২০ আগস্ট, ২০০৮

এক কর্মকর্তার স্ত্রী

এই অংশটুকু নেয়া হয়েছে Amita Malik's The Year of the Vulture (New Delhi: Orient Longmans, 1972, pp. 141-42) থেকে।

তিনি (২৫ বছর বয়স) ছিলেন এক সরকারী কর্মকর্তার স্ত্রী। তাঁর তিন ছেলেমেয়ে ছিল। আর্মিরা প্রথমে তাঁর স্বামীকে নিয়ে যায়, আর প্রায় অর্ধ মৃত অবস্থায় ফেরত দেয়। তারপর অন্য একদল আর্মি আসে সকাল ৮-৯ টার দিকে। আর তাঁকে রেপ করে তাঁর স্বামী সন্তানদের সামনে। তারপর আরো একদল আর্মি আসে দুপুর ২.৩০ টার দিকে আর তাঁকে তুলে নিয়ে যায়। এক ব্যাকারে আটকে রেখে তাঁকে বারবার রেপ করে প্রতি রাতে তিনি অজ্ঞান না হওয়া পর্যন্ত। তিন মাস পরে যখন তিনি ফিরে আসেন, তিনি ছিলেন প্রেগন্যান্ট। গ্রামের মানুষজন তাঁকে সহানুভুতি জানায় কিন্তু তাঁর স্বামী তাঁকে ফেরত নিতে অস্বীকার করে। গ্রামের মানুষ জোর করায় তাঁর স্বামী আত্মহত্যা করে। আমরা তাঁকে সাহায্য করার চেষ্টা চালাচ্ছি কিন্তু তিনি একটি কথাই বারবার বলে যাচ্ছেন “But why, why did they do it? It would have been better if we had both died”।

সংগ্রহ করা হয়েছে সামহোয়ারইনব্লগ থেকে।
লিখেছেন: রাশেদ

১৮ আগস্ট, ২০০৮

নারী নির্যাতন

এই অংশটুকু নেয়া হয়েছে রশিদ হায়দারের এডিট করা “১৯৭১: ভয়াবহ অভিজ্ঞতা” (ঢাকা, জাতীয় সাহিত্য প্রকাশনী, ১৯৮৯) বইয়ের মো. আখতারুজ্জামান মন্ডলের “আমাদের মা বোন” অধ্যায় থেকে (পৃ. ১৯৭)।

আমরা ভুরুঙ্গামারি স্বাধীন করার জন্য ১১ই নভেম্বর থেকে পশ্চিম, উত্তর ও পূর্ব দিক থেকে একযোগে আক্রমণ শুরু করি। ইন্ডিয়ান বিমান বাহিনী ঐদিন সকালে উপর্যপুরি বিমান হামলা শুরু করে। ১৩ই নভেম্বরে আমরা নিকটবর্তী হই আর ইন্ডিয়ান বিমান বাহিনীও তাদের অ্যাটাক জোরদার করে। ১৪ তারিখ সকালে পাকিস্তানিদের গোলাগুলি বন্ধ হয়ে যায় আর আমরা ভুরুঙ্গামারিতে প্রবেশ করি জয় বাংলা বলতে বলতে। ৫০-৬০ জন পাকিস্তানি আর্মিকে আটক করি আর তাদের ক্যাপ্টেনকে (captain Ataullah Khan) পাই ব্যাঙ্কারে মৃত অবস্থায়। ঐ সময়েও সে এক মৃত নারীকে জড়িয়ে ধরেছিল। তাঁর সারা শরীরে নির্যাতনের দাগ। তাঁকে আমরা কবর দেই।

