১০ সেপ্টেম্বর, ২০০৮

স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র

স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক ১৯৭১ সালের এপ্রিল ১৭ তারিখে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষিত একটি ঘোষণাপত্র। যতদিন বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ চলেছে ততদিন মুজিবনগর সরকার পরিচালনার অন্তর্বর্তীকালীন সংবিধান হিসেবে এই ঘোষণাপত্র কার্যকর ছিল। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম হওয়ার পরও এই ঘোষণাপত্র সংবিধান হিসেবে কার্যকর ছিল। ১৯৭২ সালের ডিসেম্বর ১৬ তারিখে যখন দেশের নতুন সংবিধান প্রণীত হয় তখন সংবিধান হিসেবে এর কার্যকারিতার সমাপ্তি ঘটে।

ইতিহাস


১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তান সামরিক বাহিনী ঢাকা এবং তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের অন্যান্য অংশে আক্রমণ চালিয়ে ব্যাপক গণহত্যা চালায়। এই গণগত্যার প্রাক্কালে তৎকালীন আওয়মী লীগ নেতৃবৃন্দ, গণপরিষদ ও প্রাদেশিক পরিষদের সদস্যগণ নিরাপত্তার জন্য সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতে গিয়ে আশ্রয় নেন। ৩০ মার্চের মধ্যেই তাদের অনেকে কলকাতায় সমবেত হন। প্রাদেশিক পরিষদের যেসকল সদস্য ১০ এপ্রিলের মধ্যে কলকাতায় মিলিত হতে সমর্থ হন তারা তারা ঐদিনই একটি প্রবাসী আইন পরিষদ গঠন করে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের খসড়া প্রণয়ন করেন। এপ্রিল ১৭ তারিখে মেহেরপুর জেলার সীমান্তবর্তী স্থান বৈদ্যনাথতলায় (পরবর্তী নাম মুজিবনগর) এক অনাড়ম্বর অনুষ্ঠানে গণপরিষদের সদস্য এম ইউসুফ আলী আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পাঠ করেন। এই ঘোষণার মাধ্যমে নবগঠিত প্রবাসী আইন পরিষদ বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব ঘোষণা করে। এদিনই ২৬ মার্চের স্বাধীনতার ঘোষণাকে আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদন দেয়া হয় এবং একই সাথে ২৬ মার্চ থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা কার্যকর হয়েছে বলে ঘোষণা করা হয়। এর ফলে প্রবাসী মুজিবনগর সরকারও বৈধ বলে স্বীকৃত হয়। এ ঘোষণায় মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সকলের মধ্যে চেইন অফ কমান্ড স্থাপনের নির্দেশ দেয়া হয়।

