২৭ ডিসেম্বর, ২০০৮

এই নরপিশাচকে ধরিয়ে দিন

১৬ ডিসেম্বরের পর বিভিন্ন দৈনিকে আত্মগোপনকারী মওলানা মান্নানকে ধরিয়ে দেবার আবেদন প্রকাশিত হয়। ০৭-০৫-১৯৭২ দৈনিক আজাদে প্রকাশিত মওলানা মান্নানকে ধরিয়ে দেবার আবেদন।

মওলানা মান্নান- ০২

শান্তি কমিটি গঠনের সূত্রপাত। টিক্কা খানের সাথে বৈঠকরত ১২ জন রাজনৈতিক নেতার সমন্বয়ে গঠিত প্রতিনিধি দলের নেতা নুরুল আমিন ও গোলাম আযম। দৈনিক পূর্বদেশ: ০৬/০৪/১৯৭১

মওলানা মান্নান- ০১

লে: জেনারেল নিয়াজীর সাথে বৈঠকরত মাদ্রাসা শিক্ষকদের ছবি। প্রতিনিধিদলের নেতা মওলানা মান্নানকে নিয়াজীর পাশে দেখা যাচ্ছে। দৈনিক পূর্বদেশ: ২৮/০৯/১৯৭২

নির্বাচনে যুদ্ধাপরাধী প্রার্থীরা- ১০

এসএ খালেক

সমকাল প্রতিবেদক

মিরপুর ও পল্লবী নিয়ে গঠিত ঢাকা-১৪ আসন থেকে চারদলীয় জোটের প্রার্থী হয়েছেন এসএ খালেক। অভিযোগ রয়েছে, একাত্তরে তিনি ছিলেন পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর দালাল ও রাজাকার। বিএনপির সাবেক সাংসদ এমএ খালেক পাকসেনাদের হত্যাযজ্ঞের নেতৃত্বদানকারী ইয়াহিয়া খানের প্রত্যক্ষ সহযোগী ছিলেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার স্বাধীনতাবিরোধী ভূমিকার কথা জানা যায় একাত্তরে ঢাকার মোহাম্মদপুরে ইয়াহিয়া খানের সফরের আলোকচিত্র থেকে। একাত্তরে ঢাকা যখন মৃত্যুপুরী, তখন এসএ খালেক ঢাকা শহরে, বিশেষ করে মিরপুর, মোহাম্মদপুর ও পল্লবী এলাকায় পাকসেনাদের বাঙালি গণহত্যায় প্রত্যক্ষ সহযোগী হিসেবে কাজ করেছেন বলে স্থানীয় অনেকে জানান।

ওয়ার ক্রাইমস ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটি এ বছরের ৩ এপ্রিল প্রকাশিত যুদ্ধাপরাধীর তালিকায় এসএ খালেককে শান্তি কমিটির সদস্য হিসেবে উল্লেখ করে বলেছে- ‘শান্তি কমিটি গঠন করার পর ...ও আবদুল খালেককে লালবাগ থানার সংযোগ অফিসার হিসেবে নিয়োগ করে।’

একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি ২০০১ সালে প্রকাশিত ‘রাজাকারমুক্ত সংসদ চাই’ শীর্ষক পুস্তিকায় এসএ খালেকের স্বাধীনতাবিরোধী বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের কথা উল্লেখ করেছে।

ওই পুস্তিকায় বলা হয়েছে- “বর্তমান মিরপুর ও পল্লবী এলাকা নিয়ে একাত্তরে গঠিত হয়েছিল ‘মিরপুর ইউনিয়ন’। তখন মিরপুর ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য ছিলেন ১১ জন। সংক্ষেপে এদের বলা হতো ‘বিডি’ মেম্বার। এগারো বিডি মেম্বারের মধ্যে সবসময় পাঁচজন বিহারি ও ছয়জন বাঙালি সদস্য নির্বাচিত হতেন। এই ১১ সদস্যের ভোটে মিরপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হতেন। বরাবরই বাঙালি ছয় সদস্যের মধ্যে এসএ খালেক থাকতেন। কিন্তু বাঙালি হয়েও তিনি প্রতি নির্বাচনে ভোট দিতেন বিহারিদের। এর ফলে সবসময় মিরপুর ইউনিয়নে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হতেন একজন ‘বিহারি’। সেই সূত্র ধরেই তিনি একাত্তরে বিহারিদের সঙ্গে জোট বেঁধে নেমে পড়েছিলেন বাঙালি নিধনযজ্ঞে।”

ওই পুস্তিকায় বিভিন্ন সময় এসএ খালেক নিজেকে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের লোক দাবি করে একাত্তরে তার বিউটি সিনেমা হল পুড়িয়ে দেওয়া ও তার জেলে যাওয়ার প্রকৃত ঘটনার কথাও উল্লেখ করা হয়। তাতে বলা হয়- ‘...সেগুলো মোটেই সত্য নয়। এসএ খালেক বিউটি সিনেমা হলের এয়ার কন্ডিশন স্থাপনের জন্য এক বিহারির কাছ থেকে অর্থঋণ নিয়েছিলেন।

কিন্তু সেই অর্থ পরিশোধ না করায় একাত্তর সালে ওই বিহারি সিনেমা হলে আগুন লাগিয়ে দেন। এমনকি ওই বিহারি এস এ খালেকের বিরুদ্ধে মামলাও করেন।

ওই মামলার পরিপ্রেক্ষিতে এসএ খালেক একাত্তর সালে গ্রেফতার হন ও জেলে যান। অথচ দেশ স্বাধীনের পর এসএ খালেক সত্য গোপন করে মুক্তিযুদ্ধের সময় তার বিউটি সিনেমা হল পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় বিপুল পরিমাণ অর্থ নিয়েছিলেন তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের কাছ থেকে।’

লেখক-সাংবাদিক শাহরিয়ার কবির সম্পাদিত ‘একাত্তরের যুদ্ধাপরাধ এবং যুদ্ধাপরাধীদের বিচার’ গ্রন্থে মুক্তিযুদ্ধকালে ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে এসএ খালেকের একটি আলোকচিত্র রয়েছে। ওই গ্রন্থে বলা হয়েছে, ‘মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি হানাদারদের কিছু দালালের সমন্বয়ে গঠিত শান্তি কমিটির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেছেন এসএ খালেক। তার এই স্বাধীনতাবিরোধী ভূমিকার কথা ’৭১ ও ’৭২-এর পত্রপত্রিকায়ও উল্লেখ রয়েছে।’

২০০১ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থীকে হারিয়ে এসএ খালেক বিএনপির টিকিটে এ আসন থেকে সাংসদ নির্বাচিত হন। এর আগে ’৯৬ সালের নির্বাচনে প্রথম প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে পরাজিত হয়েছিলেন তিনি।

দৈনিক সমকাল, ১৮ ডিসেম্বর, ২০০৮

নির্বাচনে যুদ্ধাপরাধী প্রার্থীরা- ০৯

মাওলানা হাবিবুর রহমান

চুয়াডাঙ্গা প্রতিনিধি

দামুড়হুদা, জীবননগর ও চুয়াডাঙ্গা সদর নিয়ে গঠিত চুয়াডাঙ্গা-২ আসনে এবার চারদলীয় জোটের প্রার্থী জামায়াত জেলা ও কেন্দ্রীয় কমিটির মজলিসে শূরা সদস্য মাওলানা হাবিবুর রহমান।

একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি ছিলেন জীবননগর শান্তি কমিটির সদস্য। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বঙ্গবন্ধু সরকারের সময় দালাল আইনে যে ৭৫২ যুদ্ধাপরাধীর বিভিন্ন মেয়াদে শাস্তি হয়েছিল তাদের মধ্যে এই হাবিবুর রহমানও ছিলেন। ১৯৭২ সালের ১ জানুয়ারি তাকে দালাল আইনে গ্রেফতার করা হয়। পরে জিয়াউর রহমান সরকার দালাল আইন বাতিল করলে অন্যদের সঙ্গে তিনিও ছাড়া পান।

১৯৯৯ সালে বাংলাদেশ রিসার্চ অ্যান্ড পাবলিকেশন্সের প্রকাশিত এএসএম সামছুল আরেফিন সংকলিত ও সম্পাদিত ‘রাজাকার ও দালাল অভিযোগে গ্রেফতারদের তালিকা, ডিসেম্বর ’৭১-মার্চ ’৭২’ গ্রন্থের উদ্ধৃতি দিয়ে রাজীব আহমেদ সম্পাদিত ‘চুয়াডাঙ্গায় মুক্তিযুদ্ধ প্রত্যক্ষ বিবরণ’ গ্রন্থের ৬২ পৃষ্ঠায় বলা হয়েছে- ‘রাজাকার ও
দালাল হিসেবে চুয়াডাঙ্গা জেলায় (তৎকালীন মহকুমা) গ্রেফতার ১১৬ জনের তালিকা সন্নিবিষ্ট করা হয়েছে। স্থানীয় জনগণ এদের কর্তৃপক্ষের কাছে সোপর্দ করেন অথবা জনগণের সহযোগিতায় মুক্তিবাহিনী বা আইন প্রয়োগকারী কর্তৃপক্ষ এদের গ্রেফতার করেন।’

ওই গ্রন্থে গ্রেফতারদের যে তালিকা প্রকাশিত হয়েছে তার জীবননগর থানা অংশে মাওলানা হাবিবুর রহমানের নাম উল্লেখ রয়েছে।

এছাড়াও রাজীব আহমেদের ‘বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধা চুয়াডাঙ্গা জেলা’ শীর্ষক গ্রন্থে বলা হয়েছে, ...জীবননগরের ডা. শামসুজ্জোহা প্রথমদিকে শান্তি কমিটির সভাপতি ও পরে মাওলানা হাবিবুর রহমান শান্তি কমিটির সভাপতি হয়। (পৃ. ৩০০)।

এছাড়া জীবননগরের মুক্তিযোদ্ধা শাহাবুদ্দিন ও জীবননগর কলেজের প্রভাষক মুক্তিযোদ্ধা নজরুল ইসলামসহ স্থানীয় অনেকে জানিয়েছেন, একাত্তরে জীবননগরে পাকসেনাদের একটি শক্তিশালী ঘাঁটি ছিল। সে ঘাঁটির মূল নিয়ন্ত্রক ছিলেন মাওলানা হাবিবুর রহমান। তিনি স্বাধীনতাবিরোধীদের নেতৃত্ব দিতেন। তার নেতৃত্বেই কয়া গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা আবদুর রাজ্জাককে হাসাদহ ক্যাম্পে নিয়ে হত্যা করে লাশ গুম করা হয়।

স্বাধীনতার পর মিলাদ-মাহফিল ও ধর্মীয় সভায় বক্তব্য দিয়ে এলাকার মানুষের কাছে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন মাওলানা হাবিবুর রহমান। সেটি পুঁজি করে জাতীয় রাজনীতিতে জায়গা করে নেন তিনি। ’৯১ সালে সংসদ নির্বাচনে এই আসনে জামায়াতের প্রার্থী হিসেবে ৪৯ হাজার ৬৮৫ ভোট পেয়ে জয়লাভ করেন তিনি। ওই নির্বাচনে তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন বিএনপির মোজাম্মেল হক। তিনি পেয়েছিলেন ৪০ হাজার ২০ ভোট।
কামিল পাস মাওলানা হাবিবুর রহমানের ছাত্রজীবন কাটে কুমিল্লায়। সেখান থেকেই দাখিল পাস করেন তিনি। ছাত্রজীবন থেকেই তিনি জামায়াতের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত। এক সময় জেলা জামায়াতের নায়েবে আমির ছিলেন তিনি।

স্বাধীনতা যুদ্ধে মাওলানা হাবিবুর রহমানের ভূমিকা প্রসঙ্গে জামায়াতের জেলা আমির আনোয়ারুল হক মালিক বলেন, ‘ওই সময় পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে মাওলানা হাবিবুর রহমানের বেশ সখ্য ছিল। অনেককে তিনি পাকবাহিনীর হাত থেকে বাঁচিয়েছেন। পাকবাহিনী কাউকে ধরে নিয়ে গেলে তিনি ছাড়িয়ে এনেছেন, এমন অনেক নজির আছে। যুদ্ধের সময় কিংবা পরবর্তী সময়ে তিনি কারো ক্ষতি করেননি।’

মাওলানা হাবিবুর রহমান সমকালকে জানান, কয়া গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা রাজ্জাককে তিনি চেনেন না। ওই সময় পাকবাহিনী রাজ্জাক নামে কোনো মুক্তিযোদ্ধাকে হত্যা করেছে কি-না তাও তিনি জানেন না। তিনি বলেন, ‘আমার জনপ্রিয়তায় ঈর্ষান্বিত হয়ে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে।’

চুয়াডাঙ্গা-২ নির্বাচনী এলাকার অনেক ভোটার অভিযোগ করেছেন, ’৯১ সালের নির্বাচনে জয়লাভের পর হাবিবুর রহমান এলাকার কোনো উন্নয়ন করেননি। গলাইদড়ি ঘাটের ওপর একটি ব্রিজ নির্মাণ ছাড়া এ সময়ে তার আর কোনো কাজ নেই।

দৈনিক সমকাল, ১৮ ডিসেম্বর, ২০০৮

নির্বাচনে যুদ্ধাপরাধী প্রার্থীরা- ০৮

আবদুস সুবহান মিয়া

সমকাল প্রতিবেদক

পাবনা শহরের পাথরতলা মহল্লার মৃত নইমুদ্দিনের ছেলে আবুল বসর মোহাম্মদ আবদুস সুবহান মিয়া এবারের সংসদ নির্বাচনে পাবনা-৫ (সদর) আসনে জামায়াত তথা চারদলীয় জোট প্রার্থী। জামায়াতের সংসদীয় দলের এই সাবেক উপ-নেতা ‘মাওলানা সুবহান’ নামেই বেশি পরিচিত। তার বিরুদ্ধে রয়েছে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে সহযোগিতা, বুদ্ধিজীবী হত্যা ও গণহত্যার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ।

১৯৭১ সালে তিনি ছিলেন পাবনা জেলা জামায়াতের ভারপ্রাপ্ত আমির। তাছাড়া তিনি ছিলেন পাবনা শান্তি কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট। মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর অত্যন্ত আস্থাভাজন একজন সহযোগী ছিলেন তিনি। উর্দুতে কথা বলতে পারায় মাওলানা সুবহানের সঙ্গে পাকিস্তানি সেনাদের খুব তাড়াতাড়ি সখ্য গড়ে উঠেছিল বলে মনে করা হয়। তার ইঙ্গিতে পাবনা শহরের শত শত মানুষকে পাকবাহিনী হত্যা করে। ‘একাত্তরের ঘাতক দালাল ও যুদ্ধাপরাধীদের সম্পর্কে জাতীয় গণতদন্ত কমিশনের দ্বিতীয় রিপোর্ট’-এ (সংক্ষিপ্ত ভাষ্য) বলা হয়, ‘মাওলানা সুবহানের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় পাবনার আল বদর, রাজাকার এবং শান্তি কমিটি গঠিত হয়। মাওলানা সুবহান উর্দু ভাষায় অনর্গল কথা বলতে পারতেন বলে পাকিস্তানি বাহিনীর খুব কাছাকাছি আসতে সমর্থ হন এবং নীতিনির্ধারক হিসেবে স্বাধীনতা যুদ্ধবিরোধী ভূমিকায় তার সার্বিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করেন।’

স্থানীয় সাংবাদিক শফিকুল ইসলাম শিবলী জানান, বীর মুক্তিযোদ্ধা মাওলানা কসিমুদ্দিনকে মাওলানা সুবহানের নির্দেশে হত্যা করা হয়। এছাড়া পাবনার এডওয়ার্ড কলেজের প্রফেসর হারুন, ডাক্তার অমলেন্দু দাক্ষি, সাবেক এমএনএ এবং আওয়ামী লীগ নেতা আমিনুদ্দিন, ব্যবসায়ী আবু সাইদ তালুকদারকে মাওলানা সুবহানের নির্দেশেই হত্যা করা হয়। এছাড়া মাওলানা সুবহানের লোকজন সঙ্গীতশিল্পী সাধনকে ধরে নিয়ে গিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করে। পাবনা শহরের কালাচাঁদপাড়া এলাকায় মাওলানা সুবহানের নেতৃত্বে সুধীর চন্দ্র চৌধুরী, অশোক কুমার সাহা, গোপাল চন্দ্র চৌধুরীসহ ১১ ব্যক্তিকে গুলি করে হত্যা করা হয় বলে জানান শফিকুল ইসলাম শিবলী।

পাবনা জেলা বিএনপির সিনিয়র সহ-সভাপতি মুক্তিযোদ্ধা জহুরুল ইসলাম বিশু বলেন, ১৯৭১ সালের মে মাসের প্রথম সপ্তাহে মাওলানা সুবহানের নেতৃত্বে সুজানগরের নাজিরগঞ্জে ৪০০ নিরীহ ব্যক্তিকে হত্যা করা হয়। পরে ওই হত্যাযজ্ঞের অন্যতম নায়ক রাজাকার মৌলভী মধুকে মুক্তিযোদ্ধারা ধরে নিয়ে হত্যা করে। মৃত্যুর আগে মৌলভী মধু মুক্তিযোদ্ধাদের বলেন, পাবনা জেলায় যত হত্যাকা- হয়েছে তার সবই হয়েছে মাওলানা সুবহানের নির্দেশে। এছাড়া সুবহানের নেতৃত্বে ফরিদপুর উপজেলার ডেমরায় প্রায় ১ হাজার নিরীহ মানুষকে হত্যা করা হয়। যুদ্ধে পরাজয় অবধারিত বুঝতে পেরে ১৯৭১ সালের ৪ ডিসেম্বর মাওলানা সুবহান পাকিস্তান হয়ে সৌদি আরব পালিয়ে যান। মাওলানা আবদুস সুবহান সম্পর্কে গণতদন্ত রিপোর্টে আরো বলা হয়, মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে মাওলানা সুবহানের বাংলাদেশের স্বাধীনতা, বাঙালি জাতিসত্তাবিরোধী ভূমিকা, মুক্তিযোদ্ধাদের সমূলে ধ্বংস করার লক্ষ্যে আলবদর, রাজাকার, শান্তি কমিটি গঠন করে ৩০ লাখ নিরীহ, নিরস্ত্র, শান্তিকামী মানুষ হত্যায় সহায়তা এবং পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর যাবতীয় নৃশংস কার্যকলাপে সহায়তার জন্য তার বিরুদ্ধে ’৭২ সালে স্পেশাল ট্রাইব্যুনালে মামলা রুজু করা হয়। ২৯ ফেব্রুয়ারি, ১৯৭২ সালে বিকেল ৩টায় তাকে পাবনার মহকুমা ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে হাজির হতে বলা হয়। কিন্তু সে সময় তিনি গোলাম আযমের সঙ্গে পাকিস্তান পালিয়ে গিয়েছিলেন। (সূত্র : ‘একাত্তরের দালালরা’ : শফিক আহমেদ এবং অ্যাডভোকেট শফিকুল ইসলাম শিবলী, পাথরতলা, পাবনা)। ’৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে রাজধানী ঢাকার মতো পাবনাতেও পাকিস্তান বাহিনী অতর্কিতে নিরীহ বাঙালির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। তবে পাবনার অবস্থা ছিল একটু ব্যতিক্রম। তদন্তকালে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক প্রত্যক্ষদর্শী একজন মধ্যবয়স্ক মহিলা জানান, ’৭১ সালের ২৫ মার্চ রাত থেকেই পাবনার গণ্যমান্য বরেণ্য ব্যক্তিদের স্থানীয় দালালদের সহযোগিতায় পাকিস্তানি আর্মি বাড়ি বাড়ি গিয়ে ধরে নিয়ে আসে। ২৬ মার্চ বিকেল আনুমানিক ৩টার ঘটনা। একজন মহিলা তখন পাবনা রায়েরবাজারের প্রধান সড়কের ধারে একটি পুরনো বাড়ির দোতলার জানালায় দাঁড়িয়ে ছিলেন। জানালার খড়খড়ি দিয়ে দেখছিলেন ভীত-সন্ত্রস্ত পাবনা শহর। হঠাৎ তিনি পাকিস্তানি আর্মির একটি লরি রাস্তার ওপর থামতে দেখেন। লরির পেছনে লম্বা দড়ি দিয়ে বাঁধা প্রায় ১০০ মানুষ, যাদের পাকা রাস্তার ওপর দিয়ে টেনে আনা হয়েছে। প্রত্যেক বন্দির জামা-কাপড় ছিন্নভিন্ন, তাদের হাঁটু থেকে পায়ের পাতা পর্যন্ত সাদা হাড় দেখা যাচ্ছিল আর শরীর ছিল রক্তে মাখামাখি। লরির ভেতরে তিনি পাকিস্তানি আর্মিদের সঙ্গে মাওলানা আবদুস সুবহানকে বসা দেখেছিলেন তিনি। আর যাদের সিমেন্টের রাস্তার ওপর দিয়ে টেনেহেঁচড়ে আনা হচ্ছিল তাদের মধ্যে তিনি পাবনার বিশিষ্ট ব্যবসায়ী আবু সাঈদ তালুকদার, এডওয়ার্ড কলেজের প্রফেসর হারুন, বিশিষ্ট দন্ত চিকিৎসক অমলেন্দু দাক্ষি এবং অ্যাডভোকেট ও আওয়ামী লীগের নেতা আমিনউদ্দিনকে চিনতে পেরেছিলেন। লরি থেকে নেমে কিছু সৈন্য কয়েকটি দালানের ওপর ওড়ানো বাংলাদেশের পতাকা নামানো এবং পোড়ানোর ব্যবস্থা করে চলে যায়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক, ভীতসন্ত্রস্ত ওই মহিলা জানান, ২৯ মার্চ ’৭১ সালের মধ্যে তার দেখা ওইসব পরিচিত ব্যক্তির সবাইকে মেরে ফেলা হয়। তিনি আরো বলেন, ২৬ তারিখে এ দৃশ্য দেখার পর ২৭ মার্চ অমলেন্দু দাক্ষির বাড়িতে গিয়ে তার স্ত্রীর কাছ থেকে জানতে পারেন, দন্ত চিকিৎসক অমলেন্দু দাক্ষির বাড়িতে মাওলানা আবদুস সুবহান পাকিস্তানি আর্মিদের নিয়ে এসেছিলেন।

