যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাস সংবাদপত্র সূত্রে জেনেছে, ইন্দিরা গান্ধীর সরকার ঢাকায় অভ্যুত্থানের বিষয়ে সম্পাদকীয় মন্তব্য লেখায় সেন্সরশিপ আরোপ করেছে। (ভারতে ওই সময়ে জরুরি আইন বলবৎ ছিল)।

১৮ আগস্ট নয়াদিল্লিস্থ যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাস জানায় : ‘কলকাতায় বাংলাদেশ সীমান্তের কাছে বসবাসকারী সূত্রের উল্লেখ করে জানায়, সীমান্ত এলাকায় ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) এবং সম্ভবত নিয়মিত সেনাবাহিনীর শক্তি বৃদ্ধি করা হয়েছে। এর উদ্দেশ্য সম্ভবত বাংলাদেশে অভ্যুত্থানের পর হিন্দু শরণার্থীদের আগমন বন্ধ করা। কলকাতায় অনেক গুজব শোনা যাচ্ছে। কিন্তু প্রাপ্ত তথ্য থেকে এ উপসংহারে পৌঁছানো যায় যে, সামরিক বাহিনীর চলাচল যে মাত্রাতেই ঘটে থাকুক না কেন তার উদ্দেশ্য পশ্চিমবাংলায় শরণার্থী প্রবেশ ঠেকানো এবং কোনোভাবেই বাংলাদেশে ভারতীয় সামরিক হস্তক্ষেপের প্রস্তুতি নয়।’

নয়াদিল্লিস্থ দূতাবাস আরো জানায় : ১৫ আগস্টেই পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী (সিদ্ধার্থ শংকর রায়) শরণার্থী অনুপ্রবেশ ঠেকাতে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। তিনি বাংলাদেশে হিন্দু-মুসলিম সংঘাত বিষয়ে কিছু প্রকাশ না করার জন্য অনুরোধ করেন।

যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাস ওয়াশিংটনকে আরো জানায় : বাংলাদেশে ভারতীয় সেনা হস্তক্ষেপের প্রস্তুতি বিষয়ে দিল্লিতে কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। কলকাতায় মার্কিন কনসাল জেনারেলের এক প্রশ্নের উত্তরে ভারতীয় সেনাবাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডার জেনারেল জ্যাকব ১৬ আগস্ট জানান : ভারতীয় সেনাবাহিনী বিশেষ কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করছে না।

জেনারেল জ্যাকবের মন্তব্য : ১৬ আগস্ট জেনারেল জ্যাকব এক ডিনার পার্টিতে ভারতে মার্কিন দূতাবাসের এক কর্মকর্তার কাছে বাংলাদেশের ঘটনাবলির বিষয়ে জানতে চান। এ ব্যাপারে কলকাতাস্থ মার্কিন কনসাল জেনারেলের কাছে যে রিপোর্ট রয়েছে সেটা তাকে অবহিত করে বলি, এ পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্যে প্রতীয়মান হয়, অভ্যুত্থান তেমন বিরোধিতা ছাড়াই সংঘটিত হয়েছে এবং পরিস্থিতি এখন শান্ত। জ্যাকব বলেন, তিনি ঢাকায় নয়, আশপাশের জেলাগুলোতে উল্লেখযোগ্য লড়াইয়ের বিষয়ে শুনেছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিবেদনে বলা হয় : জ্যাকব অভ্যুত্থানকে নিন্দনীয় বলে মনে করেন। তিনি বলেন, এখন বাংলাদেশে কোনো স্থিতিশীলতা থাকবে না। পাল্টা অভ্যুত্থান ও সংঘর্ষের আশঙ্কাও রয়েছে। তিনি বাংলাদেশকে ইসলামী প্রজাতন্ত্র ঘোষণার বিষয়ে ঢাকার নতুন প্রশাসনের অভিপ্রায় বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তার কাছে ভারতে বাংলাদেশ থেকে কোনো হিন্দু শরণার্থী আগমনের বিষয়ে কোনো তথ্য আছে কি-না জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, এ বিষয়টি এখনই বলা যাচ্ছে না। ভারতীয় সেনাবাহিনী কোনো বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করছে কি-না জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, বিশেষ কিছু না।

কলকাতায় ভারতীয় কনসুলেট অফিসের এক কর্মকর্তা ১৬ আগস্ট ওয়াশিংটনে জানান : বাংলাদেশের অভ্যুত্থানের বিষয়ে যাদের সঙ্গে কথা হয়েছে তারা সবাই এ ঘটনার নিন্দা জানান। তবে তাদের কেউই মনে করেন না যে, ভারতের বাংলাদেশ দখল করে নেওয়া উচিত।

নেপালে যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস থেকে ওয়াশিংটনে ২৫ আগস্ট যে বার্তা পাঠানো হয় তাতে বলা হয় : রাজা থেকে সাধারণ মানুষ পর্যন্ত সবাই জানতে চায় বাংলাদেশের ঘটনাবলিতে ভারত কতটা জড়িত হবে। ভারতের প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপ ঘটবে কি-না সেটাও তারা জানতে চায়। আমরা তাদের বলছি, সাম্প্রদায়িক হানাহানি না ঘটা এবং প্রতিদ্বন্দী সামরিক ইউনিটগুলোর মধ্যে সংঘাত না ঘটায় বর্তমান সময়ে ভারতের হস্তক্ষেপের সম্ভাবনা খুব কম। নেপালিরা বাংলাদেশে ক্ষমতা পরিবর্তনে যুক্তিসঙ্গতভাবেই সন্তুষ্ট। নেপাল সরকার চীন ও পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে মোশতাক সরকারের উদ্যোগকে স্বাগত জানায়। তবে নেপালিরা মুজিব এবং তার পরিবারের সদস্যদের নির্মমভাবে হত্যার নিন্দা করে।

ইন্দিরার কাছে মোশতাকের বার্তা : ২৬ আগস্ট নয়াদিল্লিস্থ ভারতীয় রাষ্ট্রদূত ওয়াশিংটনে জানান, ২৫ আগস্ট ভারতে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি খন্দকার মোশতাক আহমদের একটি বার্তা হস্তান্তর করেন। এতে বাংলাদেশের নেতা বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য দুই দেশের যৌথ সংগ্রামের কথা উল্লেখ করেন। তিনি ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে সম্পাদিত দ্বিপক্ষীয় চুক্তির প্রতি বাংলাদেশ সম্মান জানাবে বলে জানান।
রাষ্ট্রদূতের কাছে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপনে ভারতের আগ্রহের কথা ব্যক্ত করেন।
২৭ আগস্ট বাংলাদেশে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত বোস্টার যুক্তরাষ্ট্রকে জানান : ভারত সরকার বাংলাদেশের বিরুদ্ধে বৈরী প্রচারণার জন্য ভারতীয় সুবিধা ব্যবহার করতে না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। জানা গেছে, ভারতের তথ্যমন্ত্রী শুক্লা ২৪ আগস্ট বিদেশি সাংবাদিকদের জানান, আমরা আমাদের সুবিধাদি আমাদের বাংলাদেশের বন্ধুদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে দিতে চাই না। তিনি বাংলাদেশের ঘটনাবলি ভারতে প্রচারের বিষয়ে কিছু বিধি-নিষেধ আরোপের বিষয়েও বিদেশি সাংবাদিকদের অবহিত করেন।

