১৯ ডিসেম্বর, ২০০৮

নির্বাচনে যুদ্ধাপরাধী প্রার্থীরা -০২

এ এম রিয়াছাত আলী

সমকাল প্রতিবেদক

আশাশুনি ও শ্যামনগর উপজেলা নিয়ে গঠিত সাতক্ষীরা-৩ আসন থেকে চারদলীয় জোট প্রার্থী হয়েছেন জামায়াত নেতা এএম রিয়াছাত আলী। তার বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ রয়েছে। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে তিনি ছিলেন সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলার শান্তি কমিটির সেক্রটারি। রাজাকার হিসেবে পরিচিত এই জামায়াত নেতার বিরুদ্ধে একাত্তরে শ্যামনগর ও কালীগঞ্জ থানায় মুক্তিযোদ্ধাদের নির্বিচারে হত্যার অভিযোগ রয়েছে। নিহত এই মুক্তিযোদ্ধাদের একজন হলেন কালীগঞ্জের ইউনুস।

আশাশুনি ও শ্যামনগরের বাসিন্দারা জানান, একাত্তরের আগস্ট মাসে খুলনার কয়রা উপজেলার খুকরোঘাটি লঞ্চঘাটে মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে ধরা পড়েছিলেন স্থানীয় রাজাকার কমান্ডার রিয়াছাত। সেখান থেকে তাকে নেওয়া হয় কয়রার মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে। ক্যাম্পের দায়িত্বে ছিলেন তারই প্রতিবেশী বীর মুক্তিযোদ্ধা মতিয়ার রহমান। তখন রমজান মাস। মতিয়ারের মহানুভবতায় প্রাণভিক্ষা পান রিয়াছাত। নিরাপদে তাকে পৌঁছে দেওয়া হয় আশাশুনি উপজেলার প্রতাপনগর গ্রামের নিজ বাড়িতে। কিন্তু স্বাধীনতার ৩১ বছর পর আবারো পুরনো দিনে ফিরে যান রিয়াছাত আলী বিশ্বাস। অভিযোগ রয়েছে, একদিন যে মুক্তিযোদ্ধা তাকে প্রাণে বাঁচিয়েছিলেন, ২০০১ সালে সেই মতিয়ার রহমানের বাড়িতেই অগ্নিসংযোগ করেন তিনি।

যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ থাকলেও রাজনীতিতে রিয়াছাত আলী বিশ্বাস এখন বেশ শক্তিশালী। তাই এবারো তিনি চারদলীয় জোট থেকে মনোনয়ন পেয়েছেন। একই আসন থেকে পরপর দু’বার সাংসদ নির্বাচিতও হন তিনি। এর আগে একবার মেম্বার ও একবার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছিলেন। তার বাবা সাতক্ষীরার আশাশুনির কুড়িকাহনিয়া গ্রামের মৃত আলী বিশ্বাস পেশায় ছিলেন দর্জি।

রিয়াছাত আলী বিশ্বাসের জন্ম সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলার প্রতাপনগর গ্রামে। একাত্তরের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে সাতক্ষীরা জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড কাউন্সিলের সাবেক আহ্বায়ক মতিয়ার রহমান জানান, নদী পথে এ অঞ্চলের মানুষের নিয়মিত যোগাযোগ ছিল খুলনা শহরের সঙ্গে। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার পরপরই রিয়াছাত আলী বিশ্বাসের নেতৃত্বে গঠিত হয় শান্তি কমিটি। যুদ্ধ চলাকালে খুলনার পাকিস্তান সেনা ক্যাম্পের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করতেন রিয়াছাত। ’৭১-এর জুনে মেজর জলিলের লঞ্চডুবি হয় সুন্দরবন সংলগ্ন গাবুরা এলাকার খোলপেটুয়া নদীতে। কোনোভাবে নদী সাঁতরে প্রতাপনগর গ্রামে চলে আসেন ওই লঞ্চে থাকা বরিশাল অঞ্চলের নয় মুক্তিযোদ্ধা। কিন্তু রক্ষা পান না। খবর পেয়ে প্রতাপনগর ঘিরে ফেলে রাজাকার রিয়াছাত আলী ও তার লোকজন। নয় মুক্তিযোদ্ধাকে ধরে নিয়ে যান খুলনার পাকসেনা ক্যাম্পে। এরপর ওই নয় মুক্তিযোদ্ধার আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি।