পাবনা জজকোর্টের সিনিয়র অ্যাডভোকেট, সাবেক পাবলিক প্রসিকিউটর এবং আওয়ামী লীগের প্রধান নেতা আলহাজ গোলাম হাসনায়েন (কাচারীপাড়া, পাবনা) বলেন, ‘মাওলানা আবদুস সুবহান আওয়ামী লীগ নেতা আমিনউদ্দিন সাহেবের বাসা পাক আর্মিদের চিনিয়ে দিয়েছিল।’ তিনি আরো বলেন, ‘পাবনার আলবদর, রাজাকার, শান্তি কমিটির সব সদস্যকে মাওলানা সুবহান সংগ্রহ করেছিলেন।’

অবসরপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মোঃ আবদুল গনি (কালাচাঁদপাড়া, পাবনা) জানান, ‘১৭ এপ্রিল দুপুরে হিন্দু অধ্যুষিত এলাকা কুচিয়াপাড়া ও শাঁখারীপাড়ায় মাওলানা আবদুস সুবহান পাকিস্তানি আর্মিদের সঙ্গে নিয়ে অপারেশন চালান। ওইদিন সেখানে সুধীরচন্দ্র চৌধুরী, অশোক কুমার সাহা, গোপালচন্দ্র চৌধুরীসহ ৮ জনকে হত্যা করা হয়। তারা ২০/২৫টি ঘর পোড়ানো এবং সে সঙ্গে লুটতরাজ ও নারী নির্যাতনও করেছিল।’ অধ্যক্ষ আবদুল গনি আরো বলেন, ‘মে মাসে পাবনা-ফরিদপুর থানার ডেমরাতে মাওলানা আবদুস সুবহান, মাওলানা ইসহাক, টেগার ও আরো কয়েকজন দালালের একটি শক্তিশালী দল পাকিস্তানি আর্মিকে নিয়ে ব্যাপক গণহত্যা করে। সেখানে ওইদিন আনুমানিক ১০০০ মানুষ হত্যাসহ ঘরবাড়ি পোড়ানো, লুণ্ঠন, নারী নির্যাতন ইত্যাদি করা হয় (সূত্র : গণতদন্ত কমিশন রিপোর্ট)।

পাবনার দ্বিতীয় বৃহত্তম গণহত্যাটি হয় সুজানগর থানায়। ‘মে মাসের প্রথমদিকে এক ভোরে নাজিরগঞ্জ-সাতবাড়িয়া ইউনিয়নের হত্যা করা হয় প্রায় ৪০০ জনকে’- বলেন মুজিব বাহিনীর সুজানগর থানা লিডার এবং ঢাকার ব্যবসায়ী জহিরুল ইসলাম বিশু। তিনি জানান, সুজানগর হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ও শান্তি কমিটির একজন সদস্য মৌলভী মধুকে তারা ’৭১-এর মে মাসের শেষদিকে গ্রেফতার করেন এবং পরে মেরে ফেলেন। জিজ্ঞাসাবাদের সময় এই ঘাতক জানিয়েছিলেন, ‘সুজানগর অপারেশনের আগের দিন পাথরতলায় আবদুস সুবহানের বাসায় মিটিং হয়েছিল এবং মিটিংয়ে সুজানগর অপারেশনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়।’ পাবনার যে কোনো অপারেশনের আগে মাওলানা সুবহানের বাসায় পরিকল্পনা করা হতো বলে জহিরুল ইসলাম বিশু গণতদন্ত কমিশনকে জানান। অভিযোগ রয়েছে, বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে পাবনায় জামায়াতের দখলদারিত্ব ও লুটপাটের রাজত্ব চলে। ক্ষমতার অপব্যবহার করে শহরে ৫ কোটি টাকার ৩ একর জায়গা মাত্র ৭৪ লাখ টাকায় জামায়াতকে দেওয়া হয়। সেখানে ইমাম গাযযালী স্কুল অ্যান্ড কলেজ নামে জামায়াতের একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হয়। এছাড়া জামায়াত ক্যাডাররা পাবনায় বাংলা চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি অভিনেত্রী সুচিত্রা সেনের পৈতৃকবাড়ি দখল করে ইমাম গাযযালী ইনস্টিটিউট গড়ে তোলে। তবে জামায়াত নেতাদের দাবি, তারা বাড়িটি লিজ নিয়ে সেখানে গাযযালী ইনস্টিটিউট করেছেন।

দৈনিক সমকাল, ১৮ ডিসেম্বর, ২০০৮

২০ ডিসেম্বর, ২০০৮

নির্বাচনে যুদ্ধাপরাধী প্রার্থীরা- ০৭

প্রিন্সিপাল রুহুল কুদ্দুস

সমকাল প্রতিবেদক

কয়রা ও পাইকগাছা উপজেলার একাংশ নিয়ে গঠিত খুলনা-৬ আসন থেকে চারদলীয় জোটের প্রার্থী হয়েছেন প্রিন্সিপাল শাহ মোহাম্মদ রুহুল কুদ্দুস। একাত্তরের স্বাধীনতা যুদ্ধে তিনি ছিলেন কেন্দ্রীয় শান্তি কমিটির তেইশ নম্বর সদস্য। রাজাকার বাহিনীর কেন্দ্রীয় সংগঠকও ছিলেন তিনি। জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ ও সংসদীয় দলের সদস্যসচিব রুহুল কুদ্দুসের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের নানা অভিযোগ রয়েছে। মুক্তিযুদ্ধকালে কুখ্যাত রাজাকার হিসেবেই পরিচিত ছিলেন তিনি।

মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর প্রকাশিত ‘৭১ : গণহত্যার দলিল’ ও ‘মুক্তিযুদ্ধে ব্যক্তির অবস্থান’ গ্রন্থে এবং ওয়ার ক্রাইমস ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটির কাছে সংরক্ষিত মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন দলিল-দস্তাবেজ থেকে জানা গেছে, শাহ মোহাম্মদ রুহুল কুদ্দুস মুক্তিযুদ্ধের সময় পরিচিত ছিলেন ‘প্রিন্সিপাল রুহুল কুদ্দুস’ নামে। তার বাবা কয়রা উপজেলার আমাদী গ্রামের মরহুম শাহ মকবুল হোসেন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় ১৯৬৩ সালে রুহুল কুদ্দুস ছিলেন নিখিল পাকিস্তান ছাত্রসংঘের সাধারণ সম্পাদক। লেখাপড়া শেষে বাগেরহাটের রামপালের একটি কলেজে অধ্যক্ষ হিসেবে চাকরি শুরু করেন। ১৯৭১ সালে বাগেরহাটের একটি কলেজে তিনি শিক্ষকতা করতেন। ওই কলেজে শিক্ষকতার সময় রাজাকার বাহিনীর নেতা হিসেবে বাগেরহাটে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী কর্মকাণ্ডে অংশ নেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তিনি আর নিজ এলাকায় ফিরে না এসে আত্মগোপনে চলে যান। ’৭৫-এর ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু হত্যার পর পটপরিবর্তনের পথ ধরে এলাকায় ফিরে আসেন তিনি। যুক্ত হন জামায়াতের রাজনীতির সঙ্গে। সাংগঠনিক দক্ষতার কারণে অল্পদিনেই জামায়াতের শীর্ষস্থানীয় নেতা বনে যান তিনি।

মুক্তযুদ্ধকালে ৯ নম্বর সেক্টরের আঞ্চলিক কমান্ডার ও খুলনার মুক্তিযোদ্ধা অ্যাডভোকেট স ম বাবর আলী বলেন, ‘ঢাকায় মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর ইংরেজিতে একটি বই প্রকাশ করে। তাতে উল্লেখ রয়েছে, একাত্তরে তিনি আলবদর বাহিনীর নেতা ছিলেন। পাক হানাদার বাহিনীর দোসর হিসেবে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের মানুষের ওপর বিভিন্ন অত্যাচার চালান তিনি।’

স্থানীয় বীর মুক্তিযোদ্ধা জিএম মতিউর রহমান জানিয়েছেন, একাত্তরের পাকসেনাদের সহায়তা, নারী ধর্ষণ ও লুটতরাজের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ছিলেন প্রিন্সিপাল হাবিবুর রহমান।

’৯১ সালে জাতীয় রাজনীতিতে সরাসরি সম্পৃক্ত হন শাহ মোহাম্মদ রুহুল কুদ্দুস। সে বছর জামায়াত থেকে মনোনয়ন নিয়ে খুলনা-৬ আসনের সাংসদ নির্বাচিত হন। কিন্তু টানা পাঁচ বছর এলাকার উন্নয়নে কোনো কাজ না করায় তীব্র ইমেজ সংকট দেখা দেয় তার। পরাজিত হন ’৯৬ সালের নির্বাচনে। ২০০১ সালের সংসদ নির্বাচনে চারদলীয় জোটের প্রার্থী হিসেবে তৃতীয় দফায় সাংসদ নির্বাচিত হন। সেই থেকে বদলে যেতে থাকে তার পরিবারের ভাগ্যলিপি। বাবার ক্ষমতার দাপটে ছেলে শাহ জুবায়ের হোসেন নিয়ন্ত্রণকর্তা বনে যান সুন্দরবনের পাইকগাছা ও কয়রা উপজেলা অংশের। মাত্র পাঁচ বছরে মালিক হন কোটি কোটি টাকার। বর্তমানে কয়রা ও পাইকগাছার জামায়াতের দুটি সিন্ডিকেটের সমন্বয়ক রুহুল কুদ্দুসের বড় ছেলে শাহ জুবায়ের।

ধর্মের কথা বলে রাজনীতি করলেও এ সাংসদের আদরের পুত্র শাহ জুবায়ের কেবল মাদ্রাসা শিক্ষায় শিক্ষিত। ধর্মের ন্যূনতম অনুশাসন মেনে চলেন না তারা কেউই। দুই বছর আগে খুলনায় এক প্রতিবেশী মহিলাকে মাথা ন্যাড়া করে বৈদ্যুতিক খুঁটির সঙ্গে বেঁধে রেখে অসহনীয় নির্যাতনের সেই চিত্র এখনো ভীতির সঞ্চার করে এলাকাবাসীর মধ্যে। তখন এ ঘটনা জাতীয় পর্যায়েও ব্যাপক সমালোচনার ঝড় তোলে।

এলাকার বাসিন্দারা অভিযোগ করেছেন, বাবা সাংসদ হওয়ার পর থেকে সুন্দরবনের কাঠ ও গোলপাতা চুরির একাধিক সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন জুবায়ের। আয় করতে থাকেন বিপুল অর্থ। কয়রায় ৬-৭টি ঘের দখল করে ব্যবসা করছেন। বিগত পাঁচ বছর জামায়াতের প্রভাব খাটিয়ে দুটি উপজেলার সরকারি বরাদ্দ থেকে আদায় করেছেন মোটা অঙ্কর কমিশন।

এত বিত্ত-বৈভবের মালিক হলেও পৈতৃক বাড়িতে নামমাত্র একটি টিনের ঘর তুলেছেন রুহুল কুদ্দুস। তিনি থাকেন খুলনায় নিরাশী আবাসিক এলাকার একটি ভাড়া বাড়িতে। ঘনিষ্ঠজনরা বলছেন, রুহুল কুদ্দুস ঢাকায় একটি বাড়ি কিনেছেন। আর পুত্র শাহ জুবায়ের পাইকগাছা উপজেলার জামায়াত নেতা গাজী তানজিদ আলম, মাওলানা আবুল কাশেম, মাওলানা আবদুল মজিদ ও চাচার মেয়ে জামাই মোস্তাফিজুর রহমানকে সঙ্গে নিয়ে নিয়ন্ত্রণ করছেন এ উপজেলার টেন্ডারবাজি, পুলিশের দালালিসহ সব প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড। আর কয়রা উপজেলায় এসব বিষয় দেখভাল করছেন সাংসদ বাবার মদদপুষ্ট জামায়াত নেতা সোহরাব হোসেন, মোহাম্মদ ওলিউলল্লাহ, ডা. জিন্নাহ ও মাওলানা শামসুজ্জামান।

২০০১ সালে জোট সরকার ক্ষমতায় আসার কিছুদিন পর কয়রায় রুহুল কুদ্দুসের অনুসারী কয়েকজন জামায়াত নেতা দেশের প্রচলিত আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে ‘আদালত’ বসিয়ে বিচার কার্যক্রম শুরু করেন। ওই সময় এ ব্যাপারে একাধিক সংবাদ প্রকাশিত হলে জামায়াতের নেতা-কর্মীরা আদালতটি বন্ধ করে দেয়।

পাইকগাছা উপজেলা বিএনপির সভাপতি জিএ সবুর ধর্মের অনুশাসন না মানার অভিযোগ তুলে বলেন, ‘পারিবারিকভাবেই যিনি ইসলাম প্রতিষ্ঠায় উদ্যোগী নন, তিনি কী করে দেশে ইসলামী শাসন প্রতিষ্ঠা করবেন?’ তিনি আরো বলেন, ‘এই জামায়াত নেতা নিজের ভাগ্যের উন্নয়ন ঘটাতেই সাংসদ হয়েছেন, নির্বাচনে দাঁড়িয়েছেন।’ এমনকি রুহুল কুদ্দুসের আত্মীয়স্বজনরাও ক্ষিপ্ত এ পরিবারের ওপর। রুহুল কুদ্দুসের আপন চাচাত ভাই কয়রার আমাদী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান শাহ ইবাদত আলী বলেন, ‘জনগণের উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েই ক্ষমতাসীন হয়ে যারা তাদের সম্পদ লুটে খায় তারা অবশ্যই আল্লাহর বিরোধী। শাহ রুহুল কুদ্দুস তাদেরই একজন।’ আর সাবেক সাংসদ জেলা অওয়ামী লীগ নেতা নুরুল হক বলেন, ‘আল্লাহর আইন আর সৎ লোকের শাসন প্রতিষ্ঠার নামে জনগণের ভোট নিয়ে শাহ রুহুল কুদ্দুস নিজেকে সমাজে একজন ধনী ব্যক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করছেন।’

দৈনিক সমকাল, ১৮ ডিসেম্বর, ২০০৮

নির্বাচনে যুদ্ধাপরাধী প্রার্থীরা- ০৬

মুহাম্মদ কামারুজ্জামান

শেরপুর প্রতিনিধি

জামায়াত নেতা মুহাম্মদ কামারুজ্জামান এবারো ভোটপ্রার্থী। পরপর ৪ বার শেরপুরের মানুষ তাকে প্রত্যাখ্যান করলেও হাল না ছেড়ে শেরপুর-১ (সদর) আসনে ফের তিনি চারদলীয় জোটের প্রার্থী হয়েছেন। এ আসনে তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী শেরপুরের কনিষ্ঠ মুক্তিযোদ্ধা সাবেক এমপি মহাজোট প্রার্থী জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি আতিউর রহমান আতিক। অভিযোগ রয়েছে, কামারুজ্জামান মুক্তিযুদ্ধের সময় আলবদর বাহিনীর সংগঠক ছিলেন। যুদ্ধাপরাধী ও স্বাধীনতাবিরোধী হিসেবে তার বিরুদ্ধে রয়েছে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ।

শেরপুর সদর উপজেলার বাজিতখিলা ইউনিয়নের মুদিপাড়ার বাসিন্দা কৃষক পরিবারের সন্তান মুহাম্মদ কামারুজ্জামান ৫ ভাই ও ৩ বোনের মধ্যে তৃতীয়। কামারুজ্জামান এবং তার আলবদর বাহিনী ১৯৭১ সালে শেরপুরসহ বৃহত্তর ময়মনসিংহে স্বাধীনতাকামী বাঙালিদের হত্যা, নির্যাতন ও সম্পদ লুণ্ঠনসহ ঘৃণ্যতম অপরাধ সংঘটিত করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। ইতিহাসবিদ ড. মুনতাসীর মামুন সম্পাদিত ‘মুক্তিযুদ্ধ কোষ’ গ্রন্থে উল্লেখ করা হয়েছে- ‘দেশে হাতেগোনা ১০ কুখ্যাত নরঘাতকের মধ্যে এই কামারুজ্জামান একজন।’
বর্তমানে তিনি সাপ্তাহিক সোনার বাংলার সম্পাদক এবং বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় সিনিয়র সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল।

একাত্তরের ঘাতক-দালাল ও যুদ্ধাপরাধীদের সম্পর্কে গঠিত জাতীয় গণতদন্ত কমিশনের রিপোর্টে বলা হয়েছে, ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় কামারুজ্জামানের স্বাধীনতাবিরোধী তৎপরতা এবং যুদ্ধাপরাধের বিবরণ তৎকালীন সংবাদপত্র, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিষয়ক গ্রন্থ ও নির্যাতিত ব্যক্তিদের কাছ থেকে জানা গেছে। ১৯৭১ সালে কামারুজ্জামান জামায়াতে ইসলামীর তৎকালীন ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রসংঘের ময়মনসিংহ জেলার নেতা ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় জামালপুরে প্রথম আলবদর বাহিনী গড়ে ওঠে, যার প্রধান সংগঠক ছিলেন তিনি।

১৯৭১ সালের ১৬ আগস্ট দৈনিক সংগ্রামে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘পাকিস্তানের ২৩তম আজাদী দিবস উপলক্ষে গত শনিবার মোমেনশাহী আলবদর বাহিনীর উদ্যোগে মিছিল ও সিম্পোজিয়াম অনুষ্ঠিত হয়। স্থানীয় মুসলিম ইনস্টিটিউটে আয়োজিত ওই সিম্পোজিয়ামে সভাপতিত্ব করেন আলবদর বাহিনীর প্রধান সংগঠক কামারুজ্জামান।

নৃশংসতার নমুনা : পরীক্ষা শেষে শেরপুর কলেজের ছাত্র গোলাম মোস্তফাকে ১৯৭১ সালের ২৪ আগস্ট কামারুজ্জামানের আলবদর বাহিনী রাস্তা থেকে ধরে নিয়ে যায় শহরের সুরেন্দ্র মোহন সাহার বাড়িতে। এই বাড়িটিকে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী দখল করে টর্চার ক্যাম্প বানিয়েছিল। সেই ক্যাম্পে গোলাম মোস্তফাকে শারীরিক নির্যাতনের পর রাত ৮টার দিকে শহরের দক্ষিণ প্রান্তে শেরীব্রিজ এলাকায় নিয়ে গুলি করে আলবদররা নৃশংসভাবে হত্যা করে। এমন অভিযোগ করেন শহীদ গোলাম মোস্তফার ছোট ভাই মোশাররফ হোসেন তালুকদার। কামারুজ্জামানের নির্দেশে জি কে স্কুলের ছাত্র ফুটবল খেলোয়াড় কাজল এবং কায়সারকে হত্যা করা হয়।

গণতদন্ত কমিশনের রিপোর্ট অনুসারে, নালিতাবাড়ি উপজেলার বদিউজ্জামানকে মুক্তিযুদ্ধের সময় কামারুজ্জামানের নেতৃত্বে ১১ জনের একটি দল ধরে নিয়ে ঝিনাইগাতীর আহমদনগর পাকিস্তানি বাহিনীর ক্যাম্পে হত্যা করে। এ তথ্য জানিয়েছেন শহীদ বদিউজ্জামানের পিতা ফজলুল হক।

১৯৭১ সালের মে মাসের মাঝামাঝি শেরপুরের জনপ্রিয় শিক্ষক অধ্যক্ষ সৈয়দ আবদুল হান্নানকে মুখে চুনকালি মেখে, গলায় জুতার মালা পরিয়ে, অর্ধউলঙ্গ অবস্থায় কামারুজ্জামানের দলবল শহরের রাস্তায় রাস্তায় ঘুরিয়ে চরমভাবে অসম্মানিত ও অপদস্ত করে।

সম্প্রতি ওয়ার ক্রাইম ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটি এবং মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডারস ফোরাম ঘোষিত শীর্ষ ৫০ যুদ্ধাপরাধীর তালিকায় ৩ নম্বরে রয়েছে কামারুজ্জামানের নাম। গত ১২ নভেম্বর শেরপুরে সেক্টর কমান্ডারস ফোরাম/মুক্তিযোদ্ধা ’৭১-এর মতবিনিময় সভায় জেলার ১২ জন যুদ্ধাপরাধীর নাম ঘোষণা করা হয়। এতে জামায়াত নেতা কামারুজ্জামানের নাম ছিল শীর্ষস্থানে।