ঘোষণাপত্রের পূর্ণ বিবরণ

মুজিবনগর, বাংলাদেশ

তারিখ: ১০ এপ্রিল ১৯৭১

যেহেতু ১৯৭০ সালের ৭ ডিসেম্বর থেকে ১৯৭১ সালের ১৭ জানুয়ারি পর্যন্ত বাংলাদেশে অবাধ নির্বাচনের মাধ্যমে শাসনতন্ত্র রচনার উদ্দেশ্যে প্রতিনিধি নির্বাচিত করা হয়েছিল; এবং
যেহেতু এই নির্বাচনে বাংলাদেশের জনগণ ১৬৯টি আসনের মধ্যে আওয়ামী লীগ দলীয় ১৬৭ জন প্রতিনিধি নির্বাচিত করেছিল;
এবং
যেহেতু জেনারেল ইয়াহিয়া খান ১৯৭১ সনের ৩রা মার্চ তারিখে শাসনতন্ত্র রচনার উদ্দেশ্যে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের অধিবেশন আহ্বান করেন; এবং
যেহেতু তিনি আহূত এই অধিবেশন স্বেচ্ছার এবং বেআইনীভাবে অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করেন; এবং
যেহেতু পাকিস্তান কর্তৃপক্ষ তাদের প্রতিশ্রুতি পালন করার পরিবর্তে বাংলাদেশের জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে পারষ্পরিক আলোচনাকালে ন্যায়নীতি বহির্ভূত এবং বিশ্বাসঘাতকতামূলক যুদ্ধ ঘোষণা করেন; এবং
যেহেতু উল্লিখিত বিশ্বাসঘাতকতামূলক কাজের জন্য উদ্ভূত পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষের অবিসংবাদিত নেতা শেখ মুজিবুর রহমান জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার অর্জনের আইনানুগ অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য ১৯৭১ সালের ২৬শে মার্চ ঢাকায় যথাযথভাবে স্বাধীনতা ঘোষণা করেন, এবং বাংলাদেশের অখণ্ডতা ও মর্যাদা রক্ষার জন্য বাংলাদেশের জনগণের প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানান; এবং
যেহেতু পাকিস্তান কর্তৃপক্ষ বর্বর ও নৃশংস যুদ্ধ পরিচালনা করেছে এবং এখনও বাংলাদেশের বেসামরিক ও নিরস্ত্র জনগণের বিরুদ্ধে নজিরবিহীন গণহত্যা ও নির্যাতন চালাচ্ছে; এবং
যেহেতু পাকিস্তান সরকার অন্যায় যুদ্ধ ও গণহত্য এবং নানাবিধ নৃশংস অত্যাচার পরিচালনার দ্বারা বাংলাদেশের গণপ্রতিনিধিদের পক্ষে একত্রিত হয়ে শাসনতন্ত্র প্রণয়ন করে জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠা করা অসম্ভব কে তুলেছে; এবং
যেহেতু বাংলাদেশের জনগণ তাদের বীরত্ব, সাহসিকতা ও বিপ্লবী কার্যক্রমের মাধ্যমে বাংলাদেশের উপর তাদের কার্যকরি কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছে;

সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী বাংলাদেশের জনগণ নির্বাচিত প্রতিনিধিদের প্রতি যে ম্যান্ডেট দিয়েছেন সে ম্যান্ডেট মোতাবেক আমরা, নির্বাচিত প্রতিনিধিরা, আমাদের সমবায়ে গণপরিষদ গঠন করে পারষ্পরিক আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে বাংলাদেশের জনগণের জন্য সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করার উদ্দেশ্যে

বাংলাদেশকে একটি সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্র ঘোষণা করছি এবং এর দ্বারা পূর্বাহ্নে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বাধীনতা ঘোষণা অনুমোদন করছি; এবং

এতদ্বারা আমরা আরও সিদ্ধান্ত ঘোষণা করছি যে শাসনতন্ত্র প্রণীত না হওয়া পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রপ্রধান এবং সৈয়দ নজরুল ইসলাম উপ-রাষ্ট্রপ্রধান পদে অধিষ্ঠিত থাকবেন; এবং

রাষ্ট্রপ্রধান প্রজাতন্ত্রের সশস্ত্র বাহিনীসমূহের সর্বাধিনায়ক পদে অধিষ্ঠিত থাকবেন; ক্ষমা প্রদর্শনের ক্ষমতাসহ সর্বপ্রকার প্রশাসনিক ও আইন প্রণয়নের ক্ষমতার অধিকারী থাকবেন; এবং

তাঁর কর ধার্য ও অর্থব্যয়ের ক্ষমতা থাকবে; এবং

বাংলাদেশের জনসাধারণের জন্য আইনানুগ ও নিয়মতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠার জন্য অন্যান্য প্রয়োজনীয় সকল ক্ষমতারও তিনি অধিকারী হবেন।

বাংলাদেশের জনগণ দ্বারা নির্বাচিত প্রতিনিধি হিসাবে আমরা আরও সিদ্ধান্ত ঘোষণা করছি যে, কোন কারণে যদি রাষ্ট্রপ্রধান না থাকেন অথবা যদি রাষ্ট্রপ্রধান কাজে যোগদান করতে না পারেন অথবা তাঁর দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনে যদি অক্ষম হন, তবে রাষ্ট্রপ্রধান প্রদত্ত সকল দায়িত্ব উপ-রাষ্ট্রপ্রধান পালন করবেন। আমরা আরও সিদ্ধান্ত ঘোষণা করছি যে, বিশ্বের একটি জাতি হিসাবে এবং জাতিসংঘের সনদ মোতাবেক আমাদের উপর যে দায়িত্ব ও কর্তব্য বর্তেছে তা যথাযথভাবে আমরা পালন করব। আমরা আরও সিদ্ধান্ত ঘোষণা করছি যে, আমাদের এই স্বাধীনতার ঘোষণা ১৯৭১ সনের ২৬শে মার্চ থেকে কার্যকর বলে গণ্য হবে। আমরা আরও সিদ্ধান্ত ঘোষণা করছি যে, আমাদের এই সিদ্ধান্ত কার্যকর করার জন্য আমরা অধ্যাপক এম. ইউসুফ আলীকে যথাযথভাবে রাষ্ট্রপ্রধান ও উপ-রাষ্ট্রপ্রধানের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান পরিচালনার জন্য দায়িত্ব অর্পণ ও নিযুক্ত করলাম।