তখনো ভাবিনি আর কত নির্মম দৃশ্য দেখা বাকি আছে। ওয়্যারলেসে আমাকে সার্কেল অফিসে যেতে বলা হয়। সেখানে আমরা বেশ কিছু অল্প বয়সী নারীকে তালাবদ্ধ অবস্থায় পাই। তাদেরকে দরজা ভেঙ্গে আমরা মুক্ত করি। দরজা ভাঙ্গার পরে আমরা তাঁদেরকে নগ্ন, ধর্ষিত নির্যাতিত অবস্থায় দেখতে পাই। আমরা সাথে সাথে রুম থেকে বের হয়ে চারটা লুঙ্গি আর চারটা বেডশিট ছুড়ে দেই ভিতরে। আমরা তাদের সাথে কথা বলার চেষ্টা করি কিন্তু তাঁরা খুবই শকড অবস্থায় ছিলেন। একজন ছিলেন ছয় সাত মাসের প্রেগনেন্ট। একজন ছিলেন ময়মনসিংহের কলেজ ছাত্রী। তাঁদেরকে চিকিৎসার জন্য ইন্ডিয়ান আর্মির গাড়িতে করে ইন্ডিয়াতে নিয়ে যাওয়া হয়। আমরা রাস্তার আশেপাশে গর্তে অনেক খুলি আবিস্কার করি। খুলিগুলোতে লম্বা চুল আর ছেঁড়া শাড়ি পেচানো ছিল, অনেকের হাতে চুড়ি ছিল। ভুরুঙ্গামারি হাই স্কুলের একটি রুমে ১৬ জন নির্যাতিত নারীকে উদ্ধার করি। আশেপাশের প্রাম থেকে তাদের নিয়ে আসা হয়েছিল। সার্কেল অফিসের বিভিন্ন রুমে আমরা অনেক প্রমান পাই যে নারীদের জানালার সাথে বেঁধে রেখে বারবার রেপ করা হয়েছিল। পুরা মেঝে ভরে ছিল রক্তে, লম্বা চুলে আর ছেঁড়া কাপড়ে।

সংগ্রহ করা হয়েছে সামহোয়ারইনব্লগ থেকে। লেখক: রাশেদ

১৬ আগস্ট, ২০০৮

গণহত্যার ভিডিও

সংগ্রহ করা হয়েছে সামহোয়ারইনব্লগ এবং সচলায়তন থেকে। লেখক: রাশেদ

ড. নূরুল উলার ডকুমেন্টারি

এই অংশটুকু নেয়া হয়েছে Amita Malik's The Year of the Vulture (New Delhi: Orient Longmans, 1972, pp. 79-83) থেকে।

শিক্ষকদের অন্তেস্টিক্রিয়ার সময়ে বাংলা ডিপার্টমেন্টের প্রফেসর রফিক উল ইসলাম আমাকে ফিসফিস করে বলেন যে টিভি স্টেশনে একটি ডকুমেন্টারি আছে ২৫ শে মার্চের গণহত্যার। সাথে সাথে আমি জামিল চৌধুরিকে জিজ্ঞাসা করি এই ব্যাপারে। তিনি আমাকে কনফার্ম করেন ব্যাপারটা। তিনি আরো জানান ইঞ্জিনিয়ারিং ইউনিভার্সিটির একজন প্রফেসর এই ভিডিওটি ধারন করেছিলেন। ৫ই জানুয়ারিতে আমি অনুমতি পাই টিভি কেন্দ্রে এই ভিডিওটি দেখার।

প্রায় ২০ মিনিটের এই ভিডিওটিতে দেখা যায় জগন্নাথ হল থেকে লাশ বয়ে কিছু মানুষ বের হচ্ছে। লাশগুলো বেশ সারিবদ্ধভাবে রাখা হয়। এভাবে আস্তে আস্তে লাশের স্তুপ করে ফেলা হয়। শেষ হবার পরে যারা লাশগুলো বয়ে এনেছিল তাদেরকে লাইনে দাঁড় করিয়ে রেখে গুলি করে মেরে ফেলা হয়।