এদিকে, ঢাকার কেরানীগঞ্জের মুক্তিযোদ্ধা মোজাফ্ফর আহমেদ খান বাদী হয়ে ২০০৭ সালের ১৭ ডিসেম্বর মুখ্য মহানগর আদালতে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে তার এক নিকটাত্মীয়কে হত্যার অপরাধে নিজামী ও মুজাহিদসহ ১৩ জনের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়ের করেন। কামারুজ্জামান সেই মামলারও আসামি।
আত্মস্বীকৃত আলবদর এবং শেরপুর শহরের সুরেন্দ্র মোহন সাহার বাসায় মুক্তিযুদ্ধকালে পাকিস্তানি বাহিনীর টর্চার ক্যাম্পের পাহারাদার মোহন মিয়া জানান, কামারুজ্জামানের নির্দেশে প্রতিনিয়তই সেখানে নিরীহ মানুষকে ধরে নিয়ে নানাভাবে নির্যাতন চালানো হতো। কাউকে কাউকে নির্যাতন শেষে হত্যা করা হতো।
মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক শিক্ষাবিদ মহসীন আলী জানান, মুক্তিযুদ্ধের ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং কমিটির অনুসন্ধানে কামারুজ্জামান শেরপুর অঞ্চলে যুদ্ধাপরাধের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিল। অবশ্যই তার বিচার হওয়া উচিত। মুক্তিযুদ্ধের ছাত্র সংগঠক আমজাদ হোসেন জানান, আলবদর কামরানের কথা বলে কামারুজ্জামানের অপকর্ম ঢাকার অপচেষ্টা চালানো হয়। এজন্য তার ফাঁসি চাই।

এ ব্যাপারে একাধিকবার সাংবাদিকদের কাছে দেওয়া সাক্ষাৎকারে জামায়াত নেতা কামারুজ্জামান জানান, একাত্তরে তিনি শেরপুরেই ছিলেন না। তবে কোথায় ছিলেন, এ ব্যাপারেও স্পষ্ট করে কিছু বলেননি। তার মতে, একাত্তরে আলবদর বাহিনীর ঘাতক কামরানের সঙ্গে তার নামটিকে ভুলভাবে এক করে ফেলা হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে একাত্তরের ঘটনাবলির সঙ্গে তিনি জড়িত ছিলেন না।

গণতদন্ত কমিশনের রিপোর্ট : মুহাম্মদ কামারুজ্জামান সম্পর্কে একাত্তরের ঘাতক দালাল ও যুদ্ধাপরাধীদের সম্পর্কে জাতীয় গণতদন্ত কমিশনের রিপোর্টে আরো বলা হয়, ‘১৯৭১ সালের ১৬ আগস্ট দৈনিক সংগ্রামে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পাকিস্তানের ২৫তম আজাদী দিবস উপলক্ষে গত শনিবার মোমেনশাহী আলবদর বাহিনীর উদ্যোগে মিছিল ও সিম্পোজিয়াম অনুষ্ঠিত হয়। স্থানীয় মুসলিম ইনস্টিটিউটে আয়োজিত এ সিম্পোজিয়ামে সভাপতিত্ব করেন আলবদর বাহিনীর প্রধান সংগঠক কামারুজ্জামান। এক তার বার্তায় প্রকাশ, সিম্পোজিয়ামে বিভিন্ন বক্তা দেশকে ধ্বংস করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত দুশমনদের সম্পর্কে সতর্কবাণী উচ্চারণ করেন।’

শেরপুরের একজন শহীদের পিতা ফজলুল হক গণতদন্ত কমিশনকে জানিয়েছেন, তার ছেলে শহীদ বদিউজ্জামানকে মুক্তিযুদ্ধের সময় আষাঢ় মাসের একদিন তার বেয়াইয়ের বাড়ি থেকে কামারুজ্জামানের নেতৃত্বে ১১ জনের একটি দল ধরে নিয়ে যায়। শহীদ বদিউজ্জামানকে ধরে আহমদনগর পাকিস্তানি বাহিনীর ক্যাম্প নিয়ে গিয়ে হত্যা করা হয়। স্বাধীনতার পর শহীদের বড় ভাই হাসানুজ্জামান বাদী হয়ে নালিতাবাড়ী থানায় মামলা দায়ের করেন। এ মামলায় ১৮ জন আসামির অন্যতম ছিলেন কামারুজ্জামান। মামলাটির নম্বর-২(৫)৭২। জিআর নং-২৫০(২)৭২।

রিপোর্টে বলা হয়, ‘শেরপুর জেলার শহীদ গোলাম মোস্তফার চাচাতো ভাই শাহজাহান তালুকদার জানিয়েছেন, ১৯৭১ সালের ২৪ আগস্ট আলবদররা গোলাম মোস্তফাকে শেরপুর শহরের সড়ক থেকে ধরে বলপূর্বক তাদের ক্যাম্পে নিয়ে যায়। শেরপুর শহরের সুরেন্দ্রমোহন সাহার বাড়িটি দখল করে আলবদররা তাদের ক্যাম্প বানিয়েছিল। সে ক্যাম্পে গোলাম মোস্তফাকে ধরে নিয়ে আলবদররা তার গায়ের মাংস ও রগ কেটে, হাত বেঁধে হাঁটিয়ে নিয়ে যায় শেরী ব্রিজের নিচে। সেখানে তারা গুলি করে হত্যা করে গোলাম মোস্তফাকে। কামারুজ্জামানের প্রত্যক্ষ নির্দেশে এ হত্যাকাণ্ডটি ঘটেছিল। শহীদ গোলাম মোস্তফার হত্যাকাণ্ড যে কামারুজ্জামানের দ্বারা সংঘটিত হয়েছিল এ তথ্য শেরপুরের আরো অনেকেই দিয়েছেন।’

দৈনিক সমকাল, ১৮ ডিসেম্বর, ২০০৮

নির্বাচনে যুদ্ধাপরাধী প্রার্থীরা- ০৫

আজহারুল ইসলাম

রংপুর অফিস

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে বাঙালি নিধনে পাক হানাদার বাহিনীর সহায়তায় গঠিত কুখ্যাত রাজাকার-আলবদর বাহিনীর নেতৃস্থানীয়দের অন্যতম বর্তমানে জামায়াত নেতা এটিএম আজহারুল ইসলাম এবার রংপুর-২ আসনে চারদলীয় জোটের প্রার্থী। রংপুর জেলার বদরগঞ্জ উপজেলার লোহানীপাড়ার বাসিন্দা এটিএম আজহারুল ইসলাম মুক্তিযুদ্ধের সময় ইসলামী ছাত্র সংঘের (বর্তমানে ইসলামী ছাত্রশিবির) জেলা কমিটির সভাপতি ছাড়াও আলবদর বাহিনীর রংপুর শাখার কমান্ডার নিযুক্ত হন। কারমাইকেল কলেজের ৬ শিক্ষক এবং ১ শিক্ষক-পত্নীকে হত্যায় নেতৃত্ব দিয়ে রংপুরকে এক আতঙ্কের জনপদে রূপ দেন এটিএম আজহারুল ইসলাম।
পটভূমি : ১৯৭১ সালের ১৭ আগস্ট হানাদার পাকিস্তানি বাহিনী তাদের এ দেশীয় দোসর জামায়াত সৃষ্ট সশস্ত্র সংগঠন আলবদরকে মিলিশিয়া বাহিনীর স্বীকৃতি দেয়। এ উপলক্ষে ওইদিন আলবদর বাহিনী দেশের বিভিন্ন এলাকায় সভা-সমাবেশের আয়োজন করে। এরই অংশ হিসেবে রংপুর সদরে আয়োজিত আলবদর বাহিনীর সভায় সভাপতিত্ব করেন এটিএম আজহারুল ইসলাম। (সূত্র : দৈনিক সংগ্রাম, ১৮ আগস্ট, ১৯৭১)। সভায় আজহারুল ইসলাম এবং তার সহযোগীরা বাঙালির রক্ত পানের শপথ নেয় বলে সভাস্থলে উপস্থিত একাধিক প্রত্যক্ষদর্শী বিভিন্ন সময় সাক্ষ্য দিয়েছেন।

৭ শিক্ষক হত্যা : ১৯৭১ সালের সেপ্টেম্বরের প্রথম দিকে আলবদর কমান্ডার আজহারুল ইসলামের নেতৃত্বে পরিচালিত এক অভিযানে রংপুরের ঐতিহ্যবাহী বিদ্যাপীঠ কারমাইকেল কলেজের ৬ শিক্ষক এবং ১ শিক্ষক-পত্নীকে তুলে আনা হয়। তারা হলেন রসায়ন বিভাগের প্রভাষক কালাচাঁদ রায়, গণিতের প্রভাষক চিত্তরঞ্জন রায়, দর্শনের প্রভাষক সুনীল বরণ চক্রবর্তী, বাংলার প্রভাষক রামকৃষ্ণ অধিকারী, উর্দু বিভাগের শাহ সোলায়মান আলী ও রসায়নের আবদুর রহমান এবং কালাচাঁদ রায়ের স্ত্রী (নাম জানা যায়নি)। ওই সময়কার ছাত্রনেতা রফিকুল ইসলাম এবং তার ভাই সাখাওয়াত রাঙ্গা (বর্তমানে জেলা জাসদের সাধারণ সম্পাদক) এবং রংপুরের অন্যান্য মুক্তিযোদ্ধার তথ্য মতে, আজহারুলের উপস্থিতিতে এবং নির্দেশে তার সহযোগী আলবদর সদস্যরা রংপুরের সর্বমহলে সমাদৃত ওই ৭ জনকে কলেজের পার্শ্ববর্তী দমদমা এলাকায় নিয়ে বেয়োনেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে নির্মম নির্যাতনের পর ব্রাশফায়ারে মৃত্যু নিশ্চিত করে। এ ঘটনায় আতঙ্কে শিউরে ওঠে সমগ্র রংপুরবাসী। প্রত্যক্ষদর্শী একজন মুক্তিযোদ্ধা জানান, ‘নিহত শিক্ষকদের বীভৎস লাশ যারা দেখেছেন, তাদের কাছে আজহারুল মানুষরূপী এক নরপিশাচ হিসেবে চিহ্নিত।’

মুক্তিযোদ্ধাদের দেওয়া তথ্য মতে, মুক্তিযুদ্ধের সময় আজহারুল ইসলাম ৭০ জনের একটি সশস্ত্র আলবদর স্কোয়াডের নেতৃত্ব দিতেন। সেই স্কোয়াডের ঘাঁটি ছিল রংপুরের টাউন হল এলাকায়। আজহারুল এবং তার সহযোগীরা পাকিস্তানি সেনা কর্মকর্তাদের মনোরঞ্জনের জন্য ভয়-ভীতি দেখিয়ে এলাকার হিন্দু সম্প্রদায়ের, এমন কি অপেক্ষাকৃত নিরীহ মুসলিম পরিবারের সুন্দরী তরুণী এবং গৃহবধূদের ধরে এনে সরবরাহ করত।

১৯৭১ সালের ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহের দিকে বাঙালির বিজয় নিশ্চিত হতে থাকলে আজহারুল ইসলাম রংপুর ছেড়ে চলে আসেন ঢাকায়। এরপর মেতে ওঠেন ইতিহাসের আরেক নৃশংস ও জঘন্যতম হত্যাযজ্ঞে। আজহারুল, নিজামী ও মুজাহিদ গংয়ের নেতৃত্বে দেশবরেণ্য বুদ্ধিজীবীদের ধরে ধরে মোহাম্মদপুরের ফিজিক্যাল ট্রেনিং কলেজে স্থাপিত টর্চার সেলে নিয়ে চালানো হতো অকথ্য নির্যাতন। সেখান থেকে তাদের নিয়ে হত্যা করা হতো রায়েরবাজারের বধ্যভূমিতে। ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর আত্মসমর্পণের দিন নরঘাতক আজহার তার অন্য কয়েকজন সহযোগীর সঙ্গে পাকিস্তানে পালিয়ে যান। সেখান থেকে পাড়ি জমান সৌদি আরব। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরবর্তী অনুকূল পরিস্থিতিতে দেশে ফিরে আসেন আজহারুল। ১৯৭৭ সাল থেকে আবারো প্রকাশ্যে সক্রিয় হন জামায়াতের রাজনীতিতে। তবে ১৯৭১-এর অপকর্মের জের ধরে আজহারুল ১৯৮৬ সাল পর্যন্ত নিজ জেলা রংপুরে আসতে পারতেন না।

দৈনিক সমকাল, ১৮ ডিসেম্বর, ২০০৮

১৯ ডিসেম্বর, ২০০৮

নির্বাচনে যুদ্ধাপরাধী প্রার্থীরা -০৪

আবদুল খালেক মণ্ডল

নিজস্ব প্রতিবেদক, সাতক্ষীরা

এবারো সাবেক জামায়াত এমপি আবদুল খালেক মণ্ডল সাতক্ষীরা-২ আসন (সদর) থেকে চারদলীয় জোটের মনোনয়ন পেয়েছেন। একাত্তরে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় খুন, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ, লুটপাটসহ অগণিত অভিযোগ রয়েছে আবদুল খালেক মণ্ডলের বিরুদ্ধে। ১৯৭১ সালের ৭ ডিসেম্বর সাতক্ষীরা হানাদারমুক্ত হওয়ার দিন মুক্তিযোদ্ধারা তাকে আটক করে। সে সূত্রে আবদুল খালেক মণ্ডল ছিলেন সাতক্ষীরা কারাগারের প্রথম যুদ্ধাপরাধী বন্দি। সাতক্ষীরা সদর উপজেলার ঘোনা গ্রামের বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুর রশিদ একাত্তরের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে সাবেক জামায়াত এমপি আবদুল খালেক মণ্ডলের জীবনের কালো অধ্যায় সম্পর্কে জানান। স্বাধীনতা যুদ্ধের ৯ মাসে লুটপাট, অগ্নিসংযোগ, খান সেনাদের ক্যাম্পে নারী সাপ্লাই, প্রয়াত সাংবাদিক সুনীল ব্যানার্জির বাড়ি দখল, অসংখ্য নিরপরাধ মানুষকে হত্যাসহ বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে পৈশাচিকভাবে নরহত্যার মতো অপরাধ করেছেন আবদুল খালেক মণ্ডল। ভীতসস্ত্রস্ত মানুষ তার উপাধি দিয়েছিল ‘জল্লাদ খালেক’।

একাত্তরের আমলনামা :
সাতক্ষীরা সদর উপজেলার সীমান্তঘেঁষা খলিলনগর গ্রামের লালচাঁদ মণ্ডলের ছেলে আবদুল খালেক মণ্ডল মুক্তিযুদ্ধ শুরুর পরপরই রাজাকার বাহিনীতে যোগ দেন। তিনি পাকসেনাদের বিশ্বস্ত সহচর হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। তারই নেতৃত্বে সীমান্তবর্তী কাথণ্ডা গ্রামের আবুল হোসেন গাজীকে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করা হয়। তার সহযোগিতায় এলাকার অসংখ্য নিরপরাধ এবং মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সদস্যকে পাকহানাদার বাহিনীর বৈকারী ক্যাম্পে ধরে নিয়ে নির্যাতন ও হত্যা করা হয়। তাদের মধ্যে আছেন খলিলনগর গ্রামের মুনছুর আলী সরদার, কাথণ্ডা গ্রামের হিমেপান্তি ও বলদঘাটা গ্রামের সামসুর রহমান প্রমুখ। একই এলাকার অহেদকে মুক্তিযোদ্ধা সন্দেহে খালেক মণ্ডল বাড়ি থেকে পাকসেনাদের ক্যাম্পে ডেকে নেয় এবং তারই পরামর্শে বর্বর খান সেনারা অহেদকে গুলি করে হত্যা করে। ঘোনার বাঁশিয়াপাড়ার তাহের আলীর ছেলে ভারতে মুক্তিযোদ্ধা ট্রেনিংয়ে যাওয়ার কারণে খালেক মণ্ডল ও এক পাকসেনা স্থানীয় দাঁতভাঙা বিল থেকে ধরে নিয়ে তাকে গুলি করে হত্যা করে। কাথণ্ডা গ্রামের শহর আলী দফাদার, মোহর আলী দফাদার, বদরুজ্জামান মল্লিক, আবদুর রাজ্জাক সরদার ও দেলোয়ার হোসেন সরদারসহ ৭ জন মুক্তিযোদ্ধাকে খালেক মণ্ডলের নেতৃত্বে বৈকারী ক্যাম্পে ধরে এনে উল্টো করে ঝুলিয়ে অমানসিক নির্যাতন করা হয়। ভাগ্যক্রমে তারা সবাই বেঁচে যান। একাত্তরের এপ্রিলে সাতক্ষীরা সরকারি বালক বিদ্যালয়ের পাশে সংঘটিত ভয়াবহ গণহত্যার নেতৃত্ব দিয়েছিলেন আবদুল খালেক মণ্ডল। এই হত্যাযজ্ঞে ভারতে আশ্রয় নেওয়ার উদ্দেশ্যে সেখানে জড়ো হওয়া শত শত নারী-পুরুষ-শিশুকে ঠাণ্ডা মাথায় হত্যা করা হয় বলে স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের দাবি। শহরের ডায়মন্ড হোটেলের (তৎকালীন) টর্চার সেলে জল্লাদের ভূমিকা পালন করতেন তিনি। তারই নেতৃত্বে সীমান্তঘেঁষা বৈকারী, সাতানী, কাথণ্ডা ও ভাদড়ায় বহু বাঙ্কার খনন করা হয়। ওইসব বাঙ্কারে ভারতগামী অসংখ্য শরণার্থীকে হত্যা করে মাটিচাপা দেওয়া হয়। সমকাল প্রতিনিধিকে এসব কথার বয়ান দেন সাতক্ষীরা জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের আহ্বায়ক এনামুল হক এবং ঘোনা গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা আবদুর রশিদ।

স্বাধীনতা যুদ্ধকালে বৈকারী হাইস্কুলের দশম শ্রেণীর ছাত্র জালালউদ্দিন জানান, খালেক মণ্ডলের নির্দেশে বাঙ্কার খুঁড়তে অস্বীকৃতি জানানোয় খলিলনগর গ্রামের ঈমান আলীকে গুলি করে হত্যা করা হয়। জালাল বলেন, যুদ্ধের সময় একদিন বৈকারী স্কুলে এসে আলবদর কমান্ডার খালেক ১৭ জন ছাত্রের তালিকা করে তাদের বাঙ্কার খোঁড়ার নির্দেশ দেন। হুকুম না মানায় রাজাকার বাহিনী তার বাড়িতে হামলা-ভাংচুর চালায়। শহরের পলাশপোল এলাকার যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা এরশাদ হোসেন খান চৌধুরী বলেন, ‘সাতক্ষীরা-২ আসনের চারদলীয় জোটপ্রার্থী সাবেক জামায়াত এমপি আবদুল খালেক মণ্ডল একজন যুদ্ধাপরাধী।’

এদিকে আবদুল খালেক মণ্ডলের যুদ্ধাপরাধ বিষয়ক কর্মকাণ্ডের সাক্ষ্য দিতে গিয়ে সাতক্ষীরা সদর উপজেলার বাঁশদহ গ্রামের বাসিন্দা ঢাকা পিজি হাসপাতালের চিকিৎসক সহিদুর রহমান জানান, ১৯৭১ সালের ৭ ডিসেম্বর সাতক্ষীরা হানাদারমুক্ত হয়। সেদিন আমি সাইকেলে চড়ে শহরে আসার পথে কদমতলা ব্রিজের কাছে এসে দেখতে পাই খালেক মণ্ডলসহ তিনজনকে পিঠমোড়া করে বেঁধে রাখা হয়েছে।

এর পরের ঘটনা সম্পর্কে সাতক্ষীরা সদর উপজেলার ঘোনা গ্রামের বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুর রশিদ আরো বলেন, ‘সেদিন অলৌকিকভাবে জনরোষ থেকে প্রাণে বেঁচে যান আবদুল খালেক মণ্ডল। তবে সাতক্ষীরা কারাগারে প্রথম যুদ্ধাপরাধী বন্দি ছিলেন তিনি। কয়েক মাস সেখানে কারাভোগের পর বঙ্গবন্ধুর সাধারণ ক্ষমার সুযোগ তিনি মুক্তি পান। পরবর্তী সময়ে সাতক্ষীরা সদর উপজেলার একটি মাদ্রাসায় চাকরি নেন আবদুল খালেক মণ্ডল।’

একই ঘটনা পরম্পরা ব্যক্ত করতে গিয়ে প্রয়াত সাংবাদিক সুনীল ব্যানার্জির ভাই কল্যাণ ব্যানার্জি বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার পরপরই খালেক মণ্ডল শহরের ফুড অফিস মোড়ে অবস্থিত আমাদের পৈতৃক বাড়িটি দখল করে নেন। এরপর টানা ৮ মাস ওই বাড়িতে খালেক মণ্ডল তার রাজাকার সঙ্গীদের নিয়ে বসবাস করেন। ৭ ডিসেম্বর সাতক্ষীরামুক্ত হওয়ার পর বাড়িটি থেকে পালিয়ে যাওয়ার সময় কদমতলা ব্রিজের কাছে তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে ধরা পড়েন।’

এদিকে আঁগরদাড়ি মাদ্রাসায় অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালনকালে খালেক মণ্ডলের বিরুদ্ধে ১ লাখ ৩৬ হাজার টাকা আত্মসাতের অভিযোগে ওঠে। পরে ওই টাকা তিনি সরকারি কোষাগারে ফেরত দিতে বাধ্য হন।

এমপি হওয়ার পরের ভূমিকা:
জোট সরকারের শাসনামলে সাতক্ষীরা-২ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর আবদুল খালেক মণ্ডলের বিরুদ্ধে জঙ্গি মদদের অভিযোগ ওঠে। ২০০৫ সালের ১৭ আগষ্ট দেশব্যাপী সিরিজ বোমা হামলার পর শুরু হয় পুলিশের জঙ্গিবিরোধী অভিযান। জেএমবি জঙ্গি গোষ্ঠীকে প্রথম শনাক্ত করা হয় সাতক্ষীরা থেকেই। কিন্তু সাবেক জামায়াত এমপি আবদুল খালেক মণ্ডলের অবৈধ হস্তক্ষেপে বাধাগ্রস্ত হতে থাকে পুলিশের জঙ্গিবিরোধী অভিযান। এর প্রমাণ হচ্ছে ওই সময় তার বিরুদ্ধে করা জিডিগুলো। সাতক্ষীরা সদর থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) গোলাম মোহাম্মদ জঙ্গিবিরোধী অভিযানে প্রতিবন্ধকতার কারণে আবদুল খালেক মণ্ডলের বিরুদ্ধে ৭টি জিডি করেন। কিন্তু আবদুল খালেক মণ্ডল থেকে যান ধরাছোঁয়ার বাইরেই। জোট শাসনামলে সরকারের ত্রাণের টিন খালেক মণ্ডলের নির্দেশনা অনুযায়ী জামায়াতের অনুগত বিভিন্ন ধর্মীয় সংগঠনের নেতা-কর্মীদের মধ্যে বিতরণ করার অভিযোগ ওঠে।

২০০৬ সালের ১৯ মার্চ দৈনিক খবরের একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ১৯৯৭ সালের ১৭ মে খালেকের বাড়িতে বসে জেএমবির প্রথম মজলিসে শূরা গঠন করা হয়। এরপর ১৯৯৮ সালে জেএমবির আত্মপ্রকাশ ঘটে। প্রথম মজলিসে শূরার বৈঠকে ২০১৫ সালের মধ্যে তালেবানি কায়দায় জিহাদের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখলের সিন্ধান্ত গৃহীত হয়।

আবদুল খালেক মণ্ডলের সাফাই:
বরাবরই আবদুল খালেক মণ্ডল তার বিরুদ্ধে আনীত এসব অভিযোগ অস্বীকার করে এসেছেন। তার দাবি, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে একটি মহল এসব অপপ্রচার চালায়, যার সঙ্গে বাস্তবতার কোনো মিল নেই। এদিকে স্বাধীন বাংলাদেশের মাটিতে আবদুল খালেকের এমপি হওয়া এবং এবারো মনোনয়নপ্রাপ্তি প্রসঙ্গে যুদ্ধকালীন তার অসংখ্য অপকর্মের প্রত্যক্ষদর্শী স্থানীয় কয়েকজন বীর মুক্তিযোদ্ধা ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে বলেন, ‘লাখো শহীদের আত্মত্যাগের ফসল উঠেছে যুদ্ধাপরাধীদের ঘরে। তা না হলে কি সে এমপি হতে পারে?’