স্বাক্ষর: অধ্যাপক এম. ইউসুফ আলী

বাংলাদেশ গণপরিষদের ক্ষমতা দ্বারা

এবং ক্ষমতাবলে যথাবিধি সর্বাধিক ক্ষমতাধিকারী।

আইনের ধারাবাহিকতা বলবৎকরণ আদেশ ১৯৭১

বাংলাদেশের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে প্রদত্ব ক্ষমতাবলে একটি দিনে আইনের ধারাবাহিকতা বলবৎকরণ আদেশ নামে একটি আদেশ জারি করেন। ঘোষণাপত্রের সাথে সামঞ্জস্য রেখে ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পর্যন্ত বাংলাদেশে যে সকল আইন চালু ছিল, তা রক্ষার্থে এই আদেশ বলবৎ করা হয়।

পূর্ণ বিবরণ

আইনের ধারাবাহিকতা বলবৎকরণ আদেশ ১৯৭১

মুজিবনগর, বাংলাদেশ, ১০ এপ্রিল ১৯৭১, শনিবার ১২ চৈত্র ১৩৭৭

আমি বাংলাদেশের উপ-রাষ্ট্রপতি এবং অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, স্বাধীনতা ঘোষণাপত্র প্রদত্ত ক্ষমতাবলে ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল তারিখে এ আদেশ জারি করছি যে, ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পর্যন্ত বাংলাদেশে যে সকল আইন চালু ছিল, তা ঘোষণাপত্রের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে একইভাবে চালু থাকবে, তবে প্রয়োজনীয় সংশোধনী সার্বভৌম স্বাধীন বাংলাদেশ গঠনের জন্য করা যাবে। এই রাষ্ট্র গঠন বাংলাদেশের জনসাধারণের ইচ্ছায় হয়েছে। এক্ষণে, সকল সরকারি, সামরিক, বেসামরিক, বিচার বিভাগীয় এবং কূটনৈতিক কর্মকর্তা ও কর্মচারী যারা বাংলাদেশের প্রতি আনুগত্যের শপথ গ্রহণ করেছেন, তারা এতদিন পর্যন্ত নিয়োগবিধির আওতায় যে শর্তে কাজে বহাল ছিলেন, সেই একই শর্তে তারা চাকুরিতে বহাল থাকবেন। বাংলাদেশের সীমানায় অবস্থিত সকল জেলা জজ এবং জেলা ম্যাজিস্ট্রেট এবং সকল কূটনৈতিক প্রতিনিধি যারা অন্যত্র অবস্থান করছেন, তারা সকল সরকারি কর্মচারীকে স্ব স্ব এলাকায় আনুগত্যের শপথ গ্রহণের ব্যবস্থা করবেন।

এই আদেশ ১৯৭১ সালের ২৬শে মার্চ থেকে কার্যকর করা হয়েছে বলে গণ্য করতে হবে।

স্বাক্ষর:- সৈয়দ নজরুল ইসলাম

অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি

তথ্যসূত্র

* বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ: দলিলপত্র, তৃতীয় খণ্ড, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তথ্য মন্ত্রণালয়, ঢাকা, ১৯৮২, পৃষ্ঠা ৪-৭

* বাংলাপিডিয়া নিবন্ধ: স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র। লেখক: সাজাহান মিয়া।