এই ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ (ইলেকট্রিক্যাল ডিপার্টমেন্টের শিক্ষক ড. নূরুল উলার নিজের ভাষায় বলে যাওয়া) লিখেছেন এম. এম. আর. জালাল


গণহত্যার ছবি
নূরুল উলা

একাত্তরের পঁচিশে মার্চ রাতে একটু তাড়াতাড়ি ঘুমাতে গিয়েছিলাম । সেদিন খবরের কাগজে পড়েছিলাম বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে ইয়াহিয়া খানের সমঝোতা আসন্ন । তাই সবাই একটু নিশ্চিন্ত ছিলাম । মাঝরাতে প্রচন্ড এক বিস্ফোরণে ঘুম ভেঙ্গে গেল।

একটু বিরতির পরই শুরু হলো অবিরাম গোলাগুলি আর মর্টারের আওয়াজ । আমরা সবাই শোবার ঘর আর বাথরুমের মাঝামাঝি প্যাসেজে আশ্রয় নিলাম ছিটকে-আসা কোনো বুলেট থেকে রক্ষা পাবার আশায় । একটু পরে কৌতূহল সংবরণ করতে না পেরে হামাগুড়ি দিয়ে জানালার কাছে গিয়ে বাইরে কি হচ্ছে তার একটা আভাস নেবার চেষ্টা করলাম।

আমি তখন থাকতাম ফুলার রোডে পুরাতন এ্যাসেম্বলি হলের উল্টোদিকে, প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকদের তৈরী চারতলার ফ্লাটে । আমার জানালা থেকে জগন্নাথ হল ছাত্রাবাস আর তার বিরাট মাঠ সরাসরি চোখে পড়ে । সে রাত ছিলো নিশ্ছিদ্র অন্ধকার, কিন্তু তার মাঝেও বুঝলাম জগন্নাথ হল ছাত্রাবাস আর তার চারপাশের রাস্তাগুলো মিলিটারি ছেয়ে গেছে । কিছু পরে দেখলাম হলের কতকগুলো ঘরে আগুন ধরে গেল । সেই আলোয় আবার দেখলাম কিছুসংখ্যক সৈন্য টর্চ হাতে প্রতিটি ঘরে তল্লাশি চালাচ্ছে । বেশিক্ষণ তাকাবার ভরসা পেলাম না । করিডোরে ফিরে এসে গোলাগুলির শব্দের মধ্যেই জেগে সারারাত কাটিয়ে দিলাম।

ভোর হতেই আবার উঁকি মেরে দেখলাম, কোথাও কাউকে চোখে পড়লো না; কেবল রাস্তায় পড়ে আছে অনেক ইটের টুকরো আর মাঠের ওপর বিছানো দুটো বড় বড় সাদা চাদর । কিছুটা আশ্বস্ত হলাম এই ভেবে যে তেমন বেশি খুন-জখম হয়তো হয়নি।

কিন্তু এরপরই যে দৃশ্যের অবতারণা হলো; কোনদিন কল্পনা করিনি সে দৃশ্য আমাকে জীবনে কখনো দেখতে হবে; আর কামনা করি, এরকম ভয়াবহ ঘটনা যেন কাউকে স্বচক্ষে দেখতে না হয়।

তখন বেশ সকাল হয়ে গেছে। মাঠের পশ্চিমদিকে অর্থাৎ যেদিকে জগন্নাথ হলের প্রধান ছাত্রাবাস, সেদিক থেকে হঠাৎ আবির্ভূত হলো জনাবিশেক পাকিস্তানী সৈন্য, সঙ্গে দু'জন আহত ছাত্র। ছেলে দুটোকে সৈন্যরা বেশ যত্ন করেই কাঁধে ভর দিয়ে এনে চাদর দুটোর পাশে বসাল– মনে হলো হাসপাতালে নিয়ে যাবে। একটু পরই চাদর দুটো টেনে সরিয়ে ফেলল – দেখলাম চাদর দিয়ে ঢাকা ছিলো বেশ কয়েকটি মৃতদেহ।