দৈনিক সমকাল, ১৮ ডিসেম্বর, ২০০৮

নির্বাচনে যুদ্ধাপরাধী প্রার্থীরা- ০৩

আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ

নিজস্ব প্রতিবেদক, ফরিদপুর

জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ আসন্ন সংসদ নির্বাচনে ফরিদপুর-৩ আসনে চারদলীয় জোটের প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা ও বিশিষ্টজনরা জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল যুদ্ধাপরাধী মুজাহিদকে ভোট না দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, তার মতো কুখ্যাত রাজাকারকে জাতীয় সংসদে পাঠানো ফরিদপুরবাসীর উচিত হবে না। মুক্তিযুদ্ধের সময় মুজাহিদের স্বাধীনতাবিরোধী ভূমিকার কথা বহু দলিলে উল্লেখ রয়েছে।

সাবেক সাংসদ ও ফরিদপুর জেলা সেক্টর কমান্ডারস ফোরামের আহ্বায়ক প্রিন্সিপাল দেলোয়ার হোসেন সমকালকে বলেছেন, আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার বিপক্ষে বিশেষ ভূমিকা রেখেছিলেন। তিনি বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধকালে পত্রপত্রিকায় পড়েছি, রেডিওতে শুনেছি ও জেনেছি মুজাহিদ পাক বাহিনীর দোসর আলবদর বাহিনীর কমান্ডার ছিলেন।’ তিনি বলেন, ‘এ যুদ্ধাপরাধীকে পবিত্র সংসদে প্রবেশ করতে দেওয়া ঠিক হবে না।’

মুক্তিযোদ্ধা সংসদের ফরিদপুর জেলা ইউনিটের কমান্ডার আবুল ফয়েজ শাহনেওয়াজ বলেন, ‘মুজাহিদ ছিল আলবদর বাহিনীর ডেপুটি চিফ। এ বদর বাহিনীর নীলনকশা অনুযায়ী দেশের বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করা হয়েছে। সেক্টর কমান্ডারস ফোরামের ফরিদপুর জেলা কমিটির সদস্য সচিব শাহনেওয়াজ বলেন, ‘আমাদের সংগঠন প্রামাণ্য দলিল ও তথ্য প্রমাণের ভিত্তিতে মুজাহিদসহ ৫০ জন যুদ্ধাপরাধীর নামের তালিকা প্রকাশ করেছে।’
সেক্টর কমান্ডারস ফোরামের ফরিদপুর জেলা সমন্বয়কারী মুক্তিযোদ্ধা কাজী ফরিদ বলেন, ‘আলবদর বাহিনীর কমান্ডার মুজাহিদ ঘৃণিত ব্যক্তি। এরা বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের শত্রু এবং দেশকে পাকিস্তান বানানোর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। এ যাবৎ বাংলাদেশে যত অনাসৃষ্টি হয়েছে তার মূল হোতা এরাই।’

ফরিদপুরের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি কাজী জায়নুল আবেদীন বলেন, ‘মুজাহিদসহ যেসব আলবদর, রাজাকার, যুদ্ধাপরাধী এবারের নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধে ভোট দিয়ে জনগণ উপযুক্ত জবাব দেবেন।’ তিনি আরো বলেন, ‘চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধীদের নির্বাচনে দাঁড়ানোর সুযোগ দিয়ে সরকার ও নির্বাচন কমিশন ঠিক করেনি। মুজাহিদসহ সব যুদ্ধাপরাধীর অবিলম্বে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানাই।’
ফরিদপুর জেলা কৃষক দলের সাধারণ সম্পাদক সরকারি রাজেন্দ্র কলেজের সাবেক জিএস আফজাল হোসেন খান পলাশ বলেন, ‘বিজয়ের এ মাসে নরঘাতক মুজাহিদকে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সুযোগ দেওয়াকে চরম ধৃষ্টতা মনে করি। এ যুদ্ধাপরাধীকে ফরিদপুরবাসী ভোটের মাধ্যমে প্রত্যাখ্যান করবে। ’

একাত্তরের ঘাতক দালাল ও যুদ্ধাপরাধীদের সম্পর্কে জাতীয় গণতদন্ত কমিশনের রিপোর্টে বলা হয়েছে, ‘আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ ’৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে দলীয় আদর্শ অনুযায়ী পাকিস্তান সেনাবাহিনীর গণহত্যা, লুটপাট ও নারী নির্যাতনে সহযোগিতা করেছেন। তার নেতৃত্বাধীন আলবদর বাহিনী বিজয়ের পূর্ব মুহূর্তে সুপরিকল্পিতভাবে হত্যা করেছে এ দেশের বরেণ্য বুদ্ধিজীবীদের। আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের স্বাধীনতাবিরোধী তৎপরতার বিবরণ পাওয়া গেছে সে সময়ের বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত তার বক্তৃতা-বিবৃতিতে।’ ১৯৭১ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর ফরিদপুরে ছাত্রসংঘের এক জমায়েতে ‘বিপুল করতালির মধ্যে’ আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ ঘোষণা করেন, ‘ঘৃণ্য শত্রু ভারত দখল করার প্রাথমিক পর্যায়ে আমাদেরকে আসাম দখল করতে হবে। এজন্য আপনারা সশস্ত্র প্রস্তুতি গ্রহণ করুন।’

রিপোর্টে আরো বলা হয়, ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ ফকিরাপুল, নয়াপল্টন এলাকার বিভিন্ন বাড়িতে থাকতেন, তার মধ্যে একটি বাড়ি হলো : শেখ ভিলা, ৩/৫ নয়াপল্টন। তবে আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের প্রধান আড্ডা ছিল ফকিরাপুল গরম পানির গলিতে ফিরোজ মিয়ার ১৮১ নম্বর (বর্তমান ২৫৮ নম্বর) বাড়িটিতে। ’৭১-এ মতিঝিল, ফকিরাপুল এলাকার মুক্তিযুদ্ধের কমান্ডার বর্তমানে জাতীয় পার্টি নেতা আবদুস সালাম, মুক্তিযোদ্ধা ও সাংবাদিক জিএম গাউস, মুক্তিযোদ্ধা ও কলামিষ্ট মাহবুব কামালের সাক্ষ্য অনুযায়ী জানা গেছে, ফিরোজ মিয়া ছিলেন এ এলাকার রাজাকার কমান্ডার। তার বাড়িটি শুধু ফকিরাপুল এলাকার নয়, পুরো ঢাকা শহরের রাজাকারদের অন্যতম ঘাঁটি ছিল। এখানেই অনুষ্ঠিত হতো রাজাকারদের বিভিন্ন সভা, সশস্ত্র ট্রেনিং ইত্যাদি। এখান থেকেই পরিচালিত হতো রাজাকারদের বিভিন্ন অপারেশন, রাজাকার রিক্রুটমেন্ট। এখানে এলাকার মুক্তিযোদ্ধা এবং মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের শক্তির লোকদের ধরে এনে নির্যাতন চালানো হতো। ফিরোজ মিয়া গংয়ের নীতিনির্ধারক ছিলেন আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ। কেন্দ্রীয় নেতা হিসেবে তার নির্দেশেই পরিচালিত হতো ফকিরাপুল এলাকার মুক্তিযুদ্ধবিরোধী যাবতীয় তৎপরতা। জিএম গাউস বলেন, ’৭০-এর মাঝামাঝি সময় থেকেই আমরা ফকিরাপুল এলাকার ভাড়াটিয়া আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদকে চিনতাম জামায়াত ও ইসলামী ছাত্রসংঘের লোক হিসেবে। তিনি এলাকায় দলের সাংগঠনিক তৎপরতা চালাতেন। কেন্দ্রীয় সমাবেশে এলাকা থেকে মিছিল নিয়ে যেতেন। এলাকার ছেলেদের ছাত্রসংঘে যোগদানের ব্যাপারে প্ররোচিত করতেন। ’৭১-এর মার্চের পর মুজাহিদের সার্বিক তত্ত্বাবধানে ফকিরাপুলে রাজাকার বাহিনী সংগঠিত হয়। যার নেতৃত্বের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল ফিরোজ মিয়াকে (ফেরু মেম্বার)। মুজাহিদের সরাসরি নির্দেশেই পরিচালিত হয়েছে ফকিরাপুল এলাকায় রাজাকার বাহিনীর তৎপরতা, অস্ত্র ট্রেনিং, রিক্রুটমেন্ট ইত্যাদি। তিনি এলাকার রাজাকারদের অস্ত্র-অর্থ সংগ্রহসহ যাবতীয় দুষ্কর্মে সহযোগিতা করেছেন। মুক্তিযুদ্ধের মাঝামাঝি পর্যায়ে অত্র এলাকার মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক এবং স্বাধীনতার পক্ষের বুদ্ধিজীবীদের ধরে এনে অত্যাচার-নির্যাতন, এমনকি হত্যা করার উদ্দেশ্যে গঠিত আলবদর বাহিনীর নেতা ছিলেন আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ। জাতীয় পার্টি নেতা আবদুস সালাম বলেন, ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের সময় ফকিরাপুল গরম পানির গলির ফিরোজ মিয়ার বাড়িটি ছিল রাজাকারদের অন্যতম নির্যাতন কেন্দ্র। ফিরোজ মিয়া গংয়ের নীতিনির্ধারক বা পরামর্শদাতা ছিলেন আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ। অবশ্য কেন্দ্রীয় নেতা হিসেবে মুজাহিদের অপতৎপরতা শুধু ফকিরাপুল এলাকায় নয়, বিস্তৃত ছিল পুরো ঢাকা শহরে।’
গণতদন্ত কমিশনের রিপোর্টে বলা আরো হয়েছে, ‘মুজাহিদের রিক্রুট ফিরোজ মিয়া ফকিরাপুল এলাকার ৩০০ সদস্যের একটি রাজাকার প্লাটুন গড়ে তোলেন।’ ফকিরাপুল এলাকার পুরনো বাসিন্দাদের সাক্ষ্য থেকে জানা যায়, ‘ফিরোজ মিয়া গং যুদ্ধের সময় ফকিরাপুল ও আরামবাগ এলাকার শত শত বাঙালিকে ধরে নিয়ে হত্যা করেছে। নির্যাতন চালিয়েছে এলাকার মেয়েদের ওপর।’...

আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের স্বাধীনতাবিরোধী তৎপরতা ও নৃশংসতা ’একাত্তরেই শেষ হয়ে যায়নি। সেই মুজাহিদ সংসদ সদস্য হতে ভোটারদের দ্বারে দ্বারে হাজির হচ্ছেন।

শাহরিয়ার কবির সম্পাদিত “একাত্তরের যুদ্ধাপরাধী এবং ‘যুদ্ধাপরাধীদের বিচার’ শীর্ষক গ্রন্থে দীপু হোসেন তার নিবন্ধে উল্লেখ করেছেন, মহান মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী মুজাহিদ ১৯৭১ সালের অক্টোবরে মতিউর রহমান নিজামীর সঙ্গে দেশের বিভিন্ন স্থানে সাংগঠনিক সফর করেন। ২৫ অক্টোবর ইসলামী একাডেমী হলে প্রাদেশিক সদস্যদের এক সম্মেলনে মুজাহিদ তার বক্তব্যে পাকিস্তানের ছাত্র-জনতাকে দুষ্কৃতিকারী (মুক্তিযোদ্ধা) খতম করার দৃঢ় অঙ্গীকার নিয়ে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান (সূত্র : দৈনিক সংগ্রাম ২৬-১০-৭১)। একই মাসের ২৭ তারিখে রংপুর জেলা ছাত্রসংঘের সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে মুজাহিদ সবাইকে জিহাদি মনোভাব নিয়ে পাকিস্তান বাহিনীর পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান (সূত্র : দৈনিক সংগ্রাম ২৮-১০-৭১)। মতিউর রহমান নিজামী ও আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের নেতৃত্বাধীন আলবদর বাহিনী ১৯৭১ সালের শেষভাগে তাদের তৎপরতা বাড়িয়ে দেন এবং ১৪ নভেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে ঢাকায় ‘বদর দিবস’ পালন করেন।”

আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের বাবা মওলানা আবদুল আলী ছিলেন স্কুল শিক্ষক ও হেকিম। মুজাহিদের ভাই মোহাম্মদ খালেছ ফরিদপুর জেলা জামায়াতের নায়েবে আমির। তার এক ভাই মোহাম্মদ আসলাম ইসলামী ব্যাংক লিমিটেডের ভাইস প্রেসিডেন্ট, তার আরেক ভাই আলী আশরাফ সোয়ায়েব দৈনিক সংগ্রামের ফরিদপুর জেলা প্রতিনিধি। মুজাহিদের বড় ছেলে তাসদিদ রাজধানীর একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে চাকরি করেন। মেজ ছেলে তাহ্ফিক গ্রামীণফোনের একজন কর্মকর্তা এবং ছোট ছেলে মাবরুব রাজধানীতে অনুবাদকের কাজ করেন। তার একমাত্র মেয়ে তামরিনা ঢাকা ইডেন কলেজে অনার্স শেষ বর্ষের ছাত্রী।

মুজাহিদ অষ্টম শ্রেণীর ছাত্র থাকা অবস্থায় ‘বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রসংঘে’ যোগদান করে রাজনৈতিক জীবন শুরু করেন। ১৯৬৪ সালে ফরিদপুর জিলা স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাস করে তিনি ফরিদপুর সরকারি রাজেন্দ্র কলেজে ভর্তি হন। কলেজ জীবনে তিনি জামায়াতের রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। এরপর তিনি ঢাকায় চলে যান।
স্বাধীনতা যুদ্ধের পর মুজাহিদ নারায়ণগঞ্জে আদর্শ কিন্ডারগার্টেন নামে একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে তিন বছর প্রধান শিক্ষক পদে ছিলেন। তার ভাই মোঃ খালেছ জানান, রাজনীতিতে জড়িত থাকা অবস্থাতেই মুজাহিদ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে এমএ করেছেন।

দৈনিক সমকাল, ১৮ ডিসেম্বর, ২০০৮

নির্বাচনে যুদ্ধাপরাধী প্রার্থীরা -০২

এ এম রিয়াছাত আলী

সমকাল প্রতিবেদক

আশাশুনি ও শ্যামনগর উপজেলা নিয়ে গঠিত সাতক্ষীরা-৩ আসন থেকে চারদলীয় জোট প্রার্থী হয়েছেন জামায়াত নেতা এএম রিয়াছাত আলী। তার বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ রয়েছে। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে তিনি ছিলেন সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলার শান্তি কমিটির সেক্রটারি। রাজাকার হিসেবে পরিচিত এই জামায়াত নেতার বিরুদ্ধে একাত্তরে শ্যামনগর ও কালীগঞ্জ থানায় মুক্তিযোদ্ধাদের নির্বিচারে হত্যার অভিযোগ রয়েছে। নিহত এই মুক্তিযোদ্ধাদের একজন হলেন কালীগঞ্জের ইউনুস।

আশাশুনি ও শ্যামনগরের বাসিন্দারা জানান, একাত্তরের আগস্ট মাসে খুলনার কয়রা উপজেলার খুকরোঘাটি লঞ্চঘাটে মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে ধরা পড়েছিলেন স্থানীয় রাজাকার কমান্ডার রিয়াছাত। সেখান থেকে তাকে নেওয়া হয় কয়রার মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে। ক্যাম্পের দায়িত্বে ছিলেন তারই প্রতিবেশী বীর মুক্তিযোদ্ধা মতিয়ার রহমান। তখন রমজান মাস। মতিয়ারের মহানুভবতায় প্রাণভিক্ষা পান রিয়াছাত। নিরাপদে তাকে পৌঁছে দেওয়া হয় আশাশুনি উপজেলার প্রতাপনগর গ্রামের নিজ বাড়িতে। কিন্তু স্বাধীনতার ৩১ বছর পর আবারো পুরনো দিনে ফিরে যান রিয়াছাত আলী বিশ্বাস। অভিযোগ রয়েছে, একদিন যে মুক্তিযোদ্ধা তাকে প্রাণে বাঁচিয়েছিলেন, ২০০১ সালে সেই মতিয়ার রহমানের বাড়িতেই অগ্নিসংযোগ করেন তিনি।

যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ থাকলেও রাজনীতিতে রিয়াছাত আলী বিশ্বাস এখন বেশ শক্তিশালী। তাই এবারো তিনি চারদলীয় জোট থেকে মনোনয়ন পেয়েছেন। একই আসন থেকে পরপর দু’বার সাংসদ নির্বাচিতও হন তিনি। এর আগে একবার মেম্বার ও একবার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছিলেন। তার বাবা সাতক্ষীরার আশাশুনির কুড়িকাহনিয়া গ্রামের মৃত আলী বিশ্বাস পেশায় ছিলেন দর্জি।

রিয়াছাত আলী বিশ্বাসের জন্ম সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলার প্রতাপনগর গ্রামে। একাত্তরের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে সাতক্ষীরা জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড কাউন্সিলের সাবেক আহ্বায়ক মতিয়ার রহমান জানান, নদী পথে এ অঞ্চলের মানুষের নিয়মিত যোগাযোগ ছিল খুলনা শহরের সঙ্গে। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার পরপরই রিয়াছাত আলী বিশ্বাসের নেতৃত্বে গঠিত হয় শান্তি কমিটি। যুদ্ধ চলাকালে খুলনার পাকিস্তান সেনা ক্যাম্পের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করতেন রিয়াছাত। ’৭১-এর জুনে মেজর জলিলের লঞ্চডুবি হয় সুন্দরবন সংলগ্ন গাবুরা এলাকার খোলপেটুয়া নদীতে। কোনোভাবে নদী সাঁতরে প্রতাপনগর গ্রামে চলে আসেন ওই লঞ্চে থাকা বরিশাল অঞ্চলের নয় মুক্তিযোদ্ধা। কিন্তু রক্ষা পান না। খবর পেয়ে প্রতাপনগর ঘিরে ফেলে রাজাকার রিয়াছাত আলী ও তার লোকজন। নয় মুক্তিযোদ্ধাকে ধরে নিয়ে যান খুলনার পাকসেনা ক্যাম্পে। এরপর ওই নয় মুক্তিযোদ্ধার আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি।

মুক্তিযোদ্ধা মতিয়ার রহমান আরো জানান, রিয়াছাত আলীর সহযোগিতায় একাত্তরের জুলাই মাসে পাঞ্জাব রেজিমেন্টের পাকসেনারা গানবোটে চড়ে প্রতাপনগর গ্রামে হানা দেয়। তারা ওই গ্রামের খগেন্দ্র নাথ সরকারকে খুলনার ক্যাম্পে নিয়ে গুলি করে হত্যা করে। এর কিছুদিন পর একই গ্রামের সোহরাব ও জনাব আলীকে একইভাবে ধরে নিয়ে গুলি করে হত্যা করা হয় পাকিস্তানি সেনাক্যাম্পে। এ ছাড়া মুক্তিযুদ্ধের পুরো সময় খুলনা, বরিশাল, পটুয়াখালী ও বাগেরহাট এলাকার ভারতগামী শরণার্থীদের নৌকা আটকে লুটপাট করা ছিল রিয়াছাত আলী ও তার লোকজনের কাজ।