বাংলা উইকিপিডিয়া

২ সেপ্টেম্বর, ২০০৮

স্বাধীনতা- মার্চের দিনগুলি ও ৭ মার্চের বিতর্ক

নির্মল সেন

১ মার্চ ১৯৭১ সাল। প্রেস ক্লাবে বসেছিলাম। হঠাৎ শুনলাম একটি কণ্ঠ। সেই কণ্ঠের অধিকারী প্রেস ক্লাবে ঢুকেই বলল, ‘সর্বনাশ হো গিয়া।’ আমি তার দিকে তাকালাম। সে লোকটি আর কেউ না, পাকিস্তান ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি আসরার আহমদ। তখন সারা পাকিস্তানে এই ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নই একমাত্র অবিভক্ত ছিল। আমি আসরারের দিকে তাকালাম, বললাম ‘কেয়া হুয়া?’ আসরার সবেমাত্র পিআইএ বিমানে রাওয়ালপিন্ডি থেকে ঢাকায় পৌঁছেছে। সে বলল, পাকিস্তানে প্রেসিডেন্ট আগা মোহাম্মদ ইয়াহিয়া জাতীয় সংসদের অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করেছে। এর ফল যে ভালো হবে না তা সবাই জানে। ৭ ডিসেম্বর নির্বাচন হয়েছে, শেখ মুজিবুর রহমান সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা নির্বাচিত হয়েছেন। তারই প্রধানমন্ত্রী হওয়ার কথা। কিন্তু প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া নানা টালবাহানা করে শেখ সাহেবকে মন্ত্রিসভা করতে ডাকছেন না। কারণ পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর অন্য একটি ধারণা এবং পরিকল্পনা ছিল। সেনাবাহিনী ভেবেছিল, শেখ সাহেব নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে না। বাকি দলগুলো সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে। তাই তাদের কাছে নির্বিঘ্নে ক্ষমতা হস্তান্তর করবে। কিন্তু জনতার রায় ছিল ভিন্ন। তারা শেখ সাহেবকে সংখ্যাগরিষ্ঠতা দিল। কিন্তু সামরিক বাহিনী শেখ সাহেবকে ক্ষমতা দিতে রাজি নয়। তাই নানা টালবাহানা শুরু করেছিল। সর্বশেষ ইয়াহিয়া বলেছিল, ৩ মার্চ জাতীয় সংসদের অধিবেশন বসবে। কিন্তু সেই অধিবেশন না বসার খবর নিয়েই বিভ্রান্ত হয়ে আসরার ঢাকায় এসেছিল।
এছাড়া আসরারের ঢাকা আসার অন্যতম কারণ ছিল, এ পরিস্থিতিতে কি করা যায়, তা পরামর্শ করতে হবে। তার সাধারণ সম্পাদক মিনহাজ বার্না পাকিস্তান টাইমসের প্রতিনিধি। তিনি ঢাকায় থাকেন। তার সঙ্গে আলাপ করতে হবে। আর ইউনিয়নের প্রধান নেতা হলো খন্দকার গোলাম মোস্তফা, যিনি সমধিক কেজি মোস্তফা নামে পরিচিত। তার সঙ্গে পরামর্শ না করে ইউনিয়ন চলতে পারে না। এই দুই কারণে আসরার ঢাকায় এসেছিল। কেজি মোস্তফা যে সারা পাকিস্তানের সাংবাদিকদের মধ্যে এত জনপ্রিয় তা বোঝাতে হলে একটি ঘটনার কথা বলি।