আহত ছেলে দুটো বসেছিলো পূর্ব দিকে মুখ করে, লাশগুলো তাদের পেছনে। দুজন সৈন্য আরেকটু পূর্বে সরে গিয়ে তাদের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে তাদের দিকে উচিয়ে ধরলো হাতের রাইফেল – কয়েক মুহূর্তের জন্য দেখলাম ছেলে দুটো হাত বাড়িয়ে কাকুতি-মিনতি করছে। তার পরই চললো গুলি।

কোন সৈন্য দুটো কিংবা তিনটার বেশী গুলি খরচ করেনি। শেষের গুলিটা করলো শুয়ে থাকা লাশের ওপর মৃত্যু সুনিশ্চিত করার জন্য। ওদের হাতে যে আগ্নেয়াস্ত্র ছিলো সেটা মাঝারি ধরনের আর তা থেকে যে গুলি বেরিয়েছে তার শব্দ তেমন প্রচন্ড নয়।

জীবনে এই প্রথম স্বচক্ষে মানুষ মারা দেখলাম, আর সেটাও আহত লোককে ঠান্ডা মাথায় গুলি করে মারা। মানসিক শক পূর্ণভাবে উপলদ্ধি করার আগেই নিজের নিরাপত্তার কথা ভাবতে হলো - কারণ তখন রাস্তা দিয়ে সামরিক গাড়ী মাইকে কারফিউ এর ঘোষণা প্রচার করতে করতে গেল আর সেই সঙ্গে জানিয়েও গেল কেউ যেন জানালা দিয়ে বাইরে না তাকায় । কিন্তু তাকানো বন্ধ করলাম না, কারণ আমার দৃঢ় বিশ্বাস ছিলো যে, যদি জানালার কাঁচ বন্ধ রাখি আর ঘরে কোন আলো জ্বালানো না থাকে তাহলে বাইরে থেকে কিছু দেখা যাবে না। কেবল আশা করছিলাম সবচাইতে খারাপ যা হবার তা হয়ে গেছে, আর কিছু ঘটবে না, আর কিছু দেখতে হবে না। তখনও জানতাম না এ কেবল আরম্ভ।

অল্পক্ষণ পরে, কিছু সৈন্য আরো কয়েকজন আহত লোক নিয়ে এলো, এবারও পশ্চিম দিকের ছাত্রাবাস থেকে । তাদের ঠিক আগের মতন অর্থাৎ লোকগুলোর কাছে নিয়ে এসে আগ্নেয়াস্ত্র উঁচিয়ে ধরল। তারপর শুরু হলো গুলি, অনেকটা এলোপাথাড়ি। কেউ বসে ছিল, কেউ দাঁড়িয়ে, তাদের ওপর সামনে, বেশ কাছাকাছি থেকে গুলি চালাচ্ছে । আর পেছন থেকে উঠছে ধূলি । বুঝলাম কিছু গুলি দেহ ভেদ করে মাটিতে ঠেকছে। মাঠের ওপর পড়ে থাকা লোকের সংখ্যা বাড়তে থাকল।

পরবর্তীকালে বিদেশী টেশিভিশনের সাংবাদিকরা আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, সেই সময় আমার মানসিক অবস্থা কেমন ছিল, আর কি করে আমার মাথায় এই হত্যাকান্ডের ছবি তোলার চিন্তা মাথায় এল। আসলে ছবি তোলার আইডিয়া আমার নয়। পর পর দু”বার এভাবে আহত আর নিরস্ত্র মানুষদের ঠান্ডা মাথায় খুন করা দেখে বুঝলাম আরো খুন হবে, আজ একটা সামগ্রিক গণহত্যা হবে। তখন বোকার মত বলে উঠলাম - আমাদের হাতেও যদি অস্ত্র থাকতো। তখন পাশ থেকে আমার চাচাতো ভাই নসীম বলে উঠলো - ভাইজান, ছবি তোলেন।