মুক্তিযোদ্ধা মতিয়ার রহমান আরো জানান, রিয়াছাত আলীর সহযোগিতায় একাত্তরের জুলাই মাসে পাঞ্জাব রেজিমেন্টের পাকসেনারা গানবোটে চড়ে প্রতাপনগর গ্রামে হানা দেয়। তারা ওই গ্রামের খগেন্দ্র নাথ সরকারকে খুলনার ক্যাম্পে নিয়ে গুলি করে হত্যা করে। এর কিছুদিন পর একই গ্রামের সোহরাব ও জনাব আলীকে একইভাবে ধরে নিয়ে গুলি করে হত্যা করা হয় পাকিস্তানি সেনাক্যাম্পে। এ ছাড়া মুক্তিযুদ্ধের পুরো সময় খুলনা, বরিশাল, পটুয়াখালী ও বাগেরহাট এলাকার ভারতগামী শরণার্থীদের নৌকা আটকে লুটপাট করা ছিল রিয়াছাত আলী ও তার লোকজনের কাজ।

’৯১ সালে রিয়াছাত আলী বিশ্বাস প্রথম সাতক্ষীরা-৩ আসন থেকে জামায়াতের টিকিটে সাংসদ নির্বাচিত হন। ’৯৬ সালের নির্বাচনে পরাজিত হন আওয়ামী লীগ প্রার্থীর কাছে। তবে ২০০১-এর নির্বাচনে তিনি একই আসন থেকে আবার সাংসদ নির্বাচিত হন। নির্বাচিত হওয়ার মাত্র কয়েকদিনের মাথায় তারই ইন্ধনে জামায়াতের ক্যাডার বাহিনী মুক্তিযোদ্ধা মতিয়ার রহমানের বাড়ি লুটপাটের পর আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেয় বলে অভিযোগ রয়েছে। পরিবার-পরিজন নিয়ে পালিয়ে না গেলে সেদিন সপরিবারে প্রাণ হারাতেন মুক্তিযোদ্ধা মতিয়ার রহমান। আরো অভিযোগ রয়েছে, গত জোট সরকারের আমলে রিয়াছাত আলীর পরিবারের সদস্যরা যেন বেপরোয়া হয়ে ওঠে। ২০০১ সালের নির্বাচনের পর রাতারাতি দখল করে নেন মুক্তিযোদ্ধা মতিয়ার রহমানের দুটিসহ আওয়ামী সমর্থকদের কয়েকটি চিংড়ি ঘের। তিনি সাতক্ষীরা ও পাটকেলখাটায় নির্মাণ করেছেন বাড়ি। বড় ছেলে জুলফিকার হোসেন মাদ্রাসায় শিক্ষকতার পাশাপাশি ঘের ব্যবসা দেখাশোনা করছেন। মেজো ছেলে নুরুল আফছার সাতক্ষীরার বড় ব্যবসায়ী। রয়েছে একটি কম্পিউটার সার্ভিসিং সেন্টার ও আরএসও নামে একটি এনজিও। বড় ছেলের সরকারি খাল দখলের বিষয়টি আশাশুনিতে ব্যাপক সমালোচনার ঝড় তোলে। ১৯ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত আশাশুনি হাসপাতালের কাজের দরপত্রের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিএনপি নেতা বরুন কুমার বিশ্বাস। রিয়াছাত আলী অবশ্য এসব অস্বীকার করে বলেন, ‘স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় আমি রাজাকার বাহিনীতে যোগ দেইনি। পাকসেনাদের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক ছিল না। নানাজনের কানকথা শুনে মুক্তিযোদ্ধারা তাদের ক্যাম্পে ডেকে নিয়ে গিয়েছিল। পরে ছেড়ে দেওয়া হয়। এমপি হওয়ার পর কোনো অন্যায় কাজ করিনি। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরা আমাকে রাজাকার বানানোর চেষ্টা করছেন।