পাকিস্তানের শেষ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের সম্মেলন বসেছে ইসলামাবাদে। তখন ইউনিয়নে আলোচনা চলছিল, প্রুফ রিডার ও কাতিবদের ইউনিয়নে সদস্য পদ দেওয়া হবে কি-না। পূর্ব পাকিস্তানে প্রুফ রিডাররা আগেই ইউনিয়নের সদস্য ছিল। কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তানে কাতিবরা ছিল না। রাওয়ালপিন্ডি সম্মেলনে আমি একটি প্রস্তাব তুললাম, এবারে কাতিবদের ইউনিয়নের সদস্যপদ দেওয়া হোক। পশ্চিম পাকিস্তানের সদস্যরা একযোগে চিৎকার করে উঠল, না হবে না। আমি বললাম আপনারা কি জানেন আমার প্রস্তাবের সমর্থক কেজি মোস্তফা। এ কথা শুনে সবাই চুপ করে গেল। সবাই পরে বলল তোমার প্রস্তাব এক বছরের জন্য স্থগিত থাক। শুধু কেজি মোস্তফা নামের গুণে এটা সম্ভব হয়েছিল। এ ধরনের ছিল সারা পাকিস্তানের সাংবাদিকদের মধ্যে কেজি মোস্তফার জনপ্রিয়তা। আজকে কেজি মোস্তফা ঢাকায় থাকেন। মাঝেমধ্যে বিভিন্ন পত্রিকায় লেখালেখি করেন। তবে ইয়াহিয়ার ঘোষণায় যে প্রতিক্রিয়া হলো তা আমরা অচিরেই টের পেলাম। সেদিন দুপুরে হোটেল পূর্বাণীতে আওয়ামী লীগের সংবাদ সম্মেলন ছিল। সে সম্মেলন ছাত্র এবং জনতা, অফিস কর্মচারীসহ সবাই ঘেরাও করল। তাদের দাবি এখনি বাংলাদেশ স্বাধীন করতে হবে। সমস্ত বাংলাদেশে আকাশ-বাতাস মথিত হলো একটি শ্লোগানে। সেই শ্লোগানটি হলো বাংলাদেশের স্বাধীনতা চাই; স্বাধীন বাংলা চাই। অবাঙালিদের সঙ্গে আমরা থাকব না। সেদিন বুঝিয়ে-সুঝিয়ে জনতাকে শেখ সাহেব নিবৃত্ত করলেন। বলা হলো, রেসকোর্সে ৭ মার্চ শেখ সাহেব ভাষণ দেবেন। আমরা সেই ৭ মার্চের ভাষণের জন্য গভীর প্রতীক্ষায় ছিলাম। এর মধ্যে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ স্বাধীনতা ঘোষণা পাঠ করেছে। স্বাধীনতার পতাকা উত্তোলন করেছে। শেষ পর্যন্ত ৭ মার্চ এলো। তারপর ৭ মার্চ রেসকোর্স লোকে লোকারণ্য। দক্ষিণ রমনা কালীবাড়ি, উত্তরে ঢাকা ক্লাব, মানুষ যেন উপচে পড়ছে। চারদিক মানুষ যেন আসছে আর আসছে। সবার হাতে লাঠি। এ যেন রেসকোর্সে যুদ্ধ করে বাংলাদেশ স্বাধীন করবে। সবার কণ্ঠে স্বাধীনতা চাই। আজকে এ মুহূর্তে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা চাই, মঞ্চে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতারা। তাদের কণ্ঠে আমাদের নেতা পাকিস্তানের পার্লামেন্টে যাবেন না। শেখ মুজিব পাঞ্জাবিদের পার্লামেন্টে যাবেন না। পাঞ্জাবিদের পার্লামেন্ট মানি না মানি না, সবাই হাতে অস্ত্র ধর বাংলাদেশ স্বাধীন কর।
শেখ সাহেব জনসভায় আসার আগেই জনসভা মুখরিত হয়ে উঠল। এক দফা এক দাবি, বাংলাদেশের স্বাধীনতা। আমাদের নেতা পাঞ্জাবিদের পার্লামেন্টে যাবেন না।