এরই ধারাবাহিকতায় ২৭ আগ¯দ্ব খন্দকার মোশতাক আহমদ সরকারের প্রতি আসে ভারত সরকারের কাঙ্ক্ষিত স্বীকৃতি। ২৮ আগস্ট নয়াদিল্লিস্থ ভারতীয় দূতাবাস ওয়াশিংটনকে জানায় : ২৭ আগস্ট বিদেশ মন্ত্রণালয়ের একজন মুখপাত্র ঢাকার নতুন শাসকদের প্রতি ভারতের স্বীকৃতি প্রদানের বিষয়ে অবহিত করেন।
এর মধ্য দিয়ে ১৫ আগস্টের অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশে ভারতের ভূমিকা কী হবে সেটা নিয়ে জল্লনা-কল্পনার অবসান ঘটবে বলে ধারণা হতে পারত। কিন্তু পরবর্তী তিন দশকের বেশি সময়েও সেটা ঘটেনি। বাংলাদেশে ভারত সর্বদাই একটি ফ্যাক্টর রয়ে গেছে। বিশেষ করে অভ্যন্তরীণ রাজনীতির নানা সমীকরণে তাদের বারবার টেনে আনার জন্য একটি মহল বরাবরই সক্রিয়। এ ক্ষেত্রে ভারতকে কখনো কখনো এমন অবস্থানে রাখা হয়, যার সঙ্গে বাস্তবের মিল থাকে সামান্যই। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পর বাংলাদেশে ভারত সামরিক হস্তক্ষেপ করতে চলেছে বলে যে জুজু দেখানো হয়, সেটা ছিল এ ধরনেরই।
---------
সমকাল ১৬ আগস্ট

১৫ আগস্ট, ২০০৮

১৯৭১-এ দৈনিক সংগ্রাম (পর্ব-৩)

১৬ এপ্রিল
“জনতা পাকিস্তান চায়” শিরোণামে সম্পাদকীয়তে লেখা হয়, "পূর্ব পাকিস্তানকে হিন্দভূমি বানানোর ভারতের চরম ষড়যন্ত্রের জবাব দিবে পাকিস্তানের জনগন। জনগন পাকিস্তানকে পাকিস্তান রূপেই দেখতে চায়।” জনগনের নাম বিক্রি করে দৈনিক সংগ্রাম সবসময় এধরণের সংবাদ ছাপতো। অথচ তারা এও জানতো যে, তখন প্রতিদিন যে হারে দৈনিক সংগ্রাম পোড়ানো হতো তাতে এক পরিবারের ৫ বছরের রান্নার লাড়কির যোগান হয়ে যেত।

১৭ এপ্রিল
শান্তি কমিটির করা মিছিলের ভূয়সী প্রসংশা করে এ দিনও বেশ কয়টি রিপোর্ট করা হয়। এমনই একটি রিপোর্টে বলা হয় “ পাকিস্তান রক্ষার সংগ্রাম সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে। শান্তি কমিটি গঠনের পর পুরো পূর্ব পাকিস্তানের জনগন এখন একই পতাকাতলে ঝড়ো হচ্ছে। পূর্ব পাকিস্তানের জনগন ফুঁসে উঠেছে ভারতীয় ষড়যন্ত্রের জবাব দিতে।” বস্তুত দৈনিক সংবাদ অতিরঞ্জিত এবং অবাস্তব সংবাদ প্রকাশ করে বাংলাদেশের জনগনকে বিভ্রান্ত করার অপচেষ্টা চালাতো।
একই দিন পুরো পূর্ব পাকিস্তানে এরকম শান্তি কমিটি গঠনের জন্য জামায়াতে ইসলামী এবং মুসলিম লীগকে আহবান জানানো হয়। এ বিষয়ে লিখতে গিয়ে মোট ৩৭ বার জিহাদ এবং মুজাহিদ শব্দটি উল্লেখ করা হয়।দৈনিক সংগ্রাম একাত্তরে সংবাদ প্রচারের ক্ষেত্রে ভারতকে বল্লম এবং ইসলামকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করতো। যদিও বাংলাদেশীরা প্রমান করেছিলো, বাংলাদেশীরা বাস্তবিক অর্থেই শত্রু সম্পর্কে সম্যক ধারণা রাখে। যেমন আজ এই ২০০৮ সনে এসে কি আমরা যুদ্ধাপরাধীদের নিয়ে সোচ্ছার নই?

১৮ এপ্রিল
“শেখ মুজিবের রেফারেন্ডম ছিলো স্বায়ত্বশাসন, স্বাধীনতা নয়” বোল্ড হরফে বড়সড় একটা আর্টিকেল লেখা হয় উপ-সম্পাদকীয়তে। যেখানে শেখ মুজিবের নামে কল্পনা প্রসূত সব অবাস্তব এবং অবান্তর কথা লেখা হয়। বলা হয়, “শেখ মুজিব সত্যিকার অর্থের ভারতীয় দালাল এবং আন্তর্জাতিক জঙ্গী গোষ্ঠীর ক্ষমতা লোলুপ এজেন্ট। দেশের জনগনকে মুক্তির কথা বলে অত্যুক্তির বুলি শিখিয়ে ভারতের গোলাম বানিয়ে রাখার এক অভিনব নকশা তৈরী করেছে ভারতের দালালেরা। বাংলাদেশের জনগন এখন ইতিহাসের দ্বিতীয় মীরজাফরকে দেখতে পাচ্ছে। মুজিবকে সাথে নিয়ে নয়াদিল্লির ষড়যন্ত্র দেখে মনে হচ্ছে আগরতলা ষড়যন্ত্রও সত্যিকারের ঘটনা ছিলো।”

১৯ এপ্রিল
১৮ এপ্রিল ঢাকাতে জয়বাংলা শ্লোগানে বিশাল এক মিছিল বের করে মুক্তি কামী জনগন। যেখানে জয়বাংলা লেখা খচিত লাল সবুজ পতাকা বহন করা হয় এবং কাযেদে আজমের ছবি পদদলিত করা হয় এবং পোড়ানো হয়। এ ঘটনার পরেই দৈনিক সংগ্রামের খবর প্রকাশের ধারা পাল্টে যায়। কারণ, বিদেশী মিডিয়া এই মিছিলের বেশ কভারেজ দেয়। ১৯ এপ্রিল প্রকাশিত প্রায় সব খবরের মর্মার্থ ছিলো, “পুরো পূর্ব পাকিস্তান ভারতীয় অনুপ্রবেশে ভরে গেছে। পথে পথে এখন ভারতীয় গুপ্তচর। ভারত থেকে লোক আনিয়ে মছিল করানো হয়েছে ঢাকার পথে পথে।” পাকিস্তান সেনা বাহিনীকে উদ্দেশ্য করে বলা হয় “ সময় এসেছে নড়েছড়ে বসার। পুরো পাকিস্তানকে ভারতীয় চর মুক্ত করতে হবে।”

২০ এপ্রিল
“জামায়াতে ইসলামী এবং মুসলিম লীগ আগেই সতর্ক করে আসছিলো” নামের উপসম্পাদকীয়তে উল্লেখিত দল সমূহের আগাম সতর্কবাণী সম্পর্কে একটি হায়! হায়!! লেখা ছাপা হয়।
প্রাক নির্বাচনী সতর্কবাণীর বিবরণ দিতে গিয়ে বলা হয়, “জামায়াত এবং মুসলিম লীগ নির্বাচনের আগেই ভারতের ষড়যন্ত্রের বিষয়ে জনগনকে সতর্ক করে আসছিলো। কিন্তু জনগন তাতে কান দেয়নি। এখন কেন পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর সামনে এমনভাবে কাতরাচ্ছে? দু’শ বছর ব্রিটিশ শাসনে থেকেও জনগন ভাবতে পারেনি যে, এই পূর্ব পাকিস্তানে শেখ মুজিবের মতো আরো এক মীরজাফরের জন্ম হয়েছে। এই মূহুর্তে পূর্ব পাকিস্তানের উচিত হবে ভারতীয় অনুপ্রবেশকারী এবং দেশীয় দালাল, মীরজাফরদের ধরে ধরে সেনাবাহিনীর হাতে তুলে দেওয়া। আমরা গত পহেলা মার্চ থেকে তাদের জয় বাংলা শ্লোগান শুনতেছি এবং তাদের লুন্ঠন, অত্যাচার, রাহাজানি স্বচক্ষে দেখতেছি”