তখন মনে পড়লো আমার বাসায় ভিডিও ক্যামেরাসহ একটা ভিসিআর আছে। জাপানে তৈরী প্রাথমিক যুগের এই পোর্টেবল ভিসিআর ছিল বেশ ভারি আর আমার জানামতে দেশে প্রথম। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ক্যামেরা সেট করে একটা কালো কাগজ ফুটো করে ক্যামেরার লেন্সটা তার মাঝে গলিয়ে দিয়ে জানালার কাচের ওপর রাখলাম। ঠিক যতটুকু ক্যামেরার লেন্স, বাদবাকী পর্দা দিয়ে ঢাকা থাকল আর জানালা সামান্য ফাঁক করে সরু মাইক্রোফোনটা একটু বের করে রাখলাম । ইতোমধ্যে আরো-দুটো ব্যাচকে ধরে এনে হত্যা করা হয়েছে। ছবির রেকর্ডিং-এ ধরা পড়েছে বাদবাকী তিনটি গণহত্যা। এর মধ্য সবচাইতে ভয়াবহ ছিল শেষেরটি।

তখন বন্দী আনা শুরু হয়েছে মাঠের পূর্বদিক থেকে। যাদের নিয়ে আসা হচ্ছে তাদের পরনে লুংগী, গেঞ্জি অথবা খালি গা। বুঝলাম সব ঘুমন্ত অবস্থায় ধরা পড়েছে। আগের লাশগুলোর কাছে নিয়ে এসে ওদের ওপর গুলি করা হচ্ছে।

এরপর মাঠ হঠাৎ করে ফাঁকা হয়ে গেল। ইতোমধ্যে মাঠে বেশ কিছু লাশ জমে উঠেছে । ভাবলাম এবার বুঝি এই হত্যাযজ্ঞের শেষ। কিন্তু না, একটু পরে দেখলাম প্রায় জনা চল্লিশেক অস্ত্রধারী সৈন্য মাঠের উত্তরদিকে লাইন করে দাঁড়াল। এরা ছিলো লম্বা আর ফরসা, মনে হলো পাঞ্জাবী সৈন্য। এরা কিন্তু কখনই প্রত্যক্ষভাবে হত্যাকান্ডে অংশগ্রহণ করেনি। যারা গুলি চালিয়েছিলো তারা ছিল অপেক্ষাকৃত বেঁটে আর কালো। এবার এমনি ধরনের জনা-দশেক সৈন্য মাঠের পূর্বদিক থেকে আবির্ভূত হল, সঙ্গে প্রায় পঁচিশ-ছাব্বিশজন মানুষ। ভাবলাম বোধ হয় লাশ সরাবার জন্য এনেছে।

কিন্তু মানুষগুলো পড়ে থাকা লাশগুলোর কাছে আসার সাথে সাথে ওদের সঙ্গের সৈন্যরা আবার একটু পূর্বদিকে সরে গিয়ে রাইফেল তাক করল। কিছুক্ষণের জন্য চারদিক স্তব্ধ। এর মধ্যে দেখলাম একজন লোক, মুখে তার দাড়ি, হাঁটু গেড়ে বসে করজোরে প্রাণভিক্ষা চাইছে। তারপরই শুরু হলো গুলি। গুলির পর গুলির বর্ষণ হচ্ছে আর মানুষগুলো মাটিতে লুটিয়ে পড়ছে আর তাদের দেহ-ভেদ-করা গুলির আঘাতে মাঠ থেকে উঠছে ধূলা।

গুলি যখন থামলো দেখলাম একমাত্র দাড়িওলা লোকটা তখনো বেঁচে আছে। মনে হলো ওর দিকে সরাসরি কেউ গুলি চালায়নি । লোকটা আবার হাতজোড় করে প্রাণভিক্ষা চাইতে শুরু করল। একজন সৈন্য তার বুকে লাথি মেরে তাকে মাটিতে শুইয়ে দেবার চেষ্টা করল। কিন্তু লোকটা তবু হাঁটু গেড়ে রইল । তখন তার ওপর চালালো গুলি। তার মৃতদেহ আর সবার সাথে একাকার হয়ে গেল।