দৈনিক সমকাল, ১৮ ডিসেম্বর, ২০০৮

নির্বাচনে যুদ্ধাপরাধী প্রার্থীরা -০১

একাত্তরে বিতর্কিত ভূমিকা ও যাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ রয়েছে তারা এবারের জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও প্রার্থী হয়েছেন। বিএনপি ও জামায়াতের টিকিটে মনোনয়ন নিয়ে এখন তারা ঘুরে ফিরছে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা এবং স্বাধীনতা যুদ্ধের বিভিন্নদলিল ও বইপত্রে তাদের বিরুদ্ধে একাত্তরের পুরো ৯ মাসজুড়ে বাঙালি নিধন, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট ও পাকবাহিনীকে সহযোগিতার তথ্য-প্রমাণ মিলেছে। তারা ধর্মের নামে ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে দৃষ্টি ফেরাতে চাইছে একাত্তরের সেই হত্যাযজ্ঞ, নির্যাতন-নিপীড়নের চিত্র থেকে। ভুলে যেতে বলছে পেছনের কথা। বোঝাতে চাইছে মুক্তিযুদ্ধ তাদেরও ফসল। সমকালের অনুসল্পব্দানে সারাদেশে এ রকম অন্তত ১২ জনের নানা যুদ্ধাপরাধের তথ্য উঠে এসেছে। অনুসন্ধানে প্রাপ্ত তথ্য নেওয়া হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন ও একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল জাতীয় সমন্নয় কমিটি প্রকাশিত একাত্তরের ঘাতক দালাল ও যুদ্ধাপরাধীদের সম্পর্কে জাতীয় গণতদন্ত কমিশনের দুটি রিপোর্ট, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর প্রকাশিত ‘৭১ : গণহত্যার দলিল’, একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির প্রকাশিত ‘রাজাকারমুক্ত সংসদ চাই’ শীর্ষক পুস্তিকা এবং ওয়ার ক্রাইমস ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটির বিভিন্ন সময় প্রকাশিত গবেষণা প্রতিবেদন থেকে।

মতিউর রহমান নিজামী

সমকাল প্রতিবেদক

মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি হানাদারদের সহযোগিতা, বুদ্ধিজীবী হত্যা ও গণহত্যার সঙ্গে জড়িত অভিযোগে অভিযুক্ত যে ক’জন এবারের সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হয়েছেন জামায়াতের আমির মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী তাদের মধ্যে অন্যতম। তিনি এবার পাবনা-১ (বেড়া-সাঁথিয়া) আসনে জামায়াত তথা চারদলীয় জোট প্রার্থী। তার বিরুদ্ধে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় বাঙালি হত্যা, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট, পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে সহায়তা, রাজাকার বাহিনীর নেতৃত্ব দান এবং ধর্ষণ-নির্যাতনসহ নানা অপকর্ম চালানোর সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে। পাবনার সাঁথিয়া উপজেলার মন্মথপুর গ্রামের মৃত খন্দকার লুৎফর রহমানের ছেলে মতিউর রহমান নিজামী জোট সরকারের আমলে শিল্পমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।

এএসএম সামছুল আরেফিন তার ‘মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ব্যক্তির অবস্থান’ বইয়ে লিখেছেন, নিজামী মুক্তিযুদ্ধের সময় পূর্ব পাকিস্তান আলবদর বাহিনীর সর্বাধিনায়ক ছিলেন (পৃ-৪২৭)। ‘একাত্তরের ঘাতক দালাল ও যুদ্ধাপরাধীদের সম্পর্কে জাতীয় গণতদন্ত কমিশনের রিপোর্ট’-এ (সংক্ষিপ্ত ভাষ্য) বলা হয়েছে, ‘১৯৭১ সালে এ জামায়াত নেতা বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের বিরুদ্ধে তার যাবতীয় কর্মতৎপরতা পরিচালনা করেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি জামায়াতে ইসলামীর ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্র সংঘের সভাপতি ছিলেন। তার প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে মুক্তিযুদ্ধকে প্রতিহত এং মুক্তিযোদ্ধাদের নির্মূল করার জন্য আলবদর বাহিনী গঠন করা হয়। মতিউর রহমান নিজামী এই আলবদর বাহিনীর প্রধান ছিলেন। ... আলবদরের নেতারা বুদ্ধিজীবী হত্যার নীল নকশা প্রণয়ন করেন এবং তাদের নির্দেশে ডিসেম্বর মাসে ঢাকাসহ সারাদেশে শত শত বরেণ্য বুদ্ধিজীবীকে হত্যা করা হয়।’