২১ এপ্রিল
এদিন সম্পাদকীয়তে বেশ জোরালো ভাবে বাংলাদেশীদের ধ্বংসের পক্ষে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর নিকট আহবান জানানো হয়। “প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে সেনাবাহিনীকে ছড়িয়ে দেয়ার সময় এসেছে” টাইটেলে শক্তভাবে এবং অত্যন্ত প্রয়োজনীয় উল্লেখ করে লেখা হয় “ একটি দেশ জন্ম নিতে এবং পরাধীনতা স্বাধীন হতে কয়েকশ বছর লেগে যায়, কিন্তু সে দেশ পরাধীন হতে যেন একদিনও লাগে না। ব্রিটিশরা বিদায় নেয়ার পর এখন নতুন করে ভারতীয়রা চাচ্ছে পূর্ব পাকিস্তানকে দখল করে তাদের দাস বানাতে। কারণ পূর্ব পাকিস্তানের জনগন অধিক পরিশ্রমী এবং মেধাবী। আমাদের আছে সুদক্ষ সেনাবাহিনী। তারা এবার ছড়িয়ে পড়ুক পূর্ব পাকিস্তানের প্রত্যন্ত অঞ্ছলে, যেখানে তাদেরকে সাহায্য করবে এ প্রদেশের দেশপ্রেমিক জনগন।”

তথ্যসূত্র: সামহোয়ারইনব্লগ

১৪ আগস্ট, ২০০৮

অভ্যুত্থান চলাকালেই কিসিঞ্জার খবর পাচ্ছিলেন, বঙ্গবন্ধু তখনো বেঁচে

সমকাল (১৩ আগস্ট ২০০৮) পত্রিকায় বিভিন্ন গোপন দলিলে প্রাপ্ত তথ্য নিয়ে অজয় দাশগুপ্তের একটি মূল্যবান লেখা প্রকাশিত হয়েছে। এতে বঙ্গবন্ধু হত্যাকালীন সময়ে আমেরিকার পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরী কিসিঞ্জার ও তার স্টাফ অফিসারদের কথোপকথনের কিছু ব্যাখ্যা রয়েছে। আন্তর্জাতিক রাজনীতির অজানা কাহিনী সমৃদ্ধ এই লেখাটি সংগ্রহ করা হয়েছে সমকাল পত্রিকা থেকে।

অভ্যুত্থান চলাকালেই কিসিঞ্জার খবর পাচ্ছিলেন, বঙ্গবন্ধু তখনো বেঁচে
৭৫ এর ট্রাজেডি মার্কিন দলিলে

অজয় দাশগুপ্ত

[যে কোনো বৃহৎ শক্তির কূটনৈতিক কর্মকান্ডে বিস্তর লিখিত দলিল চালাচালি হয়। আর এতে থাকে আপাতভাবে তুচ্ছ থেকে শুরু করে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার আনুপূর্ব বিবরণ। তাৎক্ষণিক প্রয়োজন তো আছেই, আরেকটি উদ্দেশ্য ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য শিক্ষণীয় রেখে যাওয়া। বাংলাদেশের ১৯৭৫ সালের ১৫ আগষ্ট ট্র্যাজেডি যুক্তরাষ্ট্রের কাছে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল। বঙ্গবন্ধু হত্যা-কান্ডে তাদের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ সুবিদিত। এর সত্যতা অনুসন্ধানে গবেষকরা নিরন্তর চেষ্টা চালা-চ্ছেন। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দফতরের শত শত দলিলে ওই সময়ের ঘটনাবলির রয়েছে লিখিত বিবরণ। ঘটনার ৩০ বছর পর অতি গোপনীয় ও গোপনীয় নথি প্রকাশের বিষয়ে আইন প্রণয়নের কারণে এসব দলিল এখন শুধু ওই দেশের নাগরিক নয়, বিশ্ববাসীও জানতে পারছে। তবে নথি প্রকাশ করার আগে তা পর্যালোচনা-পরীক্ষা করে দেখবেন অরিজিনেটিং এজেন্সির প্রধান। তিনি যদি কোনো বিষয় প্রকাশ না করার সিদ্ধান্ত দেন তবে তা অনির্দিষ্টকাল আলোর মুখ দেখবে না। ১৫ আগষ্ট ট্র্যাজেডির সঙ্গে প্রত্যক্ষ সংশ্লিষ্টতা ছিল তৎকালীন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জারের। এখনো তিনি বেঁচে আছেন। তাই গোপনীয় ও অতি গোপনীয় হিসেবে চিহ্নিত মার্কিন পররাষ্ট মন্ত্রণালয়ের দলিল প্রকাশের আগে তার মতামত নেওয়া হয়েছে এবং তিনি বেশকিছু দলিল সংশোধিত আকারে প্রকাশের সিদ্ধান্ত দিয়েছেন। আর এ কারণেই বাংলাদেশের ইতিহাসের বিয়োগান্ত ও সুদূরপ্রসারী তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায়ের কিছু অংশ আপাতত থেকে যাচ্ছে অন্ধকারে। কে জানে, হয়তোবা চিরকালের জন্যই।]

১৯৭৫ সালের ১৫ আগষ্ট। শুত্রক্রবার। ওয়াশিংটন সময় সকাল ৮টা। বাংলাদেশে তখন ১৫ আগষ্ট, রাত ১০টা। এদিন প্রত্যুষে বাংলাদেশের জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সামরিক অভ্যুত্থানে নিহত হয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার তার স্টাফ সভায় বসেছেন কয়েকজন কর্মকর্তা নিয়ে। এখানে কী আলোচনা হয়েছে তার বিবরণ
পররাষ্ট্র দফতরের অনেক দলিলে, যার সংশোধন করা হয়েছে। অর্থাৎ পূর্ণ বিবরণ আপাতত জানার অবকাশ নেই।
বৈঠকের শুরুতেই কিসিঞ্জার বলেন, আমরা এখন বাংলাদেশ প্রসঙ্গে কথা বলব।
নিকট প্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী আথারটন : এটা হচ্ছে সুপরিকল্কিপ্পত ও নিখুঁতভাবে বাস্তবায়ন করা অভ্যুত্থান।
কিসিঞ্জার : মুজিবুর কি জীবিত না মৃত?
আথারটন : মুজিব মৃত। তার অনেক ঘনিষ্ঠ সহচর, পরিবারের সদস্য, ভাই, ভাগ্নে নিহত হয়েছেন।
কিসিঞ্জার : আমি ব্যুরো অব ইন্টেলিজেন্স অ্যান্ড রিসার্চ (আইএনআর) থেকে ভালো পরামর্শ পেয়েছি [তিনি এ কর্মকর্তার সঙ্গে ওয়াশিংটনে আগেই কথা বলেছেন। তবে এটা ফোনে নাকি সরাসরি, সেটা স্পষ্ট নয়]।
হিল্যান্ড (ব্যুরো পরিচালক) : আমি যখন আপনার সঙ্গে কথা বলেছি তখন তিনি মৃত ছিলেন না।
কিসিঞ্জার : আচ্ছা? তারা কি কিছু সময় পর তাকে হত্যা করেছে?