’৯১ সালে রিয়াছাত আলী বিশ্বাস প্রথম সাতক্ষীরা-৩ আসন থেকে জামায়াতের টিকিটে সাংসদ নির্বাচিত হন। ’৯৬ সালের নির্বাচনে পরাজিত হন আওয়ামী লীগ প্রার্থীর কাছে। তবে ২০০১-এর নির্বাচনে তিনি একই আসন থেকে আবার সাংসদ নির্বাচিত হন। নির্বাচিত হওয়ার মাত্র কয়েকদিনের মাথায় তারই ইন্ধনে জামায়াতের ক্যাডার বাহিনী মুক্তিযোদ্ধা মতিয়ার রহমানের বাড়ি লুটপাটের পর আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেয় বলে অভিযোগ রয়েছে। পরিবার-পরিজন নিয়ে পালিয়ে না গেলে সেদিন সপরিবারে প্রাণ হারাতেন মুক্তিযোদ্ধা মতিয়ার রহমান। আরো অভিযোগ রয়েছে, গত জোট সরকারের আমলে রিয়াছাত আলীর পরিবারের সদস্যরা যেন বেপরোয়া হয়ে ওঠে। ২০০১ সালের নির্বাচনের পর রাতারাতি দখল করে নেন মুক্তিযোদ্ধা মতিয়ার রহমানের দুটিসহ আওয়ামী সমর্থকদের কয়েকটি চিংড়ি ঘের। তিনি সাতক্ষীরা ও পাটকেলখাটায় নির্মাণ করেছেন বাড়ি। বড় ছেলে জুলফিকার হোসেন মাদ্রাসায় শিক্ষকতার পাশাপাশি ঘের ব্যবসা দেখাশোনা করছেন। মেজো ছেলে নুরুল আফছার সাতক্ষীরার বড় ব্যবসায়ী। রয়েছে একটি কম্পিউটার সার্ভিসিং সেন্টার ও আরএসও নামে একটি এনজিও। বড় ছেলের সরকারি খাল দখলের বিষয়টি আশাশুনিতে ব্যাপক সমালোচনার ঝড় তোলে। ১৯ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত আশাশুনি হাসপাতালের কাজের দরপত্রের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিএনপি নেতা বরুন কুমার বিশ্বাস। রিয়াছাত আলী অবশ্য এসব অস্বীকার করে বলেন, ‘স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় আমি রাজাকার বাহিনীতে যোগ দেইনি। পাকসেনাদের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক ছিল না। নানাজনের কানকথা শুনে মুক্তিযোদ্ধারা তাদের ক্যাম্পে ডেকে নিয়ে গিয়েছিল। পরে ছেড়ে দেওয়া হয়। এমপি হওয়ার পর কোনো অন্যায় কাজ করিনি। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরা আমাকে রাজাকার বানানোর চেষ্টা করছেন।

দৈনিক সমকাল, ১৮ ডিসেম্বর, ২০০৮

নির্বাচনে যুদ্ধাপরাধী প্রার্থীরা -০১

একাত্তরে বিতর্কিত ভূমিকা ও যাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ রয়েছে তারা এবারের জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও প্রার্থী হয়েছেন। বিএনপি ও জামায়াতের টিকিটে মনোনয়ন নিয়ে এখন তারা ঘুরে ফিরছে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা এবং স্বাধীনতা যুদ্ধের বিভিন্নদলিল ও বইপত্রে তাদের বিরুদ্ধে একাত্তরের পুরো ৯ মাসজুড়ে বাঙালি নিধন, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট ও পাকবাহিনীকে সহযোগিতার তথ্য-প্রমাণ মিলেছে। তারা ধর্মের নামে ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে দৃষ্টি ফেরাতে চাইছে একাত্তরের সেই হত্যাযজ্ঞ, নির্যাতন-নিপীড়নের চিত্র থেকে। ভুলে যেতে বলছে পেছনের কথা। বোঝাতে চাইছে মুক্তিযুদ্ধ তাদেরও ফসল। সমকালের অনুসল্পব্দানে সারাদেশে এ রকম অন্তত ১২ জনের নানা যুদ্ধাপরাধের তথ্য উঠে এসেছে। অনুসন্ধানে প্রাপ্ত তথ্য নেওয়া হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন ও একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল জাতীয় সমন্নয় কমিটি প্রকাশিত একাত্তরের ঘাতক দালাল ও যুদ্ধাপরাধীদের সম্পর্কে জাতীয় গণতদন্ত কমিশনের দুটি রিপোর্ট, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর প্রকাশিত ‘৭১ : গণহত্যার দলিল’, একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির প্রকাশিত ‘রাজাকারমুক্ত সংসদ চাই’ শীর্ষক পুস্তিকা এবং ওয়ার ক্রাইমস ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটির বিভিন্ন সময় প্রকাশিত গবেষণা প্রতিবেদন থেকে।

মতিউর রহমান নিজামী

সমকাল প্রতিবেদক

মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি হানাদারদের সহযোগিতা, বুদ্ধিজীবী হত্যা ও গণহত্যার সঙ্গে জড়িত অভিযোগে অভিযুক্ত যে ক’জন এবারের সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হয়েছেন জামায়াতের আমির মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী তাদের মধ্যে অন্যতম। তিনি এবার পাবনা-১ (বেড়া-সাঁথিয়া) আসনে জামায়াত তথা চারদলীয় জোট প্রার্থী। তার বিরুদ্ধে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় বাঙালি হত্যা, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট, পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে সহায়তা, রাজাকার বাহিনীর নেতৃত্ব দান এবং ধর্ষণ-নির্যাতনসহ নানা অপকর্ম চালানোর সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে। পাবনার সাঁথিয়া উপজেলার মন্মথপুর গ্রামের মৃত খন্দকার লুৎফর রহমানের ছেলে মতিউর রহমান নিজামী জোট সরকারের আমলে শিল্পমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।

এএসএম সামছুল আরেফিন তার ‘মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ব্যক্তির অবস্থান’ বইয়ে লিখেছেন, নিজামী মুক্তিযুদ্ধের সময় পূর্ব পাকিস্তান আলবদর বাহিনীর সর্বাধিনায়ক ছিলেন (পৃ-৪২৭)। ‘একাত্তরের ঘাতক দালাল ও যুদ্ধাপরাধীদের সম্পর্কে জাতীয় গণতদন্ত কমিশনের রিপোর্ট’-এ (সংক্ষিপ্ত ভাষ্য) বলা হয়েছে, ‘১৯৭১ সালে এ জামায়াত নেতা বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের বিরুদ্ধে তার যাবতীয় কর্মতৎপরতা পরিচালনা করেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি জামায়াতে ইসলামীর ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্র সংঘের সভাপতি ছিলেন। তার প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে মুক্তিযুদ্ধকে প্রতিহত এং মুক্তিযোদ্ধাদের নির্মূল করার জন্য আলবদর বাহিনী গঠন করা হয়। মতিউর রহমান নিজামী এই আলবদর বাহিনীর প্রধান ছিলেন। ... আলবদরের নেতারা বুদ্ধিজীবী হত্যার নীল নকশা প্রণয়ন করেন এবং তাদের নির্দেশে ডিসেম্বর মাসে ঢাকাসহ সারাদেশে শত শত বরেণ্য বুদ্ধিজীবীকে হত্যা করা হয়।’

নিজামী যে স্বাধীনতাবিরোধী ছিলেন মুক্তিযুদ্ধকালীন বহু দলিল থেকে তার প্রমাণ পাওয়া যায়। যেমন ১৯৭১ সালের ১৪ নভেম্বর দৈনিক সংগ্রামে প্রকাশিত এক নিবন্ধে নিজামী বলেন, ‘আমাদের পরম সৌভাগ্যই বলতে হবে, পাকবাহিনীর সহযোগিতায় এ দেশের ইসলামপ্রিয় তরুণ সমাজ বদর যুদ্ধের প্রস্তুতিকে সামনে রেখে আলবদর বাহিনী গঠন করেছে। সেদিন আর খুব দূরে নয়, যেদিন আলবদরের তরুণ যুবকরা আমাদের সশস্ত্র বাহিনীর পাশাপাশি দাঁড়িয়ে হিন্দু বাহিনীকে (শত্রুবাহিনী) পর্যুদস্ত করে হিন্দুস্তানের অস্তিত্বকে খতম করে সারা বিশ্বে ইসলামের বিজয় পতাকা উড্ডীন করবে।’ (সূত্র : গণতদন্ত কমিশন রিপোর্ট)।

জাতীয় গণতদন্ত কমিশন রিপোর্টে আরো বলা হয়েছে, ‘পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যারা যুদ্ধ করেছে তাদের ধ্বংস করার আহ্বান সংবলিত নিজামীর ভাষণ ও বিবৃতির বহু বিবরণ একাত্তরের জামায়াতে ইসলামীর মুখপাত্র দৈনিক সংগ্রামে ছাপা হয়েছে। যশোর রাজাকার সদর দফতরে সমবেত রাজাকারদের উদ্দেশ্য করে নিজামী বলেন, জাতির এ সংকটজনক মুহহৃর্তে প্রত্যেক রাজাকারের উচিত ঈমানদারির সঙ্গে তাদের ওপর অর্পিত এ জাতীয় কর্তব্য পালন করা এবং ওইসব ব্যক্তিকে খতম করতে হবে যারা সশস্ত্র অবস্থায় পাকিস্তান ও ইসলামের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত রয়েছে’ (পৃ ৫-৬)।

নিজামীর এলাকার লোকজনও নিজামীর বিরুদ্ধে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় হত্যা, লুটতরাজ ও নির্যাতনে জড়িত থাকার অভিযোগ করেন। যেমন ১৯৭১-এ ৭ নম্বর সেক্টরের মুক্তিযোদ্ধা আবদুল কুদ্দুস গণতদন্ত কমিশনকে জানিয়েছেন, তিনি আলবদর বাহিনীর একটি সমাবেশ ও গোপন বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে মতিউর রহমান নিজামীও উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে কোথায় কোথায় মুক্তিবাহিনীর ঘাঁটি এবং আওয়ামী লীগ নেতাদের বাড়ি আছে তা চিহ্নিত করা হয়। বৈঠকে নিজামী মুক্তিযোদ্ধাদের হত্যা, ঘাঁটি ধ্বংস এবং আওয়ামী লীগারদের শেষ করার নির্দেশ দেন। বৈঠকের পরদিন রাজাকার বাহিনীর সহযোগিতায় বৃশলিকা গ্রাম ঘিরে ফেলে গোলাগুলি, নির্যাতন ও লুটতরাজ করে এবং বাড়িঘর আগুনে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দেয় আলবদররা। নিজামীর বিরুদ্ধে একই অভিযোগ এনে সাঁথিয়ার মিয়াপুর গ্রামের মোঃ শাহজাহান আলী গণকমিশনকে জানান, যুদ্ধের সময় তিনি রাজাকারদের হাতে ধরা পড়লে আরো কয়েকজন আটক মুক্তিযোদ্ধার সঙ্গে তার গলায়ও ছুরি চালানো হয়েছিল। অন্যদের জবাই করা হলেও শাহজাহান আলী ঘটনাচক্রে বেঁচে যান। গলায় কাটা দাগ নিয়ে তিনি এখন পঙ্গু জীবনযাপন করছেন (জাতীয় গণতদন্ত কমিশন রিপোর্ট, সংক্ষিপ্ত ভাষ্য পৃ.-৬)।

সাঁথিয়ার শোলাবাড়িয়া গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা আবদুল কুদ্দুস বলেন, ‘১৯৭১ সালের ২৬ নভেম্ভর নিজামীর নির্দেশে এবং রাজাকার সাত্তারের নেতৃত্বে আলবদর ক্যাডাররা ধুলাউড়ি গ্রামে গণহত্যা চালায় এবং ৩০ জন মুক্তিযোদ্ধাকে হত্যা করে। বেড়া উপজেলার বৃশালিকা গ্রামের সোহরাব আলীকে মাওলানা নিজামীর নির্দেশে গুলি করে হত্যা করে রাজাকার বাহিনী। এছাড়া একই এলাকার প্রফুল্ল প্রামাণিক এবং তার ছেলে ষষ্টি প্রামাণিককে রাজাকার বাহিনীর সদস্যরা হত্যা করে এবং তাদের বাড়ি জ্বালিয়ে দেয়।’ ওই ঘটনার কয়েকজন সাক্ষী রয়েছেন বলে মুক্তিযোদ্ধা আবদুল কুদ্দুস জানান।

সাঁথিয়ার লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, নিজামীর নির্দেশে করমজা গ্রামে গণহত্যা চালায় জামায়াত নেতা সিরাজ ডাক্তারের ছেলে রফিকুন্নবী। এ ব্যাপারে ডা. সিরাজ ও রফিন্নবীকে আসামি করে ১৯৭২ সালে একটি মামলা হলেও পরে তা ধামাচাপা পড়ে যায়।

সাঁথিয়ার মিয়াপুর গ্রামের জামাল উদ্দিনের ছেলে মুক্তিযোদ্ধা শাহজাহান বলেন, ‘নিজামীর প্রত্যক্ষ মদদে মুক্তিযোদ্ধা বটেশ্বর, চাঁদ, দারা, শাহজাহান, মোসলেম ও আখতারকে আলবদররা হত্যা করে। তারা মুক্তিযোদ্ধা কবিরের গায়ে পেট্রোল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়।’ সাঁথিয়ার লোকজন জানান, স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় পাকিস্তানি বাহিনীর ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে কাজ করায় এলাকার লোকজন মতিউর রহমান নিজামীকে ‘মইত্যা রাজাকার’ বলেও ডাকেন।

বুদ্ধিজীবী হত্যার পর ১৯৭১ সালের ৪ ডিসেম্বর নিজামী মাওলানা সুবহান ও মাওলানা ইসহাকসহ পাকিস্তান হয়ে সৌদি আরব যান। সেখান থেকে তারা বাংলাদেশবিরোধী প্রচারণা চালাতে থাকেন। ১৯৭৭ সালে জিয়াউর রহমান ক্ষমতা গ্রহণের পর মাওলানা নিজামী পাকিস্তান হয়ে ব্রিটিশ এয়ারওয়েজযোগে ঢাকায় আসেন এবং মগবাজারে একটি ভাড়া বাসায় ওঠেন।

সাঁথিয়ার ক্ষেতুপাড়া গ্রামের রমিজ উদ্দিন জামায়াতের সমর্থক। তিনি বলেন, ‘জামায়াতের লুটপাট আর স্বজনপ্রীতির কারণে এখন জামায়াতের সমর্থক বলে পরিচয় দিতে লজ্জা করে।’

নিজামী বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের মন্ত্রী ছিলেন। তিনি মন্ত্রী থাকাকালে সাঁথিয়ার জামায়াত নেতা-কর্মীরা অন্য রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীদের ওপর নানা নির্যাতন চালায় বলে অভিযোগ রয়েছে। সাঁথিয়া উপজেলা জামায়াতের সাবেক আমির আবদুল কুদ্দুস, মাওলানা আবদুল মালেক, প্রফেসর মোহাম্মদ আলী, আকমল হোসেন, বেড়া উপজেলা জামায়াতের আমির আবু দাউদ, মকসুদ আহমেদ চৌধুরী ও জামায়াত নেতা রফিকুন্নবী এলাকায় নিজামীর প্রতিনিধিত্ব করেন। তাদের সম্পর্কে কোনো অভিযোগই নিজামী কানে তোলেন না। তারা স্থানীয়ভাবে নিজামীর ৬ খলিফা হিসেবে পরিচত। স্থানীয়দের অভিযোগ, সাঁথিয়া ও বেড়ায় সরকারি জায়গা দখল করে অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন নিজামীর সহযোগীরা। আলহেরা একাডেমী, ছোন্দহ কলেজ, জোড়গাছা কলেজ তার মধ্যে অন্যতম।

সাম্প্রতিক জরুরি অবস্থাকালে নিজামীর বিরুদ্ধে দুটি দুর্নীতির মামলা করা হয়। মামলা দুটি হলো বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি দুর্নীতি মামলা ও গ্যাটকো দুর্নীতি মামলা। গ্যাটকো দুর্নীতি মামলায় তিনি বেশ কিছুদিন কারাভোগ করেন। ওই মামলায় তিনি জামিনে রয়েছেন।

বর্তমান নির্বাচনের প্রার্থী হিসেবে নিজামী মনোনয়নপত্রের সঙ্গে দাখিল হলফনামায় বলেছেন, তার বিরুদ্ধে ফৌজদারি তিনটি মামলা রয়েছে। একটি মামলার কার্যক্রম ২০/০৫/০৭ তারিখে স্থগিত হয়েছে। অপর একটি মামলার কার্যক্রম ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ২ ও ৫ ধারা এবং জরুরি বিধিমালা আইনের-০৭ নং এর ১৫ বিধিমোতাবেক স্থগিত রয়েছে। এছাড়া অন্য মামলাটির কার্যক্রমও দুই মাসের জন্য স্থগিত রয়েছে, যা হাইকোর্ট বিভাগের ফৌজদারি মিস কেস নং-১৯৩২৭/০৮। বর্তমান তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলেই নিজামী দুর্নীতির অভিযোগের গ্রেফতার হন এবং কিছুদিন কারাভোগ করেন।

দৈনিক সমকাল, ১৮ ডিসেম্বর, ২০০৮

১৫ ডিসেম্বর, ২০০৮

শ্রীরামসি ও রানীগঞ্জের নির্মম হত্যাযজ্ঞের স্মৃতি আজো কাঁদায় জগন্নাথপুরবাসীকে

পাকিস্তানি হানাদারদের হাতে শহীদ হন ১৫৪ বাঙালি

সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি : মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ১৯৭১ সালের ৩১ আগষ্ট সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলার শ্রীরামসি গ্রামে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী যে জঘন্যতম গণহত্যা চালিয়েছিল তা আজও সবার মনে শিহরণ জাগায়। দুটি গ্রাম মিলিয়ে সেদিন পাকিস্তানি হানাদারদেও হাতে নির্মমভাবে শহীদ হন ১৫৪ জন।
এলাকাবাসী জানান, ৩১ আগস্ট বেলা ১০টার দিকে কয়েকটি নৌকা যোগে পাকিস্তানি সেনারা শ্রীরামসি বাজারে এসে আলবদর আল শামসদের এলাকার লোকদের বিদ্যালয়ে উপস্থিত করার জন্য নির্দেশ দেয়। পাকিস্তানি বাহিনীর নির্দেশে দেশীয় রাজাকাররা এলাকার সচেতন ও শিক্ষিত অশিক্ষিত যুবকদের ডেকে একটি রুমে জড়ো করে। সেখানে সবার হাত পেছনে নিয়ে বেঁধে ফেলা হয়। পরে শতাধিক শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী ও যুবককে বেঁধে নৌকায় নিয়ে গিয়ে এক সঙ্গে এলোপাতাড়ি গুলি ছুঁড়ে হত্যা করে পাকিস্তানি হানাদাররা। অন্যান্য দলকেও একইভাবে বেঁধে পার্শ্ববর্তী পুকুর পারে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে ব্রাশ ফায়ার করে পাষাণের মতো হত্যা করে নরপিশাচরা। আহত হয়ে যারা কোনো রকমে বাঁচার তাগিদে পুকুরে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন তাদের ওপরও পুকুর পার থেকে গুলি ছুঁড়ে কাপুরুষের মতো হত্যা করা হয়। শুধুমাত্র বয়সে যারা খুবই বৃদ্ধ তাদের প্রায় অক্ষত অবস্থায় ছেড়ে দেয় হানাদাররা। কেউ কেউ নরপশুদের অত্যাচার থেকে প্রাণ বাঁচাতে গ্রাম ছেড়ে অন্যত্র পালাতে সক্ষম হন।
পাকিস্তানি হানাদারদের নিষ্ঠুর এ হত্যাকাণ্ডে শহীদ হন ১২৪ জন বিভিন্ন বয়স ও পেশার লোক। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছেন শিক্ষক তহশিলদার, পোস্টমাস্টার, ডাক পিয়ন, ইউপি মেম্বার, ছাত্র যুবক, বৃদ্ধ, প্রবাসী ও বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষ। গুটি কতক আহত হয়ে বেঁচে যান। ঘাতকেরা এ বর্বর পৈশাচিক গণহত্যার পরও ক্ষান্ত হয়নি। শুর" করে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ। শ্রীরামসি বাজারে কেরোসিন তেল ছিটিয়ে প্রায় আড়াইশ থেকে তিনশ ঘরবাড়ি দোকানপাট জ্বালিয়ে দেয়। গুলির শব্দে ও আগুনের লেলিহান শিখা দেখে গ্রামবাসী ছুটে পালান। জনশূণ্য অবস্থায়ও পাকিস্তানি হানাদাররা গ্রামে হামলা চালিয়ে ঘরবাড়ি পুড়িয়ে ফেলে। হানাদার সৈন্যরা চলে যাওয়ার পর চারদিকে মৃতদেহ ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে থাকে। ভয়ে আতঙ্কে পালিয়ে যাওয়া গ্রামবাসীর কেউই প্রায় সপ্তাহ খানেক গ্রামে ফেরেননি। তখন শিয়াল, কুকুর ও শকুনেরা লাশ নিয়ে টানাটানি শুর" করে। এরপর আস্তে আস্তে লোকজন গ্রামে এসে ৪/৫ টি করে মৃতদেহ একেক গর্তে কবর দেন। শ্রীরামসি বধ্যভুমিতে শায়িত শহীদদের মধ্যে ৩৪ জনের নাম জানা গেছে। তারা হলেন মৌলানা আব্দুল হাই, সত্যেন্দ্র নাথ চক্রবর্তী, এহিয়া চৌধুরী, আশরাফ হোসেন, শফিকুর রহমান, ফিরোজ মিয়া, সুনু মিয়া, আলা মিয়া, সমুজ মিয়া, নজির মিয়া, আব্দুল মন্নান, ওয়ারিছ মিয়া, মানিক মিয়া, আব্দুল জলিল, দবির মিয়া, মরম উল্লাহ, মন্তাজ আলী, সওয়াব উল্লাহ, রইছ উল্লাহ, আব্দুল মজিদ, আব্দুল লতিফ, এখলাছ মিয়া, মোক্তার মিয়া, সমীর আলী, জহুর আলী, নুর মিয়া, আব্দুল মন্নান, আছা মিয়া, তৈয়ব আলী, রোয়াব আলী, মছদ্দর আলী, তোফাজ্জল আলী, ডা. আব্দুল মন্নান এবং রুপু মিয়া। অন্যান্য শহীদদের নাম পাওয়া যায়নি। গুলিবিদ্ধ হয়েও ঘটনাক্রমে ৮ জন বেঁচে যান। তারা হচ্ছেন জোয়াহির চৌধুরী, আলকাছ মিয়া, কফিল উদ্দিন, তপন চক্রবর্তী, সুন্দর আলী, আমজাদ আলী ও জাফর মিয়া। তারা আজো সেদিনের ঘটনার কথা মনে করে আঁতকে ওঠেন। ইতিহাসের কলঙ্কজনক ও জঘন্যতম এ গণহত্যার সংবাদ এ সময় বিবিসি থেকে প্রচার করে বিশ্ববাসীকে জানানো হয়। একই সময়ে জগন্নাথপুর থানার রাণীগঞ্জ বাজারেও তাণ্ডবলীলা চালায় পাকিস্তানি হানাদাররা। কিছুসংখ্যক আলবদর আলশামস ও রাজাকারদের সাহায্যে বাজারে আগুন জ্বালিয়ে দোকান ঘরবাড়ি ছারখার করে দেয় তারা। নৃশংসভাবে হত্যা করে ৩০ জনের মতো নিরীহ ও শান্তিপ্রিয় বাঙালিকে। মারাত্মক আহত হয়েও বেঁচে যান ৫ জন। প্রায় ২০০ দোকানপাট ভস্মীভূত হয়।
নিষ্ঠুর সে হত্যাযজ্ঞের শহীদদের স্মরণে শ্রীরামসি উচ্চ বিদ্যালয় প্রাঙ্গনে স্থানীয় মুক্তি সংগ্রাম স্মৃতি ট্রাস্ট একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মিত করেছে। প্রতি বছর এখানে শহীদদের স্মরণে বিভিন্ন অনুষ্ঠানমালার আয়োজন করা হয়। তবে শ্রীরামসি গ্রামকে শহীদনগর নামকরণ করতে এলাকাবাসী দীর্ঘদিন ধরে দাবি জানালেও তা আজো বাস্তবায়িত হয়নি।