নিজামী যে স্বাধীনতাবিরোধী ছিলেন মুক্তিযুদ্ধকালীন বহু দলিল থেকে তার প্রমাণ পাওয়া যায়। যেমন ১৯৭১ সালের ১৪ নভেম্বর দৈনিক সংগ্রামে প্রকাশিত এক নিবন্ধে নিজামী বলেন, ‘আমাদের পরম সৌভাগ্যই বলতে হবে, পাকবাহিনীর সহযোগিতায় এ দেশের ইসলামপ্রিয় তরুণ সমাজ বদর যুদ্ধের প্রস্তুতিকে সামনে রেখে আলবদর বাহিনী গঠন করেছে। সেদিন আর খুব দূরে নয়, যেদিন আলবদরের তরুণ যুবকরা আমাদের সশস্ত্র বাহিনীর পাশাপাশি দাঁড়িয়ে হিন্দু বাহিনীকে (শত্রুবাহিনী) পর্যুদস্ত করে হিন্দুস্তানের অস্তিত্বকে খতম করে সারা বিশ্বে ইসলামের বিজয় পতাকা উড্ডীন করবে।’ (সূত্র : গণতদন্ত কমিশন রিপোর্ট)।

জাতীয় গণতদন্ত কমিশন রিপোর্টে আরো বলা হয়েছে, ‘পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যারা যুদ্ধ করেছে তাদের ধ্বংস করার আহ্বান সংবলিত নিজামীর ভাষণ ও বিবৃতির বহু বিবরণ একাত্তরের জামায়াতে ইসলামীর মুখপাত্র দৈনিক সংগ্রামে ছাপা হয়েছে। যশোর রাজাকার সদর দফতরে সমবেত রাজাকারদের উদ্দেশ্য করে নিজামী বলেন, জাতির এ সংকটজনক মুহহৃর্তে প্রত্যেক রাজাকারের উচিত ঈমানদারির সঙ্গে তাদের ওপর অর্পিত এ জাতীয় কর্তব্য পালন করা এবং ওইসব ব্যক্তিকে খতম করতে হবে যারা সশস্ত্র অবস্থায় পাকিস্তান ও ইসলামের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত রয়েছে’ (পৃ ৫-৬)।

নিজামীর এলাকার লোকজনও নিজামীর বিরুদ্ধে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় হত্যা, লুটতরাজ ও নির্যাতনে জড়িত থাকার অভিযোগ করেন। যেমন ১৯৭১-এ ৭ নম্বর সেক্টরের মুক্তিযোদ্ধা আবদুল কুদ্দুস গণতদন্ত কমিশনকে জানিয়েছেন, তিনি আলবদর বাহিনীর একটি সমাবেশ ও গোপন বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে মতিউর রহমান নিজামীও উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে কোথায় কোথায় মুক্তিবাহিনীর ঘাঁটি এবং আওয়ামী লীগ নেতাদের বাড়ি আছে তা চিহ্নিত করা হয়। বৈঠকে নিজামী মুক্তিযোদ্ধাদের হত্যা, ঘাঁটি ধ্বংস এবং আওয়ামী লীগারদের শেষ করার নির্দেশ দেন। বৈঠকের পরদিন রাজাকার বাহিনীর সহযোগিতায় বৃশলিকা গ্রাম ঘিরে ফেলে গোলাগুলি, নির্যাতন ও লুটতরাজ করে এবং বাড়িঘর আগুনে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দেয় আলবদররা। নিজামীর বিরুদ্ধে একই অভিযোগ এনে সাঁথিয়ার মিয়াপুর গ্রামের মোঃ শাহজাহান আলী গণকমিশনকে জানান, যুদ্ধের সময় তিনি রাজাকারদের হাতে ধরা পড়লে আরো কয়েকজন আটক মুক্তিযোদ্ধার সঙ্গে তার গলায়ও ছুরি চালানো হয়েছিল। অন্যদের জবাই করা হলেও শাহজাহান আলী ঘটনাচক্রে বেঁচে যান। গলায় কাটা দাগ নিয়ে তিনি এখন পঙ্গু জীবনযাপন করছেন (জাতীয় গণতদন্ত কমিশন রিপোর্ট, সংক্ষিপ্ত ভাষ্য পৃ.-৬)।