এ আলোচনা থেকে স্পষ্ট, ১৫ আগষ্ট অভ্যুত্থান চলাকালেই কিসিঞ্জার অবহিত হচ্ছিলেন [১৫ আগষ্ট ঢাকার যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস প্রেরিত বার্তায় বলা হয় : ঢাকার সময় বিকেল চারটা পর্যন্ত দেখা যায়, অভ্যুত্থান সফল হচ্ছে বলেই প্রতীয়মান হয়। কোনো সক্রিয় প্রতিরোধ দেখা যাচ্ছে না]।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের স্টাফ বৈঠকে কিসিঞ্জারের প্রথম প্রশ্নও সন্দেহ সৃষ্টি করে। তিনি প্রথমেই জানতে চেয়েছেন, মুজিব জীবিত নাকি মৃত। এ ধরনের ঘটনায় প্রথম প্রশ্ন হওয়ার কথা, মুজিব ক্ষমতায় আছেন কি নেই। কিন্তু প্রভাবশালী মার্কিন নেতা জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি বেঁচে আছেন কি-না। ১০ ঘণ্টা আগে অভ্যুত্থান চলাকালেই তিনি ঘটনার বিবরণ পাচ্ছিলেন হিল্যান্ডের কাছ থেকে। এ অভ্যুত্থান রোধে তাদের কিছু করণীয় প্রতিকারের কথা ভাবেননি। বরং যেন মনে হয়, তিনি অপেক্ষা করে ছিলেন একটি দেশের রাষ্ট্রপতির মৃত্যু সংবাদের জন্য!

বাংলাদেশের স্থপতির প্রতি কিসিঞ্জারের বিরাগ ছিল ১৯৭১ সাল থেকেই। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওই বৈঠকে তিনি মুজিব সম্পর্কে যে মন্তব্য করেছিলেন তাতেও ওই বিদ্বেষের প্রতিফলন : হি ওয়াজ ওয়ান অব দ্য ওয়ার্ল্ড’স প্রাইজ ফুলস।
১৯৭৪ সালের ৩০ অক্টোবর কিসিঞ্জার এসেছিলেন বাংলাদেশে। তিনি বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে। এ সফরের মাত্র তিনদিন আগে ২৭ অক্টোবর অর্থমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ পদত্যাগ করেন। মুক্তিযুদ্ধকালে দেশের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালনকালে তিনি চমকপ্রদ দক্ষতা ও যোগ্যতার স্বাক্ষর রাখেন। তাকে অপসারণের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের চাপ ছিল বলে ধারণা করা হয়। কিসিঞ্জাসের সফরের প্রাক্কালে তাকে অপসারণ কাকতালীয় নাকি এর পেছনে কোনো বিশেষ কারণ ছিল, সেটা ইতিহাসের গবেষণার বিষয় হতে পারে। তাজউদ্দীনের অনমনীয় মনোভাবের কারণে একাত্তর সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্বপ্ন বিসর্জন দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও পাকিস্তানের পরিকল্পনা মেনে নেওয়ার জন্য খন্দকার মোশতাকের চক্রান্ত সফল হতে পারেনি।
১৯৭৪ সালের বন্যার পরপরই দেশে দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। এ সময়ে খাদ্যের ঘাটতি ছিল ব্যাপক এবং তা পহৃরণে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে বাংলাদেশ সহায়তা চাইছিল।
কিসিঞ্জার বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে বৈঠকে বলেন, ‘আপনার তো দেখছি চারদিক থেকেই সমস্যা।’
বঙ্গবন্ধু বন্যা সমস্যা, খাদ্য সমস্যা, রাসায়নিক সারের ঘাটতি, জনসংখ্যা বৃদ্ধি, পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পদ বণ্টন এবং বাংলাদেশের বিভিন্ন শিবিরে অবস্থানকারী পাকিস্তানি নাগরিকদের তাদের দেশে ফিরিয়ে নেওয়ার প্রসঙ্গ তুললে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী সম্ভবত ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ করেই ‘আপনার তো দেখছি চারদিক থেকেই সমস্যা’ বলেছিলেন। কারণ বৈঠকে তোলা প্রতিটি বিষয়েই তার অবস্থান ছিল বাংলাদেশের বিপক্ষে।
কিসিঞ্জারের বাংলাদেশ সফরের কিছুদিন আগে বঙ্গবন্ধু জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ভাষণ দিয়েছিলেন। ওই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জেরাল্ড ফোর্ডের সঙ্গে তার বৈঠক হয়। কিসিঞ্জারের সঙ্গে ঢাকায় আলোচনাকালে বঙ্গবন্ধু ফোর্ডকে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানিয়ে বলেন, তিনি ভারতে তার আসন্ন সফরের সঙ্গে মিল রেখে ঢাকা আসতে পারেন। এর জবাবে কিসিঞ্জারের মন্তব্য ছিল কূটনৈতিক শিষ্টাচারের পরিপন্থী। তিনি ঢাকায় বঙ্গবন্ধুকে বলেন, ‘ফোর্ড ভারত সফরের সময়ে বাংলাদেশে আসতে পারেন। তবে আমরা মনে করি না বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের তরফে ভারতের অনুমতি গ্রহণের প্রয়োজন রয়েছে।’
কিসিঞ্জার ওয়াশিংটনে ফোর্ডের সঙ্গেও বঙ্গবন্ধুর বৈঠকের প্রসঙ্গ তোলেন। তিনি বলেন, প্রেসিডেন্ট আপনার সঙ্গে আলোচনায় সন্তুষ্ট। ণড়ঁ নধসনড়ড়ুষবফ যরস! এ বাক্যের অর্থ হতে পারে, আপনি তাকে মুগ্ধ করেছেন। আবার, আপনি তাকে কথার জাদুমালা আর ব্যক্তিত্ব দিয়ে ভুলিয়েছেন বলেও ধরে নেওয়া যায়। কিন্তু ধুরন্ধর কূটনীতিক যদি নধসনড়ড়ুষবফ শব্দের আক্ষরিক অর্থ ‘প্রতারণা’ বুঝিয়ে থাকেন?
ঢাকার বৈঠকে বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের কাছে বাংলাদেশের ন্যায্য পাওয়ার প্রসঙ্গ তোলেন। তিনি বলেন, আমরা সম্পর্ক স্থাপনের জন্য অনেক কিছু করেছি। যুদ্ধবন্দিদের ছেড়ে দিয়েছি। পাকিস্তানের বৈদেশিক সম্পদের দায়দেনার যতটা আমাদের ওপর বর্তায় তা বহনের কথা জানিয়েছি। কিন্তু পাকিস্তান কেবল কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনে আগ্রহী।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দফতর যে গোপনীয় দলিল সংশোধন করে প্রকাশ করেছে তাতে দেখা যায়, কিসিঞ্জার এ প্রশ্নে পাকিস্তানের বক্তব্যই তুলে ধরেছেন। তিনি বলেন, আমি পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আজিজ আহমদের সঙ্গে কথা বলেছি। তিনি দায়দায়িত্ব গ্রহণের বিষয়ে আপনাদের অনাগ্রহের কথা জানিয়েছেন।
প্রধানমন্ত্রী মুজিব : আমি ইতিমধ্যেই দায়দায়িত্ব গ্রহণ করেছি। আমরা এ বিষয়ে ঋণদাতাদের সঙ্গে চুক্তি করেছি। কিন্তু কেন আমি সম্পদের ভাগ পাব না?
মুজিব : আমরা এক বা দুই বছর খাদ্য সহায়তা চাই। আমি দেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করার জন্য ব্যাপক সহায়তা চাই। আমরা শিল্পের কাঁচামাল চাই। আমাদের পাটের জন্য ভালো দাম চাই।
এর জবাবেই কিসিঞ্জার বলেন, আপনার তো দেখি চারদিক থেকেই সমস্যা।
বঙ্গবন্ধু চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক স্থাপনে আগ্রহের কথাও বলেন। এ প্রসঙ্গে কিসিঞ্জারের বক্তব্য : তারা হয়তো আপনাদের সঙ্গে পাকিস্থানের সম্পর্ক স্থাপন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে চাইবে।