এর মধ্যে শেখ সাহেব জনসভায় এসে পৌঁছলেন। তখন লাখ জনতার কণ্ঠে বাংলাদেশের স্বাধীনতার দাবি, তারা বারবার বলছে, পাঞ্জাবিদের পার্লামেন্টে আমাদের নেতা যাবেন না। এরপর বজ্রনির্ঘোষের মতো গগনবিদারী কণ্ঠে তার ভাষণ শুরু করলেন। এমন সুলিখিত ভাষণ কোনোদিন শুনিনি। কি ভাষণ? আর শেখ সাহেবের কি গগনবিদারী কণ্ঠ? গোটা জনসভায় এক উন্মাদনা সৃষ্টি করল। শেখ সাহেবের ভাষণের মাঝে মাঝে পেছনের দিকে তাকাচ্ছিলেন। পেছনে ছিল ছাত্রলীগ নেতারা। তিনি এবারের সংগ্রাম, মুক্তি সংগ্রাম বলে একটু থামলেন এবং পেছনে ছাত্রলীগ নেতা সিরাজুল আলম খানের কাছে কি যেন জিজ্ঞাসা করলেন। তারপর তিনি বললেন, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। জয় বাংলা, জয় পাকিস্তান। শেখ সাহেবের মঞ্চে সামনের সারিতে চেয়ারে আমি ও আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী বসে ছিলাম, যেন মন্ত্রমুগ্ধের মতো। শেখ সাহেবের ভাষণের প্রতিটি অক্ষর গোগ্রাসে গিলছিলাম। এরপর সভা ভাঙল। জনতার একটি অংশের মনে যেন কিছু না পাওয়ার ক্ষোভ থেকে গেল। তারা সবাই ওইদিনই চেয়েছিল শেখ সাহেব স্বাধীনতা ঘোষণা করুক। কিন্তু তা শেখ সাহেবের পক্ষে আদৌ সম্ভব ছিল না। তিনি অনুভব করেছিলেন, সংগ্রামের সময় উপস্থিত না-ও থাকতে পারেন। এই দুরদৃষ্টির ফলে তিনি বলেছিলেন আমি যদি নির্দেশ দিতে না পারি তাহলে তোমাদের কাছে নির্দেশ রইল যার যা আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করবে। এরচেয়ে স্বাধীনতা সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ার আর কি নির্দেশ থাকতে পারে? আজকে যারা বলেন, শেখ সাহেব সেদিন স্বাধীনতার ঘোষণা দেননি, তারা কি বলতে পারেন এর চেয়ে স্বাধীনতার ঘোষণা বেশি কী হতে পারে? আজকেও একদল লোক বলেন, জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন। সেই স্বাধীনতার ঘোষক সম্পর্কে আমি বলতে চাই, স্বাধীনতার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে নির্মাণ করেছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি সব তৈরি করে গিয়েছিলেন এবং সে ক্ষেত্রে জিয়াউর রহমান নিশ্চয়ই সাহস দেখিয়েছেন। কিন্তু সে সাহস হলো একজন বেতার ঘোষকের সাহস। তার আগে এবং পেছনে সবকিছু প্রস্ট‘ত করে রেখেছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান। তবে একথা সত্য, শেখ সাহেব ৭ মার্চের বক্তব্যের শেষদিকে বলেছিলেন, ‘জয় বাংলা, জয় পাকিস্তান’।

আমি জানি, আমার এ বক্তব্য নিয়ে বিতর্ক আছে, কানাডা থেকে একদল ছেলে লিখে জানিয়েছেন, আপনি মিথ্যা লিখেছেন। কানাডা কেন? ঢাকারও অধিকাংশ লোকের বিশ্বাস আমি মিথ্যা বলেছি। তবে আমার দৃঢ় বিশ্বাস, আমার স্মৃতি আমাকে বিভ্রান্ত করেনি। এবং আমার মতে, সেদিন জয় পাকিস্তান বলে শেখ সাহেব সঠিক কাজ করেছিলেন। একজন বিজ্ঞ রাজনীতিবিদ হিসেবে পরিচয় দিয়েছিলেন। ৭ মার্চের ভাষণ সম্পর্কে আমি একটি ভিন্ন কথা শুনেছি। বিশেষ করে বামপন্থী মহল এটা বলেছে। তারা সমালোচনা করেছে, শেখ সাহেব স্বাধীনতা ঘোষণা দিলেন না কেন? আবার একই মুখে বলেছেন শেখ সাহেব বুর্জোয়া নেতা। তিনি কিছুতেই স্বাধীনতা ঘোষণা দিতে পারেন না। আমার মত হচ্ছে, জয় পাকিস্তান না বলে কোনো উপায় ছিল না। তখনো আলোচনা শেষ হয়নি। ক’দিন পর ইয়াহিয়াদের সঙ্গে আলোচনা করার কথা। একটি লোকও স্বাধীনতা সংগ্রামের জন্য প্রস্তুত নয়। সেদিন যদি জয় পাকিস্তান না বলে শুধু ‘জয় বাংলা’ বলতেন এবং স্বাধীনতার ঘোষণা দিতেন তাহলে ইয়াহিয়া বাহিনী মারমুখী আক্রমণ করত। লাখ লাখ লোক প্রাণ হারাতো। তখন এই মহলটিই বলত জনতাকে কোনো প্রস্তুত না করে এ ধরনের স্বাধীনতা ঘোষণা বালখিল্যতা। এ জন্যই অসংখ্য লোকের প্রাণহানি হয়েছে এবং এর জন্যই শেখ মুজিবের বিচার হওয়া উচিত।