সাঁথিয়ার শোলাবাড়িয়া গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা আবদুল কুদ্দুস বলেন, ‘১৯৭১ সালের ২৬ নভেম্ভর নিজামীর নির্দেশে এবং রাজাকার সাত্তারের নেতৃত্বে আলবদর ক্যাডাররা ধুলাউড়ি গ্রামে গণহত্যা চালায় এবং ৩০ জন মুক্তিযোদ্ধাকে হত্যা করে। বেড়া উপজেলার বৃশালিকা গ্রামের সোহরাব আলীকে মাওলানা নিজামীর নির্দেশে গুলি করে হত্যা করে রাজাকার বাহিনী। এছাড়া একই এলাকার প্রফুল্ল প্রামাণিক এবং তার ছেলে ষষ্টি প্রামাণিককে রাজাকার বাহিনীর সদস্যরা হত্যা করে এবং তাদের বাড়ি জ্বালিয়ে দেয়।’ ওই ঘটনার কয়েকজন সাক্ষী রয়েছেন বলে মুক্তিযোদ্ধা আবদুল কুদ্দুস জানান।

সাঁথিয়ার লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, নিজামীর নির্দেশে করমজা গ্রামে গণহত্যা চালায় জামায়াত নেতা সিরাজ ডাক্তারের ছেলে রফিকুন্নবী। এ ব্যাপারে ডা. সিরাজ ও রফিন্নবীকে আসামি করে ১৯৭২ সালে একটি মামলা হলেও পরে তা ধামাচাপা পড়ে যায়।

সাঁথিয়ার মিয়াপুর গ্রামের জামাল উদ্দিনের ছেলে মুক্তিযোদ্ধা শাহজাহান বলেন, ‘নিজামীর প্রত্যক্ষ মদদে মুক্তিযোদ্ধা বটেশ্বর, চাঁদ, দারা, শাহজাহান, মোসলেম ও আখতারকে আলবদররা হত্যা করে। তারা মুক্তিযোদ্ধা কবিরের গায়ে পেট্রোল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়।’ সাঁথিয়ার লোকজন জানান, স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় পাকিস্তানি বাহিনীর ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে কাজ করায় এলাকার লোকজন মতিউর রহমান নিজামীকে ‘মইত্যা রাজাকার’ বলেও ডাকেন।

বুদ্ধিজীবী হত্যার পর ১৯৭১ সালের ৪ ডিসেম্বর নিজামী মাওলানা সুবহান ও মাওলানা ইসহাকসহ পাকিস্তান হয়ে সৌদি আরব যান। সেখান থেকে তারা বাংলাদেশবিরোধী প্রচারণা চালাতে থাকেন। ১৯৭৭ সালে জিয়াউর রহমান ক্ষমতা গ্রহণের পর মাওলানা নিজামী পাকিস্তান হয়ে ব্রিটিশ এয়ারওয়েজযোগে ঢাকায় আসেন এবং মগবাজারে একটি ভাড়া বাসায় ওঠেন।

সাঁথিয়ার ক্ষেতুপাড়া গ্রামের রমিজ উদ্দিন জামায়াতের সমর্থক। তিনি বলেন, ‘জামায়াতের লুটপাট আর স্বজনপ্রীতির কারণে এখন জামায়াতের সমর্থক বলে পরিচয় দিতে লজ্জা করে।’