হ্যাঁ, পাকিস্তান বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিয়েছিল ১৫ আগষ্ট বঙ্গবন্ধুকে নৃশংসভাবে হত্যার পর। চীনও সম্পর্ক স্থাপন করে এ বিয়োগান্ত ঘটনার পর।
কিসিঞ্জার কি ১৫ আগষ্টের ঘটনা আগেই জানতেন?
বঙ্গবন্ধু বন্যায় খাদ্যশস্য বিনষ্ট হওয়া এবং বিশ্ববাজারে খাদ্যের দাম অনেক বেড়ে যাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে সাহায্য চাইলে কিসিঞ্জার বলেন, ‘আমাদের সমস্যা হচ্ছে, আমাদের কাছে উদ্বৃত্ত খাদ্য নেই। ... সাহায্য প্রসঙ্গে আমাদের কংগ্রেসের সঙ্গেও সমস্যা রয়েছে। আগামী মঙ্গলবার আমাদের কংগ্রেসের (প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট) নির্বাচন। তবে ১৯৭০ সালে আপনি যেভাবে জিতেছিলেন তেমন সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রশাসন আশা করে না।
জবাবে বঙ্গবন্ধু রসিকতা করে বলেন, ‘নির্বাচনে অত বেশি আসন পাবেন না। আপনারা জানেন, আমি বিপুলভাবে জয়ী হওয়ার পর কী ঘটেছিল : পাকিস্তানিরা এখানে সবকিছু ধ্বংস করে দেয়। আমাকে গ্রেফতার করে। আমার পাঁচ বছরের ছেলেও বলে, আর নির্বাচনে দাঁড়াবে না।’
এর জবাবে কিসিঞ্জার বলেন, ‘আপনি নিশ্চয়ই কিছু সময়ের জন্য আপনার দেশে নির্বাচন এড়াতে চাইবেন না!’
বঙ্গবন্ধু যে কোনো সময়েই নির্বাচন এড়াতে চাননি সেটা কিসিঞ্জার সম্ভবত জানতেন না।
১৫ আগষ্ট ওয়াশিংটনের সকালের বৈঠকে ফিরে তাকানো যাক।
বৈঠকে আথারটন জানান, অভ্যুত্থানকারীরা মুজিবকে হত্যার জন্যই এসেছিল। তারা বাড়িটি ঘেরাও করে এবং ভেতরে গিয়ে তাকে মেরে ফেলে।
আগেও তাকে হত্যার চক্রান্ত প্রসঙ্গ তুলে কিসিঞ্জার বলেন : তাকে কি গত বছর আমরা এ বিষয়ে কিছু বলিনি?
আথারটন : গত মার্চে এ বিষয়ে আমরা অনেক ইঙ্গিত পাচ্ছিলাম।
কিসিঞ্জার : তাকে কি আমরা কিছু জানাইনি?
আথারটন : তাকে সে সময়ে জানিয়েছি।
কিসিঞ্জার : কারা এর পেছনে, সে বিষয়ে কি মোটামুটি কিছু ধারণা দিয়েছি?
আথারটন : কারা জড়িত সেসব নাম তাকে বলেছি কি-না, সেটা পরীক্ষা করে দেখতে হবে।
হিল্যান্ড : আমরা এ বিষয়ে ঠিক যথাযথ ধারণা দিইনি।
আথারটন : তিনি বিশ্বাস করেননি। তিনি বলেছেন, কেউ তাকে এ ধরনের কিছু করবে না।
বাংলাদেশের অভ্যুত্থান ‘সফল’ হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দফতরের কাছে খবর পৌঁছে যায় : ‘যারা অভ্যুত্থান করেছে তাদের মধ্যে রয়েছে সামরিক অফিসার, মধ্য পর্যায় ও সিনিয়র অফিসার- যাদের সাধারণভাবে পূর্ববর্তী শাসকদের তুলনায় কম ভারতপন্থি, সোভিয়েতবিরোধী এবং মার্কিনপন্থি হিসেবে গণ্য করা যায়।
কিসিঞ্জার : এটাই হতে হবে।
আথারটন : তারা দেশের নাম পরিবর্তন করে ইসলামী প্রজাতন্ত্র রেখেছে।
কিসিঞ্জার : তারা যুক্তরাষ্ট্রপন্থি হবে, এটা অপরিহার্য নয়। প্রকৃতপক্ষে পথপরিক্রমায় তারা চীনাপন্থি এবং ভারতবিরোধী হবে বলে আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি। আমি সবসময়ই জানতাম, ভারত বাংলাদেশকে স্বাধীন করার জন্য একদিন অনুতাপ করবে। এ ভবিষ্যদ্বাণী আমি একাত্তর সালেই করেছি।
আথারটন : আমাদের বড় সমস্যা হবে বাংলাদেশের নতুন শাসকদের সঙ্গে খুব ঘনিষ্ঠতা বা মাখামাখি পরিহার করা।
কিসিঞ্জার : কেন তারা আমাদের প্রতি বন্ধুভাবাপন্ন বলে?
ঝানু কূটনীতিক কিসিঞ্জার ঠিকই বুঝেছিলেন স্বাধীন দেশের স্থপতিকে সপরিবারে হত্যার মধ্য দিয়ে যারা রাষ্ট্রক্ষমতায় এসেছে তারা তাদের বন্ধু এবং বৈঠকেই তিনি জানিয়ে দেন : ‘তারা আমাদের কাছ থেকে বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ পাবে। আমরা তাদের স্বীকৃতি দেব।’
১৯৭৫ সালের ১৫ আগষ্ট বাংলাদেশ তার ইতিহাসের কঠিনতম পথে যাত্রা শুরু করে। এর পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা ছিল ৩০ লাখ শহীদের রক্তে অর্জিত বাংলাদেশের জনগণের জন্য অগ্রহণযোগ্য এবং অবশ্যই ক্ষতিকর। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দফতরের যেসব গোপনীয় দলিল প্রকাশ করা হচ্ছে, তা থেকেও এ সাক্ষ্য মেলে।

১২ আগস্ট, ২০০৮

১৯৭১-এ দৈনিক সংগ্রাম (পর্ব-১)

লিখেছেন: সবাক

 আমাদের মুক্তিযুদ্ধে মিডিয়ার একটা ভূমিকা ছিলো। কখনও তা আমাদের পক্ষে গেছে আবার কখনও বিপক্ষে। ইলেক্ট্রনিক্স মিডিয়ার তখন এত সহজলভ্যতা ছিলনা। তাই প্রিন্ট মিডিয়া একটি বড় ফ্যাক্টর ছিল। আমাদের দেশীয় পত্রিকার মধ্যে প্রায় সব পত্রিকার সাংবাদিকরাই প্রানবাজি রেখে মুক্তির পক্ষে কলম চালিয়ে ছিলেন। কিন্তু জামায়াতের মুখপত্র দৈনিক সংগ্রাম নামের পত্রিকাটি মিথ্যা, বানোয়াট এবং পাকিস্তান সরকারের দালালী করে বিভ্রান্তিকর খবর চাপতো। একটি বিদেশী পত্রিকা যদি বিরোধী ভূমিকা নেয়, তবে তা মেনে নেয়া যায়। কিন্তু শতকরা ৯৯ভাগ জনগনের পক্ষে না গিয়ে কি নির্লজ্জভাবে পাকিস্তান সরকারের দালালী করেছিলো দৈনিক সংগ্রাম।। ১৯৭১ এর ৮ এপ্রিল থেকে ১৬জুন পর্যন্ত সংখ্যা সমূহের উল্লেখযোগ্য সংবাদগুলো আমার কালেকশনে আছে সেখান থেকে ধারাবহিক ভাবে পুরোটাই আপনাদের জন্য তুলে ধরার চেষ্টা করবো। আজ ১ম কিস্তিতে যৎসামান্যই দিলাম। আগামী পর্বগুলোতে আরও বিশাল পরিসরে দেয়ার আশা রাখি। ইচ্ছে করলে কালও দিতে পারতাম, কিন্তু দেরী সইলো না বলে.....