সূত্র: ভোরের কাগজ, ১৫ ডিসেম্বর, ২০০৮

৫ ডিসেম্বর, ২০০৮

বাংলাদেশ জেনোসাইড স্টাডি গ্রুপ

BGSG বাংলাদেশের গণহত্যা নিয়ে একটি তথ্যসমৃদ্ধ আর্কাইভ তৈরি করেছে। Kean University বাংলাদেশের গণহত্যা নিয়ে নিয়ে কোর্স চালায় তার জন্য এই আর্কাইভের প্রয়োজন। কিন্তু এর পাশাপাশি এরা ইহুদি গণহত্যা ও অন্য গণহত্যা নিয়েও কাজ করার প্রত্যাশা করে। নিউ জার্সির Holocaust Commission এর সাথে এই আর্কাইভ সম্পর্কিত।
নিজেদের সম্পর্কে বর্ণনা করতে গিয়ে বলেছে
The group has Bangladesh genocide as its primary agenda; however, the group will also honor the issue of human rights and genocide in other countries. The goal of this organization is to work with the relevant organizations that work for human rights and voice against crime against humanity. Thus, the study and the work of this group shall not be limited only on Bangladesh Genocide.

BGSG বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন ধরণের সেমিনার, সিরিজ বক্তৃতা, আলোচনা সভা, মুক্তিযুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্থদের সাথে কিংবা তাদের পরিবারের সাথে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা বিনিময়, গণহত্যার ছবি নিয়ে প্রদর্শনীর আয়োজন, ভিডিও প্রদর্শনীর আয়োজন ইত্যাদি পদ্ধতিতে আন্তর্জাতিক বাতাবরণে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য কাজ করে।

বিস্তারিত তথ্যের জন্য BGSG'র ওয়েবসাইট ভ্রমণ করুন।

২ ডিসেম্বর, ২০০৮

বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করুন


সাধারণত আমরা বিভিন্ন জাতীয় দিবসে বাড়িতে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করি। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে প্রতিদিন জাতীয় পতাকা উত্তোলন করতে হয়। এ বিষয়ে আমাদের কারও মধ্যে কোন মতভেদ নেই। সারা বিশ্বেই বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় দিবসে অফিসে, বাসা-বাড়িতে, গাড়িতে পতাকা উত্তোলনের রেওয়াজ আছে।

আমরা আমাদের নিজেদের ব্লগগুলোতেও ডিসেম্বর মাসকে সামনের রেখে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করতে পারি। ডিসেম্বর মাসে একাধিক দিন আছে যেদিনগুলোতে আমরা বাড়ি বা প্রতিষ্ঠানের সামনে সরকারি নিয়ম মতো আমাদের প্রিয় জাতীয় পতাকা উত্তোলন করবো। তাহলে ব্লগে কেন পতাকা প্রদর্শন করবো না?

বাস্তব জীবনের মতো ব্লগেও আমরা পতাকা উত্তোলন করতে পারি। এজন্য সবার জন্য পতাকার একটি লিংক দিয়ে দিলাম। আপনারা নিজেদের ব্লগে এই লিংক ব্যবহার করে পতাকাটি প্রদর্শন করতে পারেন। কিংবা নিজেদের কোন হোস্টিংয়ে পতাকাটিকে আপলোড করেও ব্যবহার করতে পারেন। এই পতাকাটি ব্যবহার না করে নিজের আঁকা কোন পতাকাও উত্তোলন করতে পারেন। তবুও নিজ নিজ ব্লগে আমাদের প্রিয় পতাকাটি উত্তোলন করুন।
পতাকার ডাইরেক্ট লিংক: http://i37.tinypic.com/6h6xhz.jpg

অন্তত: বিজয়ের মাসে নিজেদের ব্লগে বাংলাদেশের লাল-সবুজ পতাকাটিকে সমুন্নত রাখুন। ঘাতক দালালদের বিরুদ্ধে জনমত ও গণচেতনা গড়ে তুলুন।

আপনারা ইচ্ছে করলে
http://muktisena.blogspot.com
অথবা
http://bd71.blogspot.com
এই দুটো ব্লগের যেকোন একটির লিংক ব্যবহার করতে পারেন।
(ব্লগের লিংক দেয়াটা আপনার ইচ্ছাধীন। কোন বাধ্যবাধকতা নেই। পতাকাটি অনলাইনে ঘোরাঘুরি করতে গিয়ে পেয়েছি। কপিরাইট আছে কি? থাকলে জানান।)

৬ নভেম্বর, ২০০৮

মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক সাইট

বাংলাভাষায় মুক্তিযুদ্ধ বিষয়কে নিয়ে এককভাবে গড়ে ওঠা সাইটের সংখ্যা খুব কম। স্বাধীনতার এত বছর পরেও শুধুমাত্র মুক্তিযুদ্ধকে নিয়ে সাইটের সংখ্যা দেখে লজ্জা লাগে। অবশ্য বিভিন্ন সাইটে তাদের মূল বিষয়ের পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধকেও তারা রেখে দিয়েছে। এমন সাইটের সংখ্যাই বেশি। তো, সব মিলিয়ে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে তথ্য আছে এমন সাইটগুলোর একটি খসড়া তালিকা তৈরির চেষ্টা করেছি। আগ্রহীরা প্রয়োজনবোধে ঘুরে দেখতে পারেন। তালিকাটি নিম্নরূপ
তালিকাটি প্রথম প্রকাশিত হয় আমার ইংরেজি ব্লগে। লিংক: Bangladesh 1971
এছাড়া অনেকে ব্লগে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে লিখে থাকেন। তাদের লেখার লিংক জানালে আর একটা তালিকা তৈরি করা যেতে পারে। যার শিরোনাম হবে "বাংলা ব্লগে মুক্তিযুদ্ধ"
আপনি যদি আপনার ব্লগে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে অন্তত: একটি পোস্ট দিয়ে থাকেন, তাহলে ওই পোস্টটির লিংক মন্তব্য আকারে জানান।

৫ নভেম্বর, ২০০৮

সেক্টর কমান্ডার্স ফোরাম প্রকাশিত ৫০ যুদ্ধাপরাধীর তালিকা

১. গোলাম আজম
২. মওলানা এ কে এম ইউসুফ
৩. মতিউর রহমান নিজামী
৪. দেলোয়ার হোসাইন সাঈদী
৫. মো: কামরুজ্জামান
৬. মওলানা আব্দুর রহিম
৭. আব্বাস আলী খান
৮. আলী আহসান মোহাম্মদ মোজাহিদ
৯. আব্দুল কাদের মোল্লা
১০. মোহাম্মদ হামিদুল হক চৌধুরী
১১. খাজা খায়রুদ্দিন
১২. মোহাম্মদ আলী
১৩. মোহাম্মদ আব্দুল আলীম
১৪. এএমএস সোলায়মান
১৫. সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী
১৬. ফজলুল কাদের চৌধুরী
১৭. জুলমত আলী খান
১৮. কাজী কাদের
১৯. খান আব্দুস সবুর খান
২০. মওলানা ফরিদ আহমেদ
২১. শাহ্ মোহাম্মদ আজিজুর রহমান
২২. মাওলানা আব্দুল মান্নান
২৩. ডা: আবু মোতালেব মালেক
২৪. মোহাম্মদ ইউনুস
২৫. এবিএম খালেক মজুমদার
২৬. এএন এম ইউসুফ
২৭. নুরুল আমিন
২৮. এ কিউ এম শফিউল ইসলাম
২৯. আবদুল মতিন
৩০. এড. মোহাম্মদ আইনুদ্দিন
৩১. মাওলানা নুরুজ্জামান (আইআরপি)
৩২. মাওলানা মোহাম্মদ ইসহাক
৩৩. গোলাম সরোয়ার
৩৪. মোহাম্মদ আকতার উদ্দিন আহমেদ
৩৫. মাওলানা আবদুস সোবাহান
৩৬. ক্যাপ্টেন (অব: ) আব্দুল বাছেদ
৩৭. আবদুল মতিন ভূঁইয়া
৩৮. মোহাম্মদ আবুল কাশেম
৩৯. ওবায়দুল্লাহ মজুমদার
৪০. মীর কাশেম আলী
৪১. ইঞ্জিনিয়ার আব্দুল জব্বার
৪২. মাওলানা আবুল কালাম আজাদ
৪৩. মোহাম্মদ আবদুল হান্নান
৪৪. ব্যারিস্টার কোরবান আলী
৪৫. আশরাফ হোসাইন
৪৬. এড. আনসার আলী
৪৭. মোহাম্মদ কায়সার
৪৮. আবদুল মজিদ তালুকদা
৪৯. নওয়াজেস আহমেদ
৫০. একে মোশাররফ হোসেন।

২৮ অক্টোবর, ২০০৮

মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে প্রচারণা

শাহরিয়ার কবীর ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আমেরিকায় প্রচারণা কার্য চালাচ্ছেন। তার ভিডিও:

১০ সেপ্টেম্বর, ২০০৮

স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র

স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক ১৯৭১ সালের এপ্রিল ১৭ তারিখে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষিত একটি ঘোষণাপত্র। যতদিন বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ চলেছে ততদিন মুজিবনগর সরকার পরিচালনার অন্তর্বর্তীকালীন সংবিধান হিসেবে এই ঘোষণাপত্র কার্যকর ছিল। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম হওয়ার পরও এই ঘোষণাপত্র সংবিধান হিসেবে কার্যকর ছিল। ১৯৭২ সালের ডিসেম্বর ১৬ তারিখে যখন দেশের নতুন সংবিধান প্রণীত হয় তখন সংবিধান হিসেবে এর কার্যকারিতার সমাপ্তি ঘটে।

ইতিহাস


১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তান সামরিক বাহিনী ঢাকা এবং তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের অন্যান্য অংশে আক্রমণ চালিয়ে ব্যাপক গণহত্যা চালায়। এই গণগত্যার প্রাক্কালে তৎকালীন আওয়মী লীগ নেতৃবৃন্দ, গণপরিষদ ও প্রাদেশিক পরিষদের সদস্যগণ নিরাপত্তার জন্য সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতে গিয়ে আশ্রয় নেন। ৩০ মার্চের মধ্যেই তাদের অনেকে কলকাতায় সমবেত হন। প্রাদেশিক পরিষদের যেসকল সদস্য ১০ এপ্রিলের মধ্যে কলকাতায় মিলিত হতে সমর্থ হন তারা তারা ঐদিনই একটি প্রবাসী আইন পরিষদ গঠন করে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের খসড়া প্রণয়ন করেন। এপ্রিল ১৭ তারিখে মেহেরপুর জেলার সীমান্তবর্তী স্থান বৈদ্যনাথতলায় (পরবর্তী নাম মুজিবনগর) এক অনাড়ম্বর অনুষ্ঠানে গণপরিষদের সদস্য এম ইউসুফ আলী আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পাঠ করেন। এই ঘোষণার মাধ্যমে নবগঠিত প্রবাসী আইন পরিষদ বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব ঘোষণা করে। এদিনই ২৬ মার্চের স্বাধীনতার ঘোষণাকে আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদন দেয়া হয় এবং একই সাথে ২৬ মার্চ থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা কার্যকর হয়েছে বলে ঘোষণা করা হয়। এর ফলে প্রবাসী মুজিবনগর সরকারও বৈধ বলে স্বীকৃত হয়। এ ঘোষণায় মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সকলের মধ্যে চেইন অফ কমান্ড স্থাপনের নির্দেশ দেয়া হয়।

ঘোষণাপত্রের পূর্ণ বিবরণ

মুজিবনগর, বাংলাদেশ

তারিখ: ১০ এপ্রিল ১৯৭১

যেহেতু ১৯৭০ সালের ৭ ডিসেম্বর থেকে ১৯৭১ সালের ১৭ জানুয়ারি পর্যন্ত বাংলাদেশে অবাধ নির্বাচনের মাধ্যমে শাসনতন্ত্র রচনার উদ্দেশ্যে প্রতিনিধি নির্বাচিত করা হয়েছিল; এবং
যেহেতু এই নির্বাচনে বাংলাদেশের জনগণ ১৬৯টি আসনের মধ্যে আওয়ামী লীগ দলীয় ১৬৭ জন প্রতিনিধি নির্বাচিত করেছিল;
এবং
যেহেতু জেনারেল ইয়াহিয়া খান ১৯৭১ সনের ৩রা মার্চ তারিখে শাসনতন্ত্র রচনার উদ্দেশ্যে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের অধিবেশন আহ্বান করেন; এবং
যেহেতু তিনি আহূত এই অধিবেশন স্বেচ্ছার এবং বেআইনীভাবে অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করেন; এবং
যেহেতু পাকিস্তান কর্তৃপক্ষ তাদের প্রতিশ্রুতি পালন করার পরিবর্তে বাংলাদেশের জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে পারষ্পরিক আলোচনাকালে ন্যায়নীতি বহির্ভূত এবং বিশ্বাসঘাতকতামূলক যুদ্ধ ঘোষণা করেন; এবং
যেহেতু উল্লিখিত বিশ্বাসঘাতকতামূলক কাজের জন্য উদ্ভূত পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষের অবিসংবাদিত নেতা শেখ মুজিবুর রহমান জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার অর্জনের আইনানুগ অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য ১৯৭১ সালের ২৬শে মার্চ ঢাকায় যথাযথভাবে স্বাধীনতা ঘোষণা করেন, এবং বাংলাদেশের অখণ্ডতা ও মর্যাদা রক্ষার জন্য বাংলাদেশের জনগণের প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানান; এবং
যেহেতু পাকিস্তান কর্তৃপক্ষ বর্বর ও নৃশংস যুদ্ধ পরিচালনা করেছে এবং এখনও বাংলাদেশের বেসামরিক ও নিরস্ত্র জনগণের বিরুদ্ধে নজিরবিহীন গণহত্যা ও নির্যাতন চালাচ্ছে; এবং
যেহেতু পাকিস্তান সরকার অন্যায় যুদ্ধ ও গণহত্য এবং নানাবিধ নৃশংস অত্যাচার পরিচালনার দ্বারা বাংলাদেশের গণপ্রতিনিধিদের পক্ষে একত্রিত হয়ে শাসনতন্ত্র প্রণয়ন করে জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠা করা অসম্ভব কে তুলেছে; এবং
যেহেতু বাংলাদেশের জনগণ তাদের বীরত্ব, সাহসিকতা ও বিপ্লবী কার্যক্রমের মাধ্যমে বাংলাদেশের উপর তাদের কার্যকরি কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছে;

সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী বাংলাদেশের জনগণ নির্বাচিত প্রতিনিধিদের প্রতি যে ম্যান্ডেট দিয়েছেন সে ম্যান্ডেট মোতাবেক আমরা, নির্বাচিত প্রতিনিধিরা, আমাদের সমবায়ে গণপরিষদ গঠন করে পারষ্পরিক আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে বাংলাদেশের জনগণের জন্য সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করার উদ্দেশ্যে

বাংলাদেশকে একটি সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্র ঘোষণা করছি এবং এর দ্বারা পূর্বাহ্নে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বাধীনতা ঘোষণা অনুমোদন করছি; এবং

এতদ্বারা আমরা আরও সিদ্ধান্ত ঘোষণা করছি যে শাসনতন্ত্র প্রণীত না হওয়া পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রপ্রধান এবং সৈয়দ নজরুল ইসলাম উপ-রাষ্ট্রপ্রধান পদে অধিষ্ঠিত থাকবেন; এবং

রাষ্ট্রপ্রধান প্রজাতন্ত্রের সশস্ত্র বাহিনীসমূহের সর্বাধিনায়ক পদে অধিষ্ঠিত থাকবেন; ক্ষমা প্রদর্শনের ক্ষমতাসহ সর্বপ্রকার প্রশাসনিক ও আইন প্রণয়নের ক্ষমতার অধিকারী থাকবেন; এবং

তাঁর কর ধার্য ও অর্থব্যয়ের ক্ষমতা থাকবে; এবং

বাংলাদেশের জনসাধারণের জন্য আইনানুগ ও নিয়মতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠার জন্য অন্যান্য প্রয়োজনীয় সকল ক্ষমতারও তিনি অধিকারী হবেন।

বাংলাদেশের জনগণ দ্বারা নির্বাচিত প্রতিনিধি হিসাবে আমরা আরও সিদ্ধান্ত ঘোষণা করছি যে, কোন কারণে যদি রাষ্ট্রপ্রধান না থাকেন অথবা যদি রাষ্ট্রপ্রধান কাজে যোগদান করতে না পারেন অথবা তাঁর দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনে যদি অক্ষম হন, তবে রাষ্ট্রপ্রধান প্রদত্ত সকল দায়িত্ব উপ-রাষ্ট্রপ্রধান পালন করবেন। আমরা আরও সিদ্ধান্ত ঘোষণা করছি যে, বিশ্বের একটি জাতি হিসাবে এবং জাতিসংঘের সনদ মোতাবেক আমাদের উপর যে দায়িত্ব ও কর্তব্য বর্তেছে তা যথাযথভাবে আমরা পালন করব। আমরা আরও সিদ্ধান্ত ঘোষণা করছি যে, আমাদের এই স্বাধীনতার ঘোষণা ১৯৭১ সনের ২৬শে মার্চ থেকে কার্যকর বলে গণ্য হবে। আমরা আরও সিদ্ধান্ত ঘোষণা করছি যে, আমাদের এই সিদ্ধান্ত কার্যকর করার জন্য আমরা অধ্যাপক এম. ইউসুফ আলীকে যথাযথভাবে রাষ্ট্রপ্রধান ও উপ-রাষ্ট্রপ্রধানের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান পরিচালনার জন্য দায়িত্ব অর্পণ ও নিযুক্ত করলাম।

স্বাক্ষর: অধ্যাপক এম. ইউসুফ আলী

বাংলাদেশ গণপরিষদের ক্ষমতা দ্বারা

এবং ক্ষমতাবলে যথাবিধি সর্বাধিক ক্ষমতাধিকারী।

আইনের ধারাবাহিকতা বলবৎকরণ আদেশ ১৯৭১

বাংলাদেশের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে প্রদত্ব ক্ষমতাবলে একটি দিনে আইনের ধারাবাহিকতা বলবৎকরণ আদেশ নামে একটি আদেশ জারি করেন। ঘোষণাপত্রের সাথে সামঞ্জস্য রেখে ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পর্যন্ত বাংলাদেশে যে সকল আইন চালু ছিল, তা রক্ষার্থে এই আদেশ বলবৎ করা হয়।