এছাড়া জয় পাকিস্তান বলা সম্পর্কে আমার সঙ্গে শেখ সাহেবের আলাপ হয়েছিল। আমি বললাম, আপনি জয় পাকিস্তান বললেন কেন? শেখ সাহেবের মুখ কালো হয়ে গেল। এরপর তিনি বললেন, ‘আমরা খাবার টেবিলে ছেলেমেয়ে সবাই খেতে বসতাম। প্রথমে আমরা এক হাতের পাঁচটি আঙ্গুল অপর হাতের একটি আঙ্গুল অর্থাৎ ছয়টি আঙ্গুল দেখাতাম। অর্থাৎ এই ছয়টি আঙ্গুল ছিল ছয় দফা। পরে পাঁচটি আঙ্গুল নামিয়ে ফেলতাম। বাকি থাকত একটি আঙ্গুল। অর্থাৎ এক দফা। অর্থ হচ্ছে ছয় দফার শেষ কথা হচ্ছে এক দফা বাংলাদেশের স্বাধীনতা। সেদিন পাঁচ আঙ্গুল নামিয়ে ফেলার পর আমার কনিষ্ঠপুত্র রাসেল জিজ্ঞাসা করেছিল। তুমি আজকের জনসভায় জয় পাকিস্তান বলতে গেলে কেন?

আমি কি রাসেলের প্রশ্নের জবাব আপনাকে দেব? আমাকে স্বাধীনতার ঘোষণা দিতে হলে অনেক পথ অতিত্রক্রম করতে হবে। ইয়াহিয়ার সামরিক সরকারকে শেষ কথা বলতে হবে। পশ্চিম পাকিস্তানের নেতাদের সঙ্গে কথা বলতে হবে। সবচেয়ে ভয়াবহ হচ্ছে ভুট্টো। তার সঙ্গেও কথা বলতে হবে। আমি এই আলোচনা শেষ না করে কিছু করলে পৃথিবীতে আমি জবাবদিহি করতে পারব না। আমি এখন ভালো অবস্থানে আছি। সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা হয়েও আমাকে ক্ষমতা দেওয়া হচ্ছে না। এই প্রেক্ষিতে আমি কিছুটা ধমমৎবংংরাব হতে পারি মাত্র, এর বেশি কিছু নয়। আমাকে আমাদের সেনাবাহিনী ও সরকারের কর্মচারীদের সঙ্গে আলাপ করতে হবে। সেই আলাপ এখনো শেষ হয়নি। সবদিকে এত অপ্রস্তুত রেখে একটি দেশকে আমি সংগ্রামের মুখে ঠেলে দিতে পারি না। আপনি কি বোঝেন না ওইদিন চারদিকে শত্রু বেষ্টিত অবস্থায় আমার অন্য কিছু বলার ছিল না। এই হচ্ছে ৭ মার্চ শেখ সাহেবের বক্তব্য সম্পর্কে আমার ব্যাখ্যা। আমার এই বক্তব্যের বিরুদ্ধে এখনো অনেক মন্তব্য শুনি। কিন্তু তাদের কি স্মরণ নেই, ২৫ মার্চ কি অগোছালো অবস্থায় স্বাধীনতা সংগ্রাম শুরু হয়েছিল? এটা যদি ৭ মার্চ হতো তাহলে আরো লাখ লাখ প্রাণ আমাদের হারাতে হতো। একথা কি সত্য নয়? যারা সেদিন শেখ সাহেবের সমালোচনা করেছিলেন, তারা বুকে হাত দিয়ে বলুন, শেখ সাহেব কি ভুল করেছিলেন? ওই ভুলটুকু না করলে আপনারা কোথায় পালিয়ে যাবেন সে সন্ধানও করার সময় পেতেন না। শেখ সাহেব যে জয় পাকিস্তান বলেছিলেন তার অন্যতম সাক্ষী আমার অনুজপ্রতিম সাংবাদিক লন্ডন প্রবাসী আবদুল গাফফার চৌধুরী। আমি জানি না, সে কথা আজ তার মনে আছে কিনা। তবে তিনি আমার সঙ্গে জনসভায় প্রথম সারিতে বসে ছিলেন।

লেখক : সাংবাদিক ও রাজনীতিক
----------
সমকাল, ২৪ মার্চ ২০০৮