৮ এপ্রিল:
৭ এপ্রিল রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রোকেয়া হলে চলে পাকসেনাদের তান্ডব। অথচ সংগ্রাম এই বিষয়টি হালকা করতে গিয়ে “ভারতীয় অপপ্রচার শিরোণামে” সম্পাদকীয়তে লিখে, “......এমনকি রোকেয়া হলে কিছু হওয়াতো দূরের কথা, শোনা যায় সেখানে কেবল অন্য হল থেকে দু’একটা ছাত্র এসে আশ্যয় নিয়েছিলো” অপর দিকে একজন বিদেশী সাংবাদিক মিচেল লরেন্ট এর মতে, ১০এপ্রিল তিনি এখানে এসে দেখতে পান যে, জনাদশেক ছাত্রকে একসাথে মাটিতে লাশ হয়ে পড়ে থাকতে দেখা যায়। আরও অনেককে বিছানায় যেভাবে ঘুমিয়েছিলো, সেভাবেই পড়ে থাকতে দেখা যায়। সেখানে ছিলো ছোপ ছোপ রক্তের দাগ। ছিলো ট্যাংকের মাড়িয়ে যাবার দৃশ্য।
একই দিনে দৈনিক সংগ্রামে “নিজেরে হারায়ে খুজি” উপসম্পাদকীয়তে লেখা হয়, “বাংলাদেশ ইন্দিরা গান্ধীর স্বপ্নের রামরাজ্য” ৮ এপ্রিলের প্রথম পাতায় লিখা হয় “পূর্ব পাকিস্তানের জনগন সশস্ত্র অনুপ্রবেশকারীদের দেখামাত্র খতম করে দিবে”। জামায়াতের একটি বিবৃতি ৪ কলামের বিশাল পরিসরে দেয়া হয়, যাতে লেখা ছিলো- পূর্ব পাকিস্তানের জনগন দেশের সার্বভৌমত্ব নিয়ে সাম্রাজ্যবাদী ভারতকে ছিনিমিনি খেলতে দিবে না।

৯ এপ্রিল:
“কাশ্মীর থেকে পূর্ব পাকিস্তান” শীর্ষক সম্পাদকীয়তে উল্লেখ করা হয়, “ হিন্দুস্থান পাকিস্তানের মুসলমানদের জন্য মায়াকান্না কেঁদে ও বন্ধু সেজে পূর্ব পাকিস্তানে ব্যপক অনুপ্রবেশের কসরত চালিয়ে যাচ্ছে, নেহেরু তনয়া মিসেস গান্ধী মনে করেছেন তাদের এ প্রচেষ্টা সফল হলে কাশ্মীরের মতো পূর্ব পাকিস্তান দখল করে এখানে হত্যাযজ্ঞ চালাবে।

১০ এপ্রিল:
প্রথম পাতায় পুরো কলামজুড়ে বড় বড় হেডলাইন করে এবং বিশাল ছবি সম্বলিত লে: জে: টিক্কা খানের পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর হওয়ার সংবাদটি গুরুত্ব সহকারে।
মুক্তিযুদ্ধ শুরুর কয়েক সপ্তাহ আগে রবীন্দ্রনাথের গানকে বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে ঘোষনা করা হয়। বিষয়টি দৈনিক সংগ্রামের সহ্য হয়নি, তাই তারা “ভারতের মায়াকান্না” উপ-সম্পাদকীয়তে লিখে, “রবীন্দ্রনাথের সবচেয়ে বড় পরিচয় সে হিন্দু” এর কয়েক সপ্তাহ আগেই ঢাকা ভার্সিটির ‘জিন্নাহ হল’ ‘সূর্যসেন হল’ নাম ধারণ করে।

১১ এপ্রিল:
৭ কলাম ব্যাপী ও ৩ ইঞ্চি ব্যাস বিশিষ্ট বড় বড় হরফে “ঢাকায় শান্তি কমিটি গঠন” শিরোণামে লেখা হয়, - ঢাকার নাগরিক জীবনযাত্রা স্বাভাবিক রাখার জন্য ১৪০ সদস্য কমিটি বিশিষ্ট নাগরিক শান্তি কমিটি গঠন করা হয়েছে, যার মূল উদ্দেশ্য ভারতীয় অনুপ্রবেশ ঠেকানো, এবং কমিটিং প্রথম মিটিং শেষে দেয়া বিবৃতিতে বলা হয়, “বাংলাদেশের আভ্যন্তরীণ বিষয়ে ভারতের নির্লজ্জ হস্তক্ষেপ কোনভাবেই মেনে নেয়া যায় না, আমরা এর তীব্র নিন্দা জানাই। কমিটিতে পূর্বপাকিস্তানের কাউন্সিল মুসলিম লীগের সভাপতি খাজা জয়েন উদ্দিনকে আহবায়ক করা হয়। বাকিরা হলেন, জনাব এ কে এম শফিকুল ইসলাম, মৌলানা ফরিদ আহমদ, অধ্যাপক গোলাম আযম, পীর মহসেন উদ্দিন, মুহম্মদ আলী, এ এস এম সোলায়মান, আবুল কাশেম, আতাউল হক খান। অধ্যাপক গোলাম আযমকে কেন সভাপতি করা হয়নি এ নিয়ে বৈঠকে ব্যাপক বাক বিতন্ডতা হয়।
একই দিন “পাক ভারত সম্পর্ক” শিরোণামে উপ-সম্পাদকীয়তে লিখা হয়, “প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া দেশের জন্য একটি স্থায়ী, গ্রহনযোগ্য ইসলামী চেতনা ও আদর্শ সম্বলিত শাসন ব্যবস্থা দেয়ার জন্য সর্বদা সচেষ্ট আছেন। তিনি তার ৫ দফা আইন কাঠামোর আদেশে পাকিস্তানের ঐক্য ও ইসলামী আদর্শের পুরোপুরি বজায় রাখার নিশ্চয়তা প্রদান করেছিলেন। গত নির্বাচনের পরের কাহিনী বড়ই নাজুক। কিছু ব্যক্তি তাদের ঐক্য বজায় রাখার নির্বাচনী ওয়াদার খেলাপ করে এখন বিপ্লবের কথা বলছে, যা আমাদের জন্য দু:খজনক। এই সুযোগে আমাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারত পূর্ব পাকিস্তান দখলের পাঁয়তারা করছে। যা পাকিস্তানবাসী কোনদিনই হতে দিবে না।”