নিজামী বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের মন্ত্রী ছিলেন। তিনি মন্ত্রী থাকাকালে সাঁথিয়ার জামায়াত নেতা-কর্মীরা অন্য রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীদের ওপর নানা নির্যাতন চালায় বলে অভিযোগ রয়েছে। সাঁথিয়া উপজেলা জামায়াতের সাবেক আমির আবদুল কুদ্দুস, মাওলানা আবদুল মালেক, প্রফেসর মোহাম্মদ আলী, আকমল হোসেন, বেড়া উপজেলা জামায়াতের আমির আবু দাউদ, মকসুদ আহমেদ চৌধুরী ও জামায়াত নেতা রফিকুন্নবী এলাকায় নিজামীর প্রতিনিধিত্ব করেন। তাদের সম্পর্কে কোনো অভিযোগই নিজামী কানে তোলেন না। তারা স্থানীয়ভাবে নিজামীর ৬ খলিফা হিসেবে পরিচত। স্থানীয়দের অভিযোগ, সাঁথিয়া ও বেড়ায় সরকারি জায়গা দখল করে অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন নিজামীর সহযোগীরা। আলহেরা একাডেমী, ছোন্দহ কলেজ, জোড়গাছা কলেজ তার মধ্যে অন্যতম।

সাম্প্রতিক জরুরি অবস্থাকালে নিজামীর বিরুদ্ধে দুটি দুর্নীতির মামলা করা হয়। মামলা দুটি হলো বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি দুর্নীতি মামলা ও গ্যাটকো দুর্নীতি মামলা। গ্যাটকো দুর্নীতি মামলায় তিনি বেশ কিছুদিন কারাভোগ করেন। ওই মামলায় তিনি জামিনে রয়েছেন।

বর্তমান নির্বাচনের প্রার্থী হিসেবে নিজামী মনোনয়নপত্রের সঙ্গে দাখিল হলফনামায় বলেছেন, তার বিরুদ্ধে ফৌজদারি তিনটি মামলা রয়েছে। একটি মামলার কার্যক্রম ২০/০৫/০৭ তারিখে স্থগিত হয়েছে। অপর একটি মামলার কার্যক্রম ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ২ ও ৫ ধারা এবং জরুরি বিধিমালা আইনের-০৭ নং এর ১৫ বিধিমোতাবেক স্থগিত রয়েছে। এছাড়া অন্য মামলাটির কার্যক্রমও দুই মাসের জন্য স্থগিত রয়েছে, যা হাইকোর্ট বিভাগের ফৌজদারি মিস কেস নং-১৯৩২৭/০৮। বর্তমান তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলেই নিজামী দুর্নীতির অভিযোগের গ্রেফতার হন এবং কিছুদিন কারাভোগ করেন।