পূর্ণ বিবরণ

আইনের ধারাবাহিকতা বলবৎকরণ আদেশ ১৯৭১

মুজিবনগর, বাংলাদেশ, ১০ এপ্রিল ১৯৭১, শনিবার ১২ চৈত্র ১৩৭৭

আমি বাংলাদেশের উপ-রাষ্ট্রপতি এবং অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, স্বাধীনতা ঘোষণাপত্র প্রদত্ত ক্ষমতাবলে ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল তারিখে এ আদেশ জারি করছি যে, ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পর্যন্ত বাংলাদেশে যে সকল আইন চালু ছিল, তা ঘোষণাপত্রের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে একইভাবে চালু থাকবে, তবে প্রয়োজনীয় সংশোধনী সার্বভৌম স্বাধীন বাংলাদেশ গঠনের জন্য করা যাবে। এই রাষ্ট্র গঠন বাংলাদেশের জনসাধারণের ইচ্ছায় হয়েছে। এক্ষণে, সকল সরকারি, সামরিক, বেসামরিক, বিচার বিভাগীয় এবং কূটনৈতিক কর্মকর্তা ও কর্মচারী যারা বাংলাদেশের প্রতি আনুগত্যের শপথ গ্রহণ করেছেন, তারা এতদিন পর্যন্ত নিয়োগবিধির আওতায় যে শর্তে কাজে বহাল ছিলেন, সেই একই শর্তে তারা চাকুরিতে বহাল থাকবেন। বাংলাদেশের সীমানায় অবস্থিত সকল জেলা জজ এবং জেলা ম্যাজিস্ট্রেট এবং সকল কূটনৈতিক প্রতিনিধি যারা অন্যত্র অবস্থান করছেন, তারা সকল সরকারি কর্মচারীকে স্ব স্ব এলাকায় আনুগত্যের শপথ গ্রহণের ব্যবস্থা করবেন।

এই আদেশ ১৯৭১ সালের ২৬শে মার্চ থেকে কার্যকর করা হয়েছে বলে গণ্য করতে হবে।

স্বাক্ষর:- সৈয়দ নজরুল ইসলাম

অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি

তথ্যসূত্র

* বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ: দলিলপত্র, তৃতীয় খণ্ড, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তথ্য মন্ত্রণালয়, ঢাকা, ১৯৮২, পৃষ্ঠা ৪-৭

* বাংলাপিডিয়া নিবন্ধ: স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র। লেখক: সাজাহান মিয়া।

বাংলা উইকিপিডিয়া

২ সেপ্টেম্বর, ২০০৮

স্বাধীনতা- মার্চের দিনগুলি ও ৭ মার্চের বিতর্ক

নির্মল সেন

১ মার্চ ১৯৭১ সাল। প্রেস ক্লাবে বসেছিলাম। হঠাৎ শুনলাম একটি কণ্ঠ। সেই কণ্ঠের অধিকারী প্রেস ক্লাবে ঢুকেই বলল, ‘সর্বনাশ হো গিয়া।’ আমি তার দিকে তাকালাম। সে লোকটি আর কেউ না, পাকিস্তান ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি আসরার আহমদ। তখন সারা পাকিস্তানে এই ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নই একমাত্র অবিভক্ত ছিল। আমি আসরারের দিকে তাকালাম, বললাম ‘কেয়া হুয়া?’ আসরার সবেমাত্র পিআইএ বিমানে রাওয়ালপিন্ডি থেকে ঢাকায় পৌঁছেছে। সে বলল, পাকিস্তানে প্রেসিডেন্ট আগা মোহাম্মদ ইয়াহিয়া জাতীয় সংসদের অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করেছে। এর ফল যে ভালো হবে না তা সবাই জানে। ৭ ডিসেম্বর নির্বাচন হয়েছে, শেখ মুজিবুর রহমান সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা নির্বাচিত হয়েছেন। তারই প্রধানমন্ত্রী হওয়ার কথা। কিন্তু প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া নানা টালবাহানা করে শেখ সাহেবকে মন্ত্রিসভা করতে ডাকছেন না। কারণ পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর অন্য একটি ধারণা এবং পরিকল্পনা ছিল। সেনাবাহিনী ভেবেছিল, শেখ সাহেব নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে না। বাকি দলগুলো সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে। তাই তাদের কাছে নির্বিঘ্নে ক্ষমতা হস্তান্তর করবে। কিন্তু জনতার রায় ছিল ভিন্ন। তারা শেখ সাহেবকে সংখ্যাগরিষ্ঠতা দিল। কিন্তু সামরিক বাহিনী শেখ সাহেবকে ক্ষমতা দিতে রাজি নয়। তাই নানা টালবাহানা শুরু করেছিল। সর্বশেষ ইয়াহিয়া বলেছিল, ৩ মার্চ জাতীয় সংসদের অধিবেশন বসবে। কিন্তু সেই অধিবেশন না বসার খবর নিয়েই বিভ্রান্ত হয়ে আসরার ঢাকায় এসেছিল।
এছাড়া আসরারের ঢাকা আসার অন্যতম কারণ ছিল, এ পরিস্থিতিতে কি করা যায়, তা পরামর্শ করতে হবে। তার সাধারণ সম্পাদক মিনহাজ বার্না পাকিস্তান টাইমসের প্রতিনিধি। তিনি ঢাকায় থাকেন। তার সঙ্গে আলাপ করতে হবে। আর ইউনিয়নের প্রধান নেতা হলো খন্দকার গোলাম মোস্তফা, যিনি সমধিক কেজি মোস্তফা নামে পরিচিত। তার সঙ্গে পরামর্শ না করে ইউনিয়ন চলতে পারে না। এই দুই কারণে আসরার ঢাকায় এসেছিল। কেজি মোস্তফা যে সারা পাকিস্তানের সাংবাদিকদের মধ্যে এত জনপ্রিয় তা বোঝাতে হলে একটি ঘটনার কথা বলি।

পাকিস্তানের শেষ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের সম্মেলন বসেছে ইসলামাবাদে। তখন ইউনিয়নে আলোচনা চলছিল, প্রুফ রিডার ও কাতিবদের ইউনিয়নে সদস্য পদ দেওয়া হবে কি-না। পূর্ব পাকিস্তানে প্রুফ রিডাররা আগেই ইউনিয়নের সদস্য ছিল। কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তানে কাতিবরা ছিল না। রাওয়ালপিন্ডি সম্মেলনে আমি একটি প্রস্তাব তুললাম, এবারে কাতিবদের ইউনিয়নের সদস্যপদ দেওয়া হোক। পশ্চিম পাকিস্তানের সদস্যরা একযোগে চিৎকার করে উঠল, না হবে না। আমি বললাম আপনারা কি জানেন আমার প্রস্তাবের সমর্থক কেজি মোস্তফা। এ কথা শুনে সবাই চুপ করে গেল। সবাই পরে বলল তোমার প্রস্তাব এক বছরের জন্য স্থগিত থাক। শুধু কেজি মোস্তফা নামের গুণে এটা সম্ভব হয়েছিল। এ ধরনের ছিল সারা পাকিস্তানের সাংবাদিকদের মধ্যে কেজি মোস্তফার জনপ্রিয়তা। আজকে কেজি মোস্তফা ঢাকায় থাকেন। মাঝেমধ্যে বিভিন্ন পত্রিকায় লেখালেখি করেন। তবে ইয়াহিয়ার ঘোষণায় যে প্রতিক্রিয়া হলো তা আমরা অচিরেই টের পেলাম। সেদিন দুপুরে হোটেল পূর্বাণীতে আওয়ামী লীগের সংবাদ সম্মেলন ছিল। সে সম্মেলন ছাত্র এবং জনতা, অফিস কর্মচারীসহ সবাই ঘেরাও করল। তাদের দাবি এখনি বাংলাদেশ স্বাধীন করতে হবে। সমস্ত বাংলাদেশে আকাশ-বাতাস মথিত হলো একটি শ্লোগানে। সেই শ্লোগানটি হলো বাংলাদেশের স্বাধীনতা চাই; স্বাধীন বাংলা চাই। অবাঙালিদের সঙ্গে আমরা থাকব না। সেদিন বুঝিয়ে-সুঝিয়ে জনতাকে শেখ সাহেব নিবৃত্ত করলেন। বলা হলো, রেসকোর্সে ৭ মার্চ শেখ সাহেব ভাষণ দেবেন। আমরা সেই ৭ মার্চের ভাষণের জন্য গভীর প্রতীক্ষায় ছিলাম। এর মধ্যে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ স্বাধীনতা ঘোষণা পাঠ করেছে। স্বাধীনতার পতাকা উত্তোলন করেছে। শেষ পর্যন্ত ৭ মার্চ এলো। তারপর ৭ মার্চ রেসকোর্স লোকে লোকারণ্য। দক্ষিণ রমনা কালীবাড়ি, উত্তরে ঢাকা ক্লাব, মানুষ যেন উপচে পড়ছে। চারদিক মানুষ যেন আসছে আর আসছে। সবার হাতে লাঠি। এ যেন রেসকোর্সে যুদ্ধ করে বাংলাদেশ স্বাধীন করবে। সবার কণ্ঠে স্বাধীনতা চাই। আজকে এ মুহূর্তে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা চাই, মঞ্চে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতারা। তাদের কণ্ঠে আমাদের নেতা পাকিস্তানের পার্লামেন্টে যাবেন না। শেখ মুজিব পাঞ্জাবিদের পার্লামেন্টে যাবেন না। পাঞ্জাবিদের পার্লামেন্ট মানি না মানি না, সবাই হাতে অস্ত্র ধর বাংলাদেশ স্বাধীন কর।
শেখ সাহেব জনসভায় আসার আগেই জনসভা মুখরিত হয়ে উঠল। এক দফা এক দাবি, বাংলাদেশের স্বাধীনতা। আমাদের নেতা পাঞ্জাবিদের পার্লামেন্টে যাবেন না।

এর মধ্যে শেখ সাহেব জনসভায় এসে পৌঁছলেন। তখন লাখ জনতার কণ্ঠে বাংলাদেশের স্বাধীনতার দাবি, তারা বারবার বলছে, পাঞ্জাবিদের পার্লামেন্টে আমাদের নেতা যাবেন না। এরপর বজ্রনির্ঘোষের মতো গগনবিদারী কণ্ঠে তার ভাষণ শুরু করলেন। এমন সুলিখিত ভাষণ কোনোদিন শুনিনি। কি ভাষণ? আর শেখ সাহেবের কি গগনবিদারী কণ্ঠ? গোটা জনসভায় এক উন্মাদনা সৃষ্টি করল। শেখ সাহেবের ভাষণের মাঝে মাঝে পেছনের দিকে তাকাচ্ছিলেন। পেছনে ছিল ছাত্রলীগ নেতারা। তিনি এবারের সংগ্রাম, মুক্তি সংগ্রাম বলে একটু থামলেন এবং পেছনে ছাত্রলীগ নেতা সিরাজুল আলম খানের কাছে কি যেন জিজ্ঞাসা করলেন। তারপর তিনি বললেন, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। জয় বাংলা, জয় পাকিস্তান। শেখ সাহেবের মঞ্চে সামনের সারিতে চেয়ারে আমি ও আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী বসে ছিলাম, যেন মন্ত্রমুগ্ধের মতো। শেখ সাহেবের ভাষণের প্রতিটি অক্ষর গোগ্রাসে গিলছিলাম। এরপর সভা ভাঙল। জনতার একটি অংশের মনে যেন কিছু না পাওয়ার ক্ষোভ থেকে গেল। তারা সবাই ওইদিনই চেয়েছিল শেখ সাহেব স্বাধীনতা ঘোষণা করুক। কিন্তু তা শেখ সাহেবের পক্ষে আদৌ সম্ভব ছিল না। তিনি অনুভব করেছিলেন, সংগ্রামের সময় উপস্থিত না-ও থাকতে পারেন। এই দুরদৃষ্টির ফলে তিনি বলেছিলেন আমি যদি নির্দেশ দিতে না পারি তাহলে তোমাদের কাছে নির্দেশ রইল যার যা আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করবে। এরচেয়ে স্বাধীনতা সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ার আর কি নির্দেশ থাকতে পারে? আজকে যারা বলেন, শেখ সাহেব সেদিন স্বাধীনতার ঘোষণা দেননি, তারা কি বলতে পারেন এর চেয়ে স্বাধীনতার ঘোষণা বেশি কী হতে পারে? আজকেও একদল লোক বলেন, জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন। সেই স্বাধীনতার ঘোষক সম্পর্কে আমি বলতে চাই, স্বাধীনতার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে নির্মাণ করেছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি সব তৈরি করে গিয়েছিলেন এবং সে ক্ষেত্রে জিয়াউর রহমান নিশ্চয়ই সাহস দেখিয়েছেন। কিন্তু সে সাহস হলো একজন বেতার ঘোষকের সাহস। তার আগে এবং পেছনে সবকিছু প্রস্ট‘ত করে রেখেছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান। তবে একথা সত্য, শেখ সাহেব ৭ মার্চের বক্তব্যের শেষদিকে বলেছিলেন, ‘জয় বাংলা, জয় পাকিস্তান’।

আমি জানি, আমার এ বক্তব্য নিয়ে বিতর্ক আছে, কানাডা থেকে একদল ছেলে লিখে জানিয়েছেন, আপনি মিথ্যা লিখেছেন। কানাডা কেন? ঢাকারও অধিকাংশ লোকের বিশ্বাস আমি মিথ্যা বলেছি। তবে আমার দৃঢ় বিশ্বাস, আমার স্মৃতি আমাকে বিভ্রান্ত করেনি। এবং আমার মতে, সেদিন জয় পাকিস্তান বলে শেখ সাহেব সঠিক কাজ করেছিলেন। একজন বিজ্ঞ রাজনীতিবিদ হিসেবে পরিচয় দিয়েছিলেন। ৭ মার্চের ভাষণ সম্পর্কে আমি একটি ভিন্ন কথা শুনেছি। বিশেষ করে বামপন্থী মহল এটা বলেছে। তারা সমালোচনা করেছে, শেখ সাহেব স্বাধীনতা ঘোষণা দিলেন না কেন? আবার একই মুখে বলেছেন শেখ সাহেব বুর্জোয়া নেতা। তিনি কিছুতেই স্বাধীনতা ঘোষণা দিতে পারেন না। আমার মত হচ্ছে, জয় পাকিস্তান না বলে কোনো উপায় ছিল না। তখনো আলোচনা শেষ হয়নি। ক’দিন পর ইয়াহিয়াদের সঙ্গে আলোচনা করার কথা। একটি লোকও স্বাধীনতা সংগ্রামের জন্য প্রস্তুত নয়। সেদিন যদি জয় পাকিস্তান না বলে শুধু ‘জয় বাংলা’ বলতেন এবং স্বাধীনতার ঘোষণা দিতেন তাহলে ইয়াহিয়া বাহিনী মারমুখী আক্রমণ করত। লাখ লাখ লোক প্রাণ হারাতো। তখন এই মহলটিই বলত জনতাকে কোনো প্রস্তুত না করে এ ধরনের স্বাধীনতা ঘোষণা বালখিল্যতা। এ জন্যই অসংখ্য লোকের প্রাণহানি হয়েছে এবং এর জন্যই শেখ মুজিবের বিচার হওয়া উচিত।

এছাড়া জয় পাকিস্তান বলা সম্পর্কে আমার সঙ্গে শেখ সাহেবের আলাপ হয়েছিল। আমি বললাম, আপনি জয় পাকিস্তান বললেন কেন? শেখ সাহেবের মুখ কালো হয়ে গেল। এরপর তিনি বললেন, ‘আমরা খাবার টেবিলে ছেলেমেয়ে সবাই খেতে বসতাম। প্রথমে আমরা এক হাতের পাঁচটি আঙ্গুল অপর হাতের একটি আঙ্গুল অর্থাৎ ছয়টি আঙ্গুল দেখাতাম। অর্থাৎ এই ছয়টি আঙ্গুল ছিল ছয় দফা। পরে পাঁচটি আঙ্গুল নামিয়ে ফেলতাম। বাকি থাকত একটি আঙ্গুল। অর্থাৎ এক দফা। অর্থ হচ্ছে ছয় দফার শেষ কথা হচ্ছে এক দফা বাংলাদেশের স্বাধীনতা। সেদিন পাঁচ আঙ্গুল নামিয়ে ফেলার পর আমার কনিষ্ঠপুত্র রাসেল জিজ্ঞাসা করেছিল। তুমি আজকের জনসভায় জয় পাকিস্তান বলতে গেলে কেন?

আমি কি রাসেলের প্রশ্নের জবাব আপনাকে দেব? আমাকে স্বাধীনতার ঘোষণা দিতে হলে অনেক পথ অতিত্রক্রম করতে হবে। ইয়াহিয়ার সামরিক সরকারকে শেষ কথা বলতে হবে। পশ্চিম পাকিস্তানের নেতাদের সঙ্গে কথা বলতে হবে। সবচেয়ে ভয়াবহ হচ্ছে ভুট্টো। তার সঙ্গেও কথা বলতে হবে। আমি এই আলোচনা শেষ না করে কিছু করলে পৃথিবীতে আমি জবাবদিহি করতে পারব না। আমি এখন ভালো অবস্থানে আছি। সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা হয়েও আমাকে ক্ষমতা দেওয়া হচ্ছে না। এই প্রেক্ষিতে আমি কিছুটা ধমমৎবংংরাব হতে পারি মাত্র, এর বেশি কিছু নয়। আমাকে আমাদের সেনাবাহিনী ও সরকারের কর্মচারীদের সঙ্গে আলাপ করতে হবে। সেই আলাপ এখনো শেষ হয়নি। সবদিকে এত অপ্রস্তুত রেখে একটি দেশকে আমি সংগ্রামের মুখে ঠেলে দিতে পারি না। আপনি কি বোঝেন না ওইদিন চারদিকে শত্রু বেষ্টিত অবস্থায় আমার অন্য কিছু বলার ছিল না। এই হচ্ছে ৭ মার্চ শেখ সাহেবের বক্তব্য সম্পর্কে আমার ব্যাখ্যা। আমার এই বক্তব্যের বিরুদ্ধে এখনো অনেক মন্তব্য শুনি। কিন্তু তাদের কি স্মরণ নেই, ২৫ মার্চ কি অগোছালো অবস্থায় স্বাধীনতা সংগ্রাম শুরু হয়েছিল? এটা যদি ৭ মার্চ হতো তাহলে আরো লাখ লাখ প্রাণ আমাদের হারাতে হতো। একথা কি সত্য নয়? যারা সেদিন শেখ সাহেবের সমালোচনা করেছিলেন, তারা বুকে হাত দিয়ে বলুন, শেখ সাহেব কি ভুল করেছিলেন? ওই ভুলটুকু না করলে আপনারা কোথায় পালিয়ে যাবেন সে সন্ধানও করার সময় পেতেন না। শেখ সাহেব যে জয় পাকিস্তান বলেছিলেন তার অন্যতম সাক্ষী আমার অনুজপ্রতিম সাংবাদিক লন্ডন প্রবাসী আবদুল গাফফার চৌধুরী। আমি জানি না, সে কথা আজ তার মনে আছে কিনা। তবে তিনি আমার সঙ্গে জনসভায় প্রথম সারিতে বসে ছিলেন।

লেখক : সাংবাদিক ও রাজনীতিক
----------
সমকাল, ২৪ মার্চ ২০০৮

২৪ আগস্ট, ২০০৮

ভারতীয় জুজুর কাল্পনিক ধুয়া

’৭৫ এর ট্র্যাজেডি ॥ মার্কিন দলিলে -৪
অজয় দাশগুপ্ত

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট নারকীয় হত্যাকাণ্ডে বাংলাদেশে রাজনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের পর থেকেই রাষ্ট্রপতি খন্দকার মোশতাক আহমদ এবং তার সহচররা বাংলাদেশে ভারতীয় হস্তক্ষেপের সম্ভাবনার কথা বলতে থাকে। বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার মধ্য দিয়ে ক্ষমতাসীন কর্তৃপক্ষ যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য দেশের প্রতি নতুন সরকারকে দ্রুত স্বীকৃতি প্রদানের অনুরোধ জানায় এ যুক্তিতে যে, এর ফলে ভারত বাংলাদেশে সামরিক অভিযান চালানো থেকে বিরত হবে। পাকিস্তান ১৫ আগস্টেই খন্দকার মোশতাক আহমদের সরকারকে স্বীকৃতি জানানোর পেছনেও একই অজুহাত দেখায়। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দফতর এবং ভারতে অবস্থিত তার দূতাবাসও বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে সৈন্য চলাচলের ওপর সতর্ক নজর রাখে।

প্রকৃত পরিস্থিতি কী ছিল সেটা কি তারা জানত না, এ প্রশ্ন উঠতেই পারে।
১৯৭৫ সালের ২৬ আগস্ট বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতীয় দূতাবাসের প্রথম সচিব রণেন সেন ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাসের কর্মকর্তাদের সঙ্গে দেখা করেন।