তথ্যসূত্র: সামহোয়ারইনব্লগ

১ আগস্ট, ২০০৮

বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ

বারবার শুনতে চাই সেই অমৃত ভাষণ। বারবার রক্তে শিহরণ তুলতে চাই। অনলাইনে যত বেশি জায়গায় এই ভাষণ থাকবে তত বেশি মানুষ মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে অনুধাবন করতে পারবে।

১৯৭১ সালের রমনার রেসকোর্স ময়দানে ততকালীন আওয়ামী লীগ নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান প্রদত্ত ভাষণ:

এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম

আজ দুঃখ-ভারাক্রান্ত মন নিয়ে আপনাদের সামনে হাজির হয়েছি। আপনারা সবই জানেন এবং বুঝেন। আমরা আমাদের জীবন দিয়ে চেষ্টা করেছি- আজ ঢাকা, চট্টগ্রাম, রংপুর ও যশোরের রাজপথ আমার ভাইয়ের রক্তে রঞ্জিত হয়েছে।

আজ বাংলার মানুষ মুক্তি চায়-তারা বাঁচতে চায়। তারা অধিকার পেতে চায়। নির্বাচনে আপনারা সম্পূর্ণভাবে আমাকে এবং আওয়ামী লীগকে ভোট দিয়ে জয়যুক্ত করেছেন শাসনতন্ত্র রচনার জন্য। আশা ছিল জাতীয় পরিষদ বসবে, আমরা শাসনতন্ত্র তৈরী করবো এবং এই শাসনতন্ত্রে মানুষ তাদের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মুক্তি লাভ করবে।

কিন্তু ২৩ বছরের ইতিহাস বাংলার মানুষের রক্ত দিয়ে রাজপথ রঞ্জিত করার ইতিহাস। ২৩ বছরের ইতিহাস বাংলার মানুষের মুমুর্ষু আর্তনাদের ইতিহাস, রক্ত দানের করুণ ইতিহাস। নির্যাতিত মানুষের কান্নার ইতিহাস।
১৯৫২ সালে আমরা রক্ত দিয়েছি। ১৯৫৪ সালে নির্বাচনে জয় লাভ করেও ক্ষমতায় বসতে পারিনি। ১৯৫৮ সালে দেশে সামরিক শাসন জারি করে আইয়ুব খান দশ বছর আমাদের গোলাম করে রাখলো। ১৯৬৬ সালে ৬-দফা দেয়া হলো এবং এর পর এ অপরাধে আমার বহু ভাইকে হত্যা করা হলো। ১৯৬৯ সালে গণ-আন্দোলনের মুখে আইয়ুবের পতনের পর ইয়াহিয়া খান এলেন। তিনি বলেলেন, তিনি জনগণের হাতে ক্ষমতা ফিরিয়ে দেবেন, শাসনতন্ত্র দেবেন, আমরা মেনে নিলাম।

তার পরের ঘটনা সকলেই জানেন। ইয়াহিয়া খানের সংগে আলোচনা হলো-আমরা তাকে ১৫ ইং ফেব্রুয়ারী জাতীয় পরিষদের অধিবেশন ডাকার অনুরোধ করলাম। কিন্তু 'মেজরিটি' পার্টির নেতা হওয়া সত্ত্বেও তিনি আমার কথা শুনলেন না। শুনলেন সংখ্যালঘু দলের ভুট্টো সাহেবের কথা। আমি শুধু বাংলার মেজরিটি পার্টির নেতা নই, সমগ্র পাকিস্তানের মেজরিটি পার্টির নেতা। ভুট্টো সাহেব বললেন, মার্চের প্রথম সপ্তাহে অধিবেশন ডাকতে, তিনি মার্চের ৩ তারিখে অধিবেশন ডাকলেন।

আমি বললাম, তবুও আমরা জাতীয় পরিষদের অধিবেশনে যাব এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হওয়া সত্বেও কেউ যদি ন্যায্য কথা বলে আমরা তা মেনে নেব, এমনকি তিনি যদি একজনও হন।

জনাব ভুট্টো ঢাকা এসেছিলেন। তাঁর সঙ্গে আলোচনা হলো। ভুট্টো সাহেব বলে গেছেন আলোচনার দরজা বন্ধ নয়; আরো আলোচনা হবে। মওলানা নুরানী ও মুফতি মাহুমুদ সহ পশ্চিম পাকিস্তানের অন্যান্য পার্লামেন্টারী নেতা এলেন, তাদের সঙ্গে আলোচনা হলো- উদ্দেশ্য ছিলো আলাপ-আলোচনা করে শাসনতন্ত্র রচনা করবো। তবে তাদের আমি জানিয়ে দিয়েছি ৬-দফা পরিবর্তনের কোন অধিকার আমার নেই, এটা জনগণের সম্পদ।
কিন্তু ভুট্টো হুমকি দিলেন। তিনি বললেন, এখানে এসে 'ডবল জিম্মী' হতে পারবেন না। পরিষদ কসাই খানায় পরিণত হবে। তিনি পশ্চিম পাকিস্তানী সদস্যদের প্রতি হুমকি দিলেন যে, পরিষদের অধিবেশনে যোগ দিলে রক্তপাত করা হবে, তাদের মাথা ভেঙে দেয়া হবে। হত্যা করা হবে। আন্দোলন শুরু হবে পেশোয়ার থেকে করাচী পর্যন্ত। একটি দোকানও খুলতে দেয়া হবে না।

তা সত্বেও পয়ত্রিশ জন পশ্চিম পাকিস্তানী সদস্য এলেন। কিন্ত পয়লা মার্চ ইয়াহিয়া খান পরিষদের অধিবেশন বন্ধ করে দিলেন। দোষ দেয়া হলো, বাংলার মানুষকে, দোষ দেয়া হলো আমাকে, বলা হলো আমার অনমনীয় মনোভাবের জন্যই কিছু হয়নি।

এরপর বাংলার মানুষ প্রতিবাদ মুখর হয়ে উঠলো। আমি শান্তিপূর্ণ সংগ্রাম চালিয়ে যাবার জন্য হরতাল ডাকলাম। জনগণ আপন ইচ্ছায় পথে নেমে এলো।

কিন্তু কি পেলাম আমরা? বাংলার নিরস্ত্র জনগণের উপর অস্ত্র ব্যবহার করা হলো। আমাদের হাতে অস্ত্র নেই। কিন্তু আমরা পয়সা দিয়ে যে অস্ত্র কিনে দিয়েছি বহিঃশত্রুর হাত থেকে দেশকে রক্ষা করার জন্যে, আজ সে অস্ত্র ব্যবহার করা হচ্ছে আমার নিরীহ মানুষদের হত্যা করার জন্য। আমার দুঃখী জনতার উপর চলছে গুলী।
আমরা বাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ যখনই দেশের শাসনভার গ্রহণ করতে চেয়েছি, তখনই ষড়যন্ত্র চলেছে-আমাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে।

ইয়াহিয়া খান বলেছেন, আমি নাকি ১০ই মার্চ তারিখে গোলটেবিল বৈঠকে যোগদান করতে চেয়েছি, তাঁর সাথে টেলিফোন আমার আলাপ হয়েছে। আমি তাঁকে বলেছি আপনি দেশের প্রেসিডেণ্ট, ঢাকায় আসুন দেখুন আমার গরীব জনসাধারণকে কি ভাবে হত্যা করা হয়েছে, আমার মায়ের কোল খালি করা হয়েছে ।
আমি আগেই বলে দিয়েছি কোন গোলটেবিল বৈঠক হবে না। কিসের গোলটেবিল বৈঠক? কার গোলটেবিল বৈঠক? যারা আমার মা বোনের কোল শূন্য করেছে তাদের সাথে বসবো আমি গোলটেবিল বৈঠকে ?
তেসরা তারিখে পল্টনে আমি অসহযোগের আহবান জানালাম। বললাম, অফিস-আদালত, খাজনা-ট্যাক্স বন্ধ করুন।আপনারা মেনে নিলেন।