দৈনিক সমকাল, ১৮ ডিসেম্বর, ২০০৮

১৫ ডিসেম্বর, ২০০৮

শ্রীরামসি ও রানীগঞ্জের নির্মম হত্যাযজ্ঞের স্মৃতি আজো কাঁদায় জগন্নাথপুরবাসীকে

পাকিস্তানি হানাদারদের হাতে শহীদ হন ১৫৪ বাঙালি

সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি : মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ১৯৭১ সালের ৩১ আগষ্ট সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলার শ্রীরামসি গ্রামে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী যে জঘন্যতম গণহত্যা চালিয়েছিল তা আজও সবার মনে শিহরণ জাগায়। দুটি গ্রাম মিলিয়ে সেদিন পাকিস্তানি হানাদারদেও হাতে নির্মমভাবে শহীদ হন ১৫৪ জন।
এলাকাবাসী জানান, ৩১ আগস্ট বেলা ১০টার দিকে কয়েকটি নৌকা যোগে পাকিস্তানি সেনারা শ্রীরামসি বাজারে এসে আলবদর আল শামসদের এলাকার লোকদের বিদ্যালয়ে উপস্থিত করার জন্য নির্দেশ দেয়। পাকিস্তানি বাহিনীর নির্দেশে দেশীয় রাজাকাররা এলাকার সচেতন ও শিক্ষিত অশিক্ষিত যুবকদের ডেকে একটি রুমে জড়ো করে। সেখানে সবার হাত পেছনে নিয়ে বেঁধে ফেলা হয়। পরে শতাধিক শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী ও যুবককে বেঁধে নৌকায় নিয়ে গিয়ে এক সঙ্গে এলোপাতাড়ি গুলি ছুঁড়ে হত্যা করে পাকিস্তানি হানাদাররা। অন্যান্য দলকেও একইভাবে বেঁধে পার্শ্ববর্তী পুকুর পারে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে ব্রাশ ফায়ার করে পাষাণের মতো হত্যা করে নরপিশাচরা। আহত হয়ে যারা কোনো রকমে বাঁচার তাগিদে পুকুরে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন তাদের ওপরও পুকুর পার থেকে গুলি ছুঁড়ে কাপুরুষের মতো হত্যা করা হয়। শুধুমাত্র বয়সে যারা খুবই বৃদ্ধ তাদের প্রায় অক্ষত অবস্থায় ছেড়ে দেয় হানাদাররা। কেউ কেউ নরপশুদের অত্যাচার থেকে প্রাণ বাঁচাতে গ্রাম ছেড়ে অন্যত্র পালাতে সক্ষম হন।
পাকিস্তানি হানাদারদের নিষ্ঠুর এ হত্যাকাণ্ডে শহীদ হন ১২৪ জন বিভিন্ন বয়স ও পেশার লোক। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছেন শিক্ষক তহশিলদার, পোস্টমাস্টার, ডাক পিয়ন, ইউপি মেম্বার, ছাত্র যুবক, বৃদ্ধ, প্রবাসী ও বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষ। গুটি কতক আহত হয়ে বেঁচে যান। ঘাতকেরা এ বর্বর পৈশাচিক গণহত্যার পরও ক্ষান্ত হয়নি। শুর" করে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ। শ্রীরামসি বাজারে কেরোসিন তেল ছিটিয়ে প্রায় আড়াইশ থেকে তিনশ ঘরবাড়ি দোকানপাট জ্বালিয়ে দেয়। গুলির শব্দে ও আগুনের লেলিহান শিখা দেখে গ্রামবাসী ছুটে পালান। জনশূণ্য অবস্থায়ও পাকিস্তানি হানাদাররা গ্রামে হামলা চালিয়ে ঘরবাড়ি পুড়িয়ে ফেলে। হানাদার সৈন্যরা চলে যাওয়ার পর চারদিকে মৃতদেহ ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে থাকে। ভয়ে আতঙ্কে পালিয়ে যাওয়া গ্রামবাসীর কেউই প্রায় সপ্তাহ খানেক গ্রামে ফেরেননি। তখন শিয়াল, কুকুর ও শকুনেরা লাশ নিয়ে টানাটানি শুর" করে। এরপর আস্তে আস্তে লোকজন গ্রামে এসে ৪/৫ টি করে মৃতদেহ একেক গর্তে কবর দেন। শ্রীরামসি বধ্যভুমিতে শায়িত শহীদদের মধ্যে ৩৪ জনের নাম জানা গেছে। তারা হলেন মৌলানা আব্দুল হাই, সত্যেন্দ্র নাথ চক্রবর্তী, এহিয়া চৌধুরী, আশরাফ হোসেন, শফিকুর রহমান, ফিরোজ মিয়া, সুনু মিয়া, আলা মিয়া, সমুজ মিয়া, নজির মিয়া, আব্দুল মন্নান, ওয়ারিছ মিয়া, মানিক মিয়া, আব্দুল জলিল, দবির মিয়া, মরম উল্লাহ, মন্তাজ আলী, সওয়াব উল্লাহ, রইছ উল্লাহ, আব্দুল মজিদ, আব্দুল লতিফ, এখলাছ মিয়া, মোক্তার মিয়া, সমীর আলী, জহুর আলী, নুর মিয়া, আব্দুল মন্নান, আছা মিয়া, তৈয়ব আলী, রোয়াব আলী, মছদ্দর আলী, তোফাজ্জল আলী, ডা. আব্দুল মন্নান এবং রুপু মিয়া। অন্যান্য শহীদদের নাম পাওয়া যায়নি। গুলিবিদ্ধ হয়েও ঘটনাক্রমে ৮ জন বেঁচে যান। তারা হচ্ছেন জোয়াহির চৌধুরী, আলকাছ মিয়া, কফিল উদ্দিন, তপন চক্রবর্তী, সুন্দর আলী, আমজাদ আলী ও জাফর মিয়া। তারা আজো সেদিনের ঘটনার কথা মনে করে আঁতকে ওঠেন। ইতিহাসের কলঙ্কজনক ও জঘন্যতম এ গণহত্যার সংবাদ এ সময় বিবিসি থেকে প্রচার করে বিশ্ববাসীকে জানানো হয়। একই সময়ে জগন্নাথপুর থানার রাণীগঞ্জ বাজারেও তাণ্ডবলীলা চালায় পাকিস্তানি হানাদাররা। কিছুসংখ্যক আলবদর আলশামস ও রাজাকারদের সাহায্যে বাজারে আগুন জ্বালিয়ে দোকান ঘরবাড়ি ছারখার করে দেয় তারা। নৃশংসভাবে হত্যা করে ৩০ জনের মতো নিরীহ ও শান্তিপ্রিয় বাঙালিকে। মারাত্মক আহত হয়েও বেঁচে যান ৫ জন। প্রায় ২০০ দোকানপাট ভস্মীভূত হয়।
নিষ্ঠুর সে হত্যাযজ্ঞের শহীদদের স্মরণে শ্রীরামসি উচ্চ বিদ্যালয় প্রাঙ্গনে স্থানীয় মুক্তি সংগ্রাম স্মৃতি ট্রাস্ট একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মিত করেছে। প্রতি বছর এখানে শহীদদের স্মরণে বিভিন্ন অনুষ্ঠানমালার আয়োজন করা হয়। তবে শ্রীরামসি গ্রামকে শহীদনগর নামকরণ করতে এলাকাবাসী দীর্ঘদিন ধরে দাবি জানালেও তা আজো বাস্তবায়িত হয়নি।