ঢাকাস্থ যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত ২৭ আগস্ট ওয়াশিংটনে পররাষ্ট্র দফতরে যে বার্তা পাঠিয়েছেন তাতে বলা হয় : রণেন সেন জানান, ‘বাংলাদেশে ভারতের একমাত্র স্বার্থ হচ্ছে স্থিতিশীলতা বজায় রাখা। এখানে কী ধরনের সরকার ক্ষমতায় কিংবা কী অর্থনৈতিক নীতি অনুসরণ করা হচ্ছে তা নিয়ে ভারতের মাথাব্যথা নেই। তবে যদি হিন্দুরা মনে করে যে তাদের ওপর হুমকি সৃষ্টি হয়েছে এবং ভারতে আশ্রয়লাভের চেষ্টা চালায়, সেটা ভারতের জন্য গভীর উদ্বেগের কারণ হবে।’
বোস্টার তার প্রতিবেদনে বলেন, ‘অভ্যুত্থান ঢাকাস্থ ভারতীয় হাইকমিশনকে সম্পূর্ণ বিঘ্নিত করে। অভ্যুত্থানের সকালে ভারতীয় হাইকমিশন অফিস এবং এর স্টাফদের বাসস্থানগুলোর সব টেলিফোন সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়। ঢাকায় ভারতীয় অভিমত হচ্ছে, অভ্যুত্থান যে নিঁখুতভাবে সংঘটিত হয়েছে তাতে স্পষ্ট যে কিছু বৈদেশিক শক্তির অবশ্যই সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। এ ঘটনায় কোন বিদেশি শক্তি জড়িত সে বিষয়ে রণেন সেন কারো নাম বলেননি।’

এ সাক্ষাৎকার প্রসঙ্গে বোস্টারের মন্তব্য : ঢাকায় ভারতীয়রা ভারতের প্রতি বাঙালিদের মনোভাবের গভীরতা উপলব্ধি করে এবং ভারতের অভিপ্রায় নিয়ে অব্যাহত জল্পনা-কল্পনা রয়েছে সেটাও তারা জানে। আমরা মনে করি, ‘বাঙালিরা যে ভীতির (ভারতের তরফে) মধ্যে রয়েছে বলে অব্যাহতভাবে আমাদের কাছে জানাচ্ছে সেটা দূর করার জন্যই রণেন সেন আমাদের কাছে এসব কথা বলেছেন। সম্ভবত তারা এটাও চেয়েছে যে, আমরা তা বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষকে জানিয়ে দেই।’

বঙ্গবন্ধু সরকারের বিরুদ্ধে যে চক্রান্ত হচ্ছে সেটা নিশ্চিতভাবেই ভারত জানত। যেমন জানত যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃপক্ষ। ১৭ আগস্ট যুক্তরাষ্ট্র পররাষ্ট্র দফতর তাদের বিভিন্ন দূতাবাসের জন্য যে সারসংক্ষেপ প্রেরণ করে তাতে ‘বাংলাদেশে অভ্যুত্থানের বিষয়ে ভারতের প্রতিক্রিয়া’ অংশে বলা হয় : ১৬ আগস্ট নয়াদিল্লিতে ভারতের একজন কর্মকর্তা নয়াদিল্লিস্থ মার্কিন দূতাবাসকে জানায়, ভারত সরকার কয়েক মাস আগেই একদল হতাশ ও ক্ষুব্ধ রাজনীতিক এবং খন্দকার মোশতাক আহমদ ও মুজিব কর্তৃক সম্প্রতি পদচ্যুত একজন ক্যাপ্টেনের নেতৃত্বে সামরিক অফিসারদের অভ্যুত্থান পরিকল্কপ্পনা জানতে পেরেছিল। এ সময়ে ওই কর্মকর্তা আরো জানান, তারা নতুন সরকারের পররাষ্ট্রনীতি বিশেষ করে পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে খন্দকার মোশতাক আহমদের সুপরিচিত অবস্থানের বিষয় নিয়ে উদ্বিগ্ন। ভারতে যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাস সংবাদপত্র সূত্রে জেনেছে, ইন্দিরা গান্ধীর সরকার ঢাকায় অভ্যুত্থানের বিষয়ে সম্পাদকীয় মন্তব্য লেখায় সেন্সরশিপ আরোপ করেছে। (ভারতে ওই সময়ে জরুরি আইন বলবৎ ছিল)।

১৮ আগস্ট নয়াদিল্লিস্থ যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাস জানায় : ‘কলকাতায় বাংলাদেশ সীমান্তের কাছে বসবাসকারী সূত্রের উল্লেখ করে জানায়, সীমান্ত এলাকায় ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) এবং সম্ভবত নিয়মিত সেনাবাহিনীর শক্তি বৃদ্ধি করা হয়েছে। এর উদ্দেশ্য সম্ভবত বাংলাদেশে অভ্যুত্থানের পর হিন্দু শরণার্থীদের আগমন বন্ধ করা। কলকাতায় অনেক গুজব শোনা যাচ্ছে। কিন্তু প্রাপ্ত তথ্য থেকে এ উপসংহারে পৌঁছানো যায় যে, সামরিক বাহিনীর চলাচল যে মাত্রাতেই ঘটে থাকুক না কেন তার উদ্দেশ্য পশ্চিমবাংলায় শরণার্থী প্রবেশ ঠেকানো এবং কোনোভাবেই বাংলাদেশে ভারতীয় সামরিক হস্তক্ষেপের প্রস্তুতি নয়।’

নয়াদিল্লিস্থ দূতাবাস আরো জানায় : ১৫ আগস্টেই পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী (সিদ্ধার্থ শংকর রায়) শরণার্থী অনুপ্রবেশ ঠেকাতে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। তিনি বাংলাদেশে হিন্দু-মুসলিম সংঘাত বিষয়ে কিছু প্রকাশ না করার জন্য অনুরোধ করেন।

যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাস ওয়াশিংটনকে আরো জানায় : বাংলাদেশে ভারতীয় সেনা হস্তক্ষেপের প্রস্তুতি বিষয়ে দিল্লিতে কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। কলকাতায় মার্কিন কনসাল জেনারেলের এক প্রশ্নের উত্তরে ভারতীয় সেনাবাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডার জেনারেল জ্যাকব ১৬ আগস্ট জানান : ভারতীয় সেনাবাহিনী বিশেষ কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করছে না।

জেনারেল জ্যাকবের মন্তব্য : ১৬ আগস্ট জেনারেল জ্যাকব এক ডিনার পার্টিতে ভারতে মার্কিন দূতাবাসের এক কর্মকর্তার কাছে বাংলাদেশের ঘটনাবলির বিষয়ে জানতে চান। এ ব্যাপারে কলকাতাস্থ মার্কিন কনসাল জেনারেলের কাছে যে রিপোর্ট রয়েছে সেটা তাকে অবহিত করে বলি, এ পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্যে প্রতীয়মান হয়, অভ্যুত্থান তেমন বিরোধিতা ছাড়াই সংঘটিত হয়েছে এবং পরিস্থিতি এখন শান্ত। জ্যাকব বলেন, তিনি ঢাকায় নয়, আশপাশের জেলাগুলোতে উল্লেখযোগ্য লড়াইয়ের বিষয়ে শুনেছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিবেদনে বলা হয় : জ্যাকব অভ্যুত্থানকে নিন্দনীয় বলে মনে করেন। তিনি বলেন, এখন বাংলাদেশে কোনো স্থিতিশীলতা থাকবে না। পাল্টা অভ্যুত্থান ও সংঘর্ষের আশঙ্কাও রয়েছে। তিনি বাংলাদেশকে ইসলামী প্রজাতন্ত্র ঘোষণার বিষয়ে ঢাকার নতুন প্রশাসনের অভিপ্রায় বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তার কাছে ভারতে বাংলাদেশ থেকে কোনো হিন্দু শরণার্থী আগমনের বিষয়ে কোনো তথ্য আছে কি-না জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, এ বিষয়টি এখনই বলা যাচ্ছে না। ভারতীয় সেনাবাহিনী কোনো বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করছে কি-না জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, বিশেষ কিছু না।

কলকাতায় ভারতীয় কনসুলেট অফিসের এক কর্মকর্তা ১৬ আগস্ট ওয়াশিংটনে জানান : বাংলাদেশের অভ্যুত্থানের বিষয়ে যাদের সঙ্গে কথা হয়েছে তারা সবাই এ ঘটনার নিন্দা জানান। তবে তাদের কেউই মনে করেন না যে, ভারতের বাংলাদেশ দখল করে নেওয়া উচিত।

নেপালে যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস থেকে ওয়াশিংটনে ২৫ আগস্ট যে বার্তা পাঠানো হয় তাতে বলা হয় : রাজা থেকে সাধারণ মানুষ পর্যন্ত সবাই জানতে চায় বাংলাদেশের ঘটনাবলিতে ভারত কতটা জড়িত হবে। ভারতের প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপ ঘটবে কি-না সেটাও তারা জানতে চায়। আমরা তাদের বলছি, সাম্প্রদায়িক হানাহানি না ঘটা এবং প্রতিদ্বন্দী সামরিক ইউনিটগুলোর মধ্যে সংঘাত না ঘটায় বর্তমান সময়ে ভারতের হস্তক্ষেপের সম্ভাবনা খুব কম। নেপালিরা বাংলাদেশে ক্ষমতা পরিবর্তনে যুক্তিসঙ্গতভাবেই সন্তুষ্ট। নেপাল সরকার চীন ও পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে মোশতাক সরকারের উদ্যোগকে স্বাগত জানায়। তবে নেপালিরা মুজিব এবং তার পরিবারের সদস্যদের নির্মমভাবে হত্যার নিন্দা করে।

ইন্দিরার কাছে মোশতাকের বার্তা : ২৬ আগস্ট নয়াদিল্লিস্থ ভারতীয় রাষ্ট্রদূত ওয়াশিংটনে জানান, ২৫ আগস্ট ভারতে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি খন্দকার মোশতাক আহমদের একটি বার্তা হস্তান্তর করেন। এতে বাংলাদেশের নেতা বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য দুই দেশের যৌথ সংগ্রামের কথা উল্লেখ করেন। তিনি ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে সম্পাদিত দ্বিপক্ষীয় চুক্তির প্রতি বাংলাদেশ সম্মান জানাবে বলে জানান।
রাষ্ট্রদূতের কাছে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপনে ভারতের আগ্রহের কথা ব্যক্ত করেন।
২৭ আগস্ট বাংলাদেশে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত বোস্টার যুক্তরাষ্ট্রকে জানান : ভারত সরকার বাংলাদেশের বিরুদ্ধে বৈরী প্রচারণার জন্য ভারতীয় সুবিধা ব্যবহার করতে না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। জানা গেছে, ভারতের তথ্যমন্ত্রী শুক্লা ২৪ আগস্ট বিদেশি সাংবাদিকদের জানান, আমরা আমাদের সুবিধাদি আমাদের বাংলাদেশের বন্ধুদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে দিতে চাই না। তিনি বাংলাদেশের ঘটনাবলি ভারতে প্রচারের বিষয়ে কিছু বিধি-নিষেধ আরোপের বিষয়েও বিদেশি সাংবাদিকদের অবহিত করেন।

এরই ধারাবাহিকতায় ২৭ আগ¯দ্ব খন্দকার মোশতাক আহমদ সরকারের প্রতি আসে ভারত সরকারের কাঙ্ক্ষিত স্বীকৃতি। ২৮ আগস্ট নয়াদিল্লিস্থ ভারতীয় দূতাবাস ওয়াশিংটনকে জানায় : ২৭ আগস্ট বিদেশ মন্ত্রণালয়ের একজন মুখপাত্র ঢাকার নতুন শাসকদের প্রতি ভারতের স্বীকৃতি প্রদানের বিষয়ে অবহিত করেন।
এর মধ্য দিয়ে ১৫ আগস্টের অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশে ভারতের ভূমিকা কী হবে সেটা নিয়ে জল্লনা-কল্পনার অবসান ঘটবে বলে ধারণা হতে পারত। কিন্তু পরবর্তী তিন দশকের বেশি সময়েও সেটা ঘটেনি। বাংলাদেশে ভারত সর্বদাই একটি ফ্যাক্টর রয়ে গেছে। বিশেষ করে অভ্যন্তরীণ রাজনীতির নানা সমীকরণে তাদের বারবার টেনে আনার জন্য একটি মহল বরাবরই সক্রিয়। এ ক্ষেত্রে ভারতকে কখনো কখনো এমন অবস্থানে রাখা হয়, যার সঙ্গে বাস্তবের মিল থাকে সামান্যই। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পর বাংলাদেশে ভারত সামরিক হস্তক্ষেপ করতে চলেছে বলে যে জুজু দেখানো হয়, সেটা ছিল এ ধরনেরই।
---------
সমকাল ১৬ আগস্ট

২২ আগস্ট, ২০০৮

ফয়েজ লেকের হত্যাকান্ড

এই অংশটুকু নেয়া হয়েছে রশিদ হায়দারের এডিট করা “১৯৭১: ভয়াভয় অভিজ্ঞতা” (ঢাকা, জাতীয় সাহিত্য প্রকাশনী, ১৯৮৯) বইয়ের আব্দুল গোফরানের “ফয়েজ লেকের গণহত্যা” অধ্যায় থেকে।

পাহাড়তলির আকবর শাহ মসজিদের কাছে আমার একটা দোকান ছিল। ১০ই নভেম্বর, ১৯৭১ সকাল ৬ টার দিকে প্রায় ৪০-৫০ জন বিহারি আমার দোকানে এসে জোর করে আমাকে নিয়ে যায়। তারা আমাকে ফয়েজ লেকে নিয়ে যায়। সেখানে আমি দেখতে পাই পাম্প হাউজের উত্তর পাশে লেকের ধারে অনেককে হাত বেঁধে রাখা হয়েছে। বিহারিদের হাতে ছুড়ি, তলোয়ার বা শার্প অন্য কোন অস্ত্র ছিলো। বিহারিরা প্রথমে বাঙ্গালিদের মারধোর করছিল আর অস্ত্রধারীদের কাছে নিয়ে যাচ্ছিল। একদল অস্ত্রধারী বিহারিরা অসহায় মানুষগুলোর পেটে ঘুষি মারছিল আর তলোয়ার দিয়ে মাথা বিচ্ছিন্ন করছিল। আমি বেশ কয়েক গ্রুপ বাঙ্গালিকে এভাবে মেরে ফেলতে দেখি। একজন বিহারি আমার দিকে আগায় আর আমার সোয়েটার খুলে নেয়। তখন আমি তাকে ঘুসি মেতে লেকে ঝাঁপ দেই। অন্যপাড়ে যেয়ে আমি খোপের আড়ালে লুকাই। তারা আমার খোঁজে আসলেও আমি ভাগ্যক্রমে লুকিয়ে থাকতে সক্ষম হই। ঝোপের আড়ালে থেকে আমি আরো অনেককে একইভাবে হত্যা করতে দেখি।

দুপুর দুইটা পর্যন্ত এই হত্যাকান্ড চলতে থাকে। এ সময়ের দিকে তারা ১০-১২ জন বাঙ্গালির একটি দলকে আনে। আর তাদেরকে দিয়ে গর্ত খুড়িয়ে লাশগুলো কবর দেয়ায় এবং তাদেরকেও মেরে ফেলে অবশেষে। তারপর আনন্দে চিৎকার করতে করতে বিহারিগুলো চলে যায়। তখনো অনেক লাশ আশেপাশে পড়ে ছিল।

সংগ্রহ করা হয়েছে সামহোয়ারইনব্লগ থেকে।
লিখেছেন: রাশেদ

২১ আগস্ট, ২০০৮

এক মৌলভির কথা

এই অংশটুকু নেয়া হয়েছে Amita Malik's The Year of the Vulture (New Delhi: Orient Longmans, 1972, pp. 102-4) থেকে। এটি শেখ মুজিবের নিজ গ্রামের কাহিনী।

১৯শে এপ্রিল, ১৯৭১ তারিখে সকাল ৮ টার দিকে প্রায় ৩৫ জন আর্মি লঞ্চে করে আমাদের গ্রামে আসে। কিছুদিন আগে আমি শেখের বাবা মাকে বলেছিলাম গ্রাম ছেড়ে যেতে কিন্তু তাঁরা রাজি হন নাই। আর্মিরা এসে আমাকে দেখতে পেয়ে জিজ্ঞাসা করে, এই মৌলভি, শেখের বাবা মা কোন বাড়িতে থাকে। আমি তাঁর বাবাকে ডেকে আনি। আমরা একটা চেয়ার দিয়েছিলাম কিন্তু আর্মিরা তাঁকে মাটিতে বসতে বাধ্য করে। তারপর শেখের মা আমার হাত ধরেন, আর আমি তাঁকে চেয়ারে বসতে সাহায্য করি। আর্মিরা শেখের বাবার পিঠে স্টেন গান আর আমার পিঠে একটি রাইফেল ধরে আর বলে দশ মিনিটের মাঝে তোমাদের মেরে ফেলবো।

তারা শেখের বাড়ি থেকে একটি ডায়েরি আর কিছু ঔষধ নেয়, আর আমার কাছে চাবি খুঁজে। আমি চাবি দিলে তারা ট্রাঙ্ক ভেঙ্গে তল্লাশি চালায়; যদিও পাঁচটি চামুচ ছারা আর কিছুই মেলে নাই। তারা একটি ছবি দেখে আমাকে জিজ্ঞাসা করে এটা কার। শেখ মুজিবের বলায় তারা সেইটাও নিয়ে যায়।

তারা আমাকে রাইফেল দিয়ে মেরে শেখের বাবার পাশে টেনে নেয় আর আবারো মেরে ফেলার হুমকি দেয়। আমি জিজ্ঞাসা করি শেখের বাবাকে কেন মারবে? তারা বলে “"Is lire, keonki wohne shaitan paida kira hai" ["Because he has produced a devil."]” আমাকে কেন মারবা যে কিনা মসজিদের ইমাম? তারা বলে “Aap kiska imam hai? Aap vote dehtehain" ["What sort of an imam are you? You vote."]” ক্যাপ্টেন তখন আরো বলে ৮ মিনিট গেছে আর ২ মিনিট পরে গুলি করা হবে। তখন একজন মেজর দৌড়ে আসে লঞ্চ থেকে আর নির্দেশ দেয় আমাদের না মারার। আর শেখের বাড়ি পুড়িয়ে দেয়া হয়।

আমি সাথে সাথে মসজিদে যায় আর প্রায় ৫০ জনের মত গ্রামবাসীকে দেখতে পাই। আর্মিরা এরই মধ্যে তিনজন বালককে টেনে বের করে গুলি করে মারে। খান সাহেব (শেখ মুজিবের চাচার) একজন কিশোর ভৃত্য ছিল এরশাদ নামে। আর্মিরা আমাকে তার কথা বললে আমি বলি যে সে একজন কাজের ছেলে। কিন্তু তখন এক রাজাকার মৌলভি (পাশের গ্রামের) বলে যে ঐ ছেলেটা শেখ মুজিবের আত্মীয় যা আদতে মিথ্যা ছিল। আর্মিরা এরশাদকেও লাইনে নিয়ে যায়। ছেলেটা পানি খেতে চাইলেও দেয়া হয় নাই। ঢাকা থেকে আসা একটি কিশোর যে সেখানে তার বাবার সাথে কাজ করতো তাকেও মেরে ফেলে আর্মিরা। এরশাদকে তার মায়ের সামনে গুলি করে মারে। গুলির পরে এরশাদ একটু নড়াচড়া করলে আবার তাকে গুলি করে। আর্মিরা ঐদিন মোট ছয়জন নির্দোষ কিশোরকে হত্যা করে কোন কারন ছাড়াই। তোরাব ইয়াদ আলীর মা বারবার বলেও ছেলেকে কবর দেয়ার জন্য নিয়ে যেতে পারেন নি, কারন আর্মিরা চাচ্ছিল এইসব মৃতদেহ দেখিয়ে সবাইকে ভয় দেখাতে। এই বিধবার ১০ বছরের সন্তান মিঠুকেও তারা গুলি করে। কারন ছিল মিঠু মুক্তি বাহিনীকে সাহায্য করেছিল।

সংগ্রহ করা হয়েছে সামহোয়ারইনব্লগ থেকে।
লিখেছেন: রাশেদ

২০ আগস্ট, ২০০৮

এক কর্মকর্তার স্ত্রী

এই অংশটুকু নেয়া হয়েছে Amita Malik's The Year of the Vulture (New Delhi: Orient Longmans, 1972, pp. 141-42) থেকে।

তিনি (২৫ বছর বয়স) ছিলেন এক সরকারী কর্মকর্তার স্ত্রী। তাঁর তিন ছেলেমেয়ে ছিল। আর্মিরা প্রথমে তাঁর স্বামীকে নিয়ে যায়, আর প্রায় অর্ধ মৃত অবস্থায় ফেরত দেয়। তারপর অন্য একদল আর্মি আসে সকাল ৮-৯ টার দিকে। আর তাঁকে রেপ করে তাঁর স্বামী সন্তানদের সামনে। তারপর আরো একদল আর্মি আসে দুপুর ২.৩০ টার দিকে আর তাঁকে তুলে নিয়ে যায়। এক ব্যাকারে আটকে রেখে তাঁকে বারবার রেপ করে প্রতি রাতে তিনি অজ্ঞান না হওয়া পর্যন্ত। তিন মাস পরে যখন তিনি ফিরে আসেন, তিনি ছিলেন প্রেগন্যান্ট। গ্রামের মানুষজন তাঁকে সহানুভুতি জানায় কিন্তু তাঁর স্বামী তাঁকে ফেরত নিতে অস্বীকার করে। গ্রামের মানুষ জোর করায় তাঁর স্বামী আত্মহত্যা করে। আমরা তাঁকে সাহায্য করার চেষ্টা চালাচ্ছি কিন্তু তিনি একটি কথাই বারবার বলে যাচ্ছেন “But why, why did they do it? It would have been better if we had both died”।

সংগ্রহ করা হয়েছে সামহোয়ারইনব্লগ থেকে।
লিখেছেন: রাশেদ