মাঠের উত্তরদিকে যে সৈন্যরা এতক্ষণ লাইন দিয়ে দাঁড়িয়েছিল তারা এখন সংঘবদ্ধভাবে চলে গেল। আর হত্যাকান্ডে অংশগ্রহণকারী সৈন্যদের কেউ কেউ পড়ে থাকা দেহগুলোর চারপাশে ঘুরে ঘুরে মনোযোগের সঙ্গে দেখল আর মাঝে মাঝে শেষবারের মতো গুলি করল মৃত্যু নিশ্চিত করার জন্য।

কিছুক্ষণ পর সব সৈন্য চলে গেল। চারদিক নিস্তব্ধ আর ফাঁকা, কেবল জগন্নাথ হলের মাঠের ওপর পড়ে আছে অসংখ্য লাশ। দেখলাম রাস্তার ওপর দিয়ে একটা ভ্যান চলে গেল, তার ওপরে একটা গোল এন্টেনা ঘুরছে। বুঝলাম মাইক্রোওয়েভ ডিটেক্টর, কেউ কোন কিছু ব্রডকাস্ট করছে কিনা ধরার জন্য। আমি জানি আমার ভিডিও ক্যামেরা থেকে সামান্য কিছু তরঙ্গ ছড়াতে পারে, তাই তাড়াতাড়ি সেটা অফ করলাম।

ভিডিও টেপ রিওয়াইন্ড করে চেক করে যখন দেখলাম সব ছবি ঠিকমতো উঠেছে তখন সেটা খুলে ভিতর থেকে যন্ত্রাংশ সরিয়ে নিয়ে সেটাকে অকেজো করে দিলাম। বেলা তখন দশটার বেশী হবে না। যেকোনো সময় আমাদের ওপর হামলা হতে পারে আশঙ্কায় ওখানে বেশিক্ষণ থাকা সমীচীন মনে করলাম না। কারফিউ সত্ত্বেও আমরা আত্মীয়-স্বজন ও পরিবার নিয়ে এলাম পুরনো ঢাকায়। আসার ঠিক পূর্ব মুহূর্তে অর্থাৎ বেলা একটার দিকে একটা বুলডোজার দিয়ে মাটি খুঁড়তে দেখেছি। কিন্তু তারপর সেখানে কি হয়েছে বলতে পারব না । অনুমান করি, লাশগুলো পুঁতে ফেলার উদ্দেশ্যেই মাটি খোঁড়া হচ্ছে। স্বাধীনতা লাভের পর জেনেছি, আমার অনুমান ছিলো সত্যি।

১৫ আগস্ট, ২০০৮

১৯৭১-এ দৈনিক সংগ্রাম (পর্ব-৩)

১৬ এপ্রিল
“জনতা পাকিস্তান চায়” শিরোণামে সম্পাদকীয়তে লেখা হয়, "পূর্ব পাকিস্তানকে হিন্দভূমি বানানোর ভারতের চরম ষড়যন্ত্রের জবাব দিবে পাকিস্তানের জনগন। জনগন পাকিস্তানকে পাকিস্তান রূপেই দেখতে চায়।” জনগনের নাম বিক্রি করে দৈনিক সংগ্রাম সবসময় এধরণের সংবাদ ছাপতো। অথচ তারা এও জানতো যে, তখন প্রতিদিন যে হারে দৈনিক সংগ্রাম পোড়ানো হতো তাতে এক পরিবারের ৫ বছরের রান্নার লাড়কির যোগান হয়ে যেত।