সূত্র: ভোরের কাগজ, ১৫ ডিসেম্বর, ২০০৮

৫ ডিসেম্বর, ২০০৮

বাংলাদেশ জেনোসাইড স্টাডি গ্রুপ

BGSG বাংলাদেশের গণহত্যা নিয়ে একটি তথ্যসমৃদ্ধ আর্কাইভ তৈরি করেছে। Kean University বাংলাদেশের গণহত্যা নিয়ে নিয়ে কোর্স চালায় তার জন্য এই আর্কাইভের প্রয়োজন। কিন্তু এর পাশাপাশি এরা ইহুদি গণহত্যা ও অন্য গণহত্যা নিয়েও কাজ করার প্রত্যাশা করে। নিউ জার্সির Holocaust Commission এর সাথে এই আর্কাইভ সম্পর্কিত।
নিজেদের সম্পর্কে বর্ণনা করতে গিয়ে বলেছে
The group has Bangladesh genocide as its primary agenda; however, the group will also honor the issue of human rights and genocide in other countries. The goal of this organization is to work with the relevant organizations that work for human rights and voice against crime against humanity. Thus, the study and the work of this group shall not be limited only on Bangladesh Genocide.

BGSG বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন ধরণের সেমিনার, সিরিজ বক্তৃতা, আলোচনা সভা, মুক্তিযুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্থদের সাথে কিংবা তাদের পরিবারের সাথে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা বিনিময়, গণহত্যার ছবি নিয়ে প্রদর্শনীর আয়োজন, ভিডিও প্রদর্শনীর আয়োজন ইত্যাদি পদ্ধতিতে আন্তর্জাতিক বাতাবরণে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য কাজ করে।

বিস্তারিত তথ্যের জন্য BGSG'র ওয়েবসাইট ভ্রমণ করুন।

জনপ্রিয় পোস্টসমূহ