হঠাৎ আমার সঙ্গে বা আমাদের সঙ্গে আলোচনা না করে একজনের সঙ্গে পাঁচ ঘণ্টা বৈঠকের পর ইয়াহিয়া খান যে বক্তৃতা করেছেন, তাতে সমস্ত দোষ আমার ও বাংলার মানুষের উপর চাপিয়ে দিয়েছেন। দোষ করলেন ভুট্টো- কিন্তু গুলী করে মারা হলো আমার বাংলার মানুষকে। আমরা গুলী খাই, দোষ আমাদের- আমরা বুলেট খাই, দোষ আমাদের।

ইয়াহিয়া সাহেব অধিবেশন ডেকেছেন। কিন্ত আমার দাবী সামরিক আইন প্রত্যাহার করতে হবে, সেনাবাহিনীকে ব্যারাকে ফিরিয়ে নিতে হবে, হত্যার তদন্ত করতে হবে। তারপর বিবেচনা করে দেখবো পরিষদে বসবো কি বসনো না। এ দাবী মানার আগে পরিষদে বসার কোন প্রশ্নই ওঠে না, জনগণ আমাকে সে অধিকার দেয়নি। রক্তের দাগ এখনো শুকায়নি, শহীদদের রক্ত মাড়িয়ে ২৫ তারিখে পরিষদে যোগ দিতে যাব না।

ভাইয়েরা, আমার উপর বিশ্বাস আছে? আমি প্রধানমন্ত্রীত্ব চাইনা, মানুষের অধিকার চাই। প্রধান মন্ত্রীত্বের লোভ দেখিয়ে আমাকে নিতে পারেনি, ফাঁসীর কাষ্ঠে ঝুলিয়ে নিতে পারেনি। আপনারা রক্ত দিয়ে আমাকে ষড়যন্ত্র মামলা থেকে মুক্ত করে এনেছিলেন। সেদিন এই রেসকোর্সে আমি বলেছিলাম, রক্তের ঋণ আমি রক্ত দিয়ে শোধ করবো; মনে আছে? আজো আমি রক্ত দিয়েই রক্তের ঋণ শোধ করতে প্রস্তুত।

আমি বলে দিতে চাই, আজ থেকে কোর্ট-কাচারী, হাইকোর্ট, সুপ্রীম কোর্ট, অফিস, আদালত, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমুহ অনির্দিষ্ট-কালের জন্য বন্ধ থাকবে। কোন কর্মচারী অফিস যাবেন না। এ আমার নির্দেশ।

গরীবের যাতে কষ্ট না হয় তার জন্য রিক্সা চলবে, ট্রেন চলবে আর সব চলবে। ট্রেন চলবে- তবে সেনাবাহিনী আনা-নেয়া করা যাবে না। করলে যদি কোন দূর্ঘটনা ঘটে তার জন্য আমি দায়ী থাকবো না। সেক্রেটারিয়েট, সুপ্রীম কোর্ট, হাইকোর্ট জজকোর্ট সহ সরকারী, আধা-সরকারী এবং স্বায়ত্তশাসিত সংস্থাগুলো বন্ধ থাকবে। শুধু পূর্ব বাংলার আদান-প্রদানের ব্যাঙ্কগুলো দু-ঘন্টার জন্য খোলা থাকবে। পূর্ব বাংলা থেকে পশ্চিম পাকিস্তানে টাকা যেতে পারবেন না। টেলিগ্রাফ, টেলিফোন বাংলাদেশের মধ্যে চালু থাকবে। তবে, সাংবাদিকরা বহির্বিশ্বে সংবাদ পাঠাতে পারবেন।

এদেশের মানুষকে খতম করা হচ্ছে, বুঝে শুনে চলবেন। দরকার হলে সমস্ত চাকা বন্ধ করে দেয়া হবে।
আপনারা নির্ধারিত সময়ে বেতন নিয়ে আসবেন। যদি একটিও গুলী চলে তাহলে বাংলার ঘরে ঘরে দূর্গ গড়ে তুলবেন। যার যা আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করতে হবে। রাস্তা ঘাট বন্ধ করে দিতে হবে। আমরা তাদের ভাতে মারবো-পানিতে মারবো। হুকুম দিবার জন্য আমি যদি না থাকি, আমার সহকর্মীরা যদি না থাকেন, আপনারা আন্দোলন চালিয়ে যাবেন।

তোমরা আমার ভাই, তোমরা ব্যারাকে থাকো, কেউ কিছু বলবেনা। গুলী চালালে আর ভাল হবে না। সাত কোটি মানুষকে আর দাবীয়ে রাখতে পারবা না। বাঙ্গালী মরতেশিখেছে, তাদের কেউ দাবাতে পারবে না। শহীদদের ও আহতদের পরিবারের জন্য আওয়ামী লীগ সাহায্যে কমিটি করেছে। আমরা সাহায্যের চেষ্টা করবো। আপনারা যে যা পারেন দিয়ে যাবেন।

সাত দিনের হরতালে যে সব শ্রমিক অংশ গ্রহণ করেছেন, কারফিউর জন্য কাজ করতে পারেননি-শিল্প মালিকরা তাদের পুরো বেতন দিয়ে দেবেন।

সরকারী কর্মচারীদের বলি, আমি যা বলি তা মানতে হবে। কাউকে যেন অফিসে দেখা না যায়। এ দেশের মুক্তি না হওয়া পর্যন্ত খাজনা-ট্যাক্স বন্ধ থাকবে। আপনারা আমার উপর ছেড়ে দেন, আন্দোলন কিভাবে করতে হয় আমি জানি।

কিন্তু হুঁশিয়ার, একটা কথা মনে রাখবেন, আমাদের মধ্যে শত্রু ঢুকেছে, ছদ্মবেশে তারা আত্মকহলের সৃষ্টি করতে চায়। বাঙ্গালী-অবাঙ্গালী, হিন্দু-মুসলমান সবাই আমাদের ভাই, তাদের রক্ষা করার দায়িত্ব আমাদের।
রেডিও, টেলিভিশন ও সংবাদপত্র যদি আমাদের আন্দোলনের খবর প্রচার না করে তবে কোন বাঙ্গালী রেডিও এবং টেলিভিশনে যাবেন না।

শান্তিপূর্ণভাবে ফয়সালা করতে পারলে ভাই ভাই হিসাবে বাস করার সম্ভাবনা আছে, তা না হলে নেই। বাড়াবাড়ি করবেন না, মুখ দেখাদেখিও বন্ধ হয়ে যেতে পারে।

প্রস্তুত থাকবেন, ঠাণ্ডা হলে চলবে না। আন্দোলন ও বিক্ষোভ চালিয়ে যাবেন। আন্দোলন ঝিমিয়ে পড়লে তারা আমাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়বে। শৃংখলা বজায় রাখুন। শৃংখলা ছাড়া কোন জাতি সংগ্রামে জয়লাভ করতে পারে না।

আমার অনুরোধ প্রত্যেক গ্রামে, মহল্লায়, ইউনিয়নে, আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে সংগ্রাম কমিটি গড়ে তুলুন। হাতে যা আছে তাই নিয়ে প্রস্তুত থাকুন। রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরও দেবো। এদেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো ইনশাল্লাহ।

এবারের সংগ্রাম, মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম, স্বাধীনতার সংগ্রাম।

জয় বাংলা।

জনপ্রিয় পোস্টসমূহ