১৭ এপ্রিল
শান্তি কমিটির করা মিছিলের ভূয়সী প্রসংশা করে এ দিনও বেশ কয়টি রিপোর্ট করা হয়। এমনই একটি রিপোর্টে বলা হয় “ পাকিস্তান রক্ষার সংগ্রাম সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে। শান্তি কমিটি গঠনের পর পুরো পূর্ব পাকিস্তানের জনগন এখন একই পতাকাতলে ঝড়ো হচ্ছে। পূর্ব পাকিস্তানের জনগন ফুঁসে উঠেছে ভারতীয় ষড়যন্ত্রের জবাব দিতে।” বস্তুত দৈনিক সংবাদ অতিরঞ্জিত এবং অবাস্তব সংবাদ প্রকাশ করে বাংলাদেশের জনগনকে বিভ্রান্ত করার অপচেষ্টা চালাতো।
একই দিন পুরো পূর্ব পাকিস্তানে এরকম শান্তি কমিটি গঠনের জন্য জামায়াতে ইসলামী এবং মুসলিম লীগকে আহবান জানানো হয়। এ বিষয়ে লিখতে গিয়ে মোট ৩৭ বার জিহাদ এবং মুজাহিদ শব্দটি উল্লেখ করা হয়।দৈনিক সংগ্রাম একাত্তরে সংবাদ প্রচারের ক্ষেত্রে ভারতকে বল্লম এবং ইসলামকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করতো। যদিও বাংলাদেশীরা প্রমান করেছিলো, বাংলাদেশীরা বাস্তবিক অর্থেই শত্রু সম্পর্কে সম্যক ধারণা রাখে। যেমন আজ এই ২০০৮ সনে এসে কি আমরা যুদ্ধাপরাধীদের নিয়ে সোচ্ছার নই?

১৮ এপ্রিল
“শেখ মুজিবের রেফারেন্ডম ছিলো স্বায়ত্বশাসন, স্বাধীনতা নয়” বোল্ড হরফে বড়সড় একটা আর্টিকেল লেখা হয় উপ-সম্পাদকীয়তে। যেখানে শেখ মুজিবের নামে কল্পনা প্রসূত সব অবাস্তব এবং অবান্তর কথা লেখা হয়। বলা হয়, “শেখ মুজিব সত্যিকার অর্থের ভারতীয় দালাল এবং আন্তর্জাতিক জঙ্গী গোষ্ঠীর ক্ষমতা লোলুপ এজেন্ট। দেশের জনগনকে মুক্তির কথা বলে অত্যুক্তির বুলি শিখিয়ে ভারতের গোলাম বানিয়ে রাখার এক অভিনব নকশা তৈরী করেছে ভারতের দালালেরা। বাংলাদেশের জনগন এখন ইতিহাসের দ্বিতীয় মীরজাফরকে দেখতে পাচ্ছে। মুজিবকে সাথে নিয়ে নয়াদিল্লির ষড়যন্ত্র দেখে মনে হচ্ছে আগরতলা ষড়যন্ত্রও সত্যিকারের ঘটনা ছিলো।”

১৯ এপ্রিল
১৮ এপ্রিল ঢাকাতে জয়বাংলা শ্লোগানে বিশাল এক মিছিল বের করে মুক্তি কামী জনগন। যেখানে জয়বাংলা লেখা খচিত লাল সবুজ পতাকা বহন করা হয় এবং কাযেদে আজমের ছবি পদদলিত করা হয় এবং পোড়ানো হয়। এ ঘটনার পরেই দৈনিক সংগ্রামের খবর প্রকাশের ধারা পাল্টে যায়। কারণ, বিদেশী মিডিয়া এই মিছিলের বেশ কভারেজ দেয়। ১৯ এপ্রিল প্রকাশিত প্রায় সব খবরের মর্মার্থ ছিলো, “পুরো পূর্ব পাকিস্তান ভারতীয় অনুপ্রবেশে ভরে গেছে। পথে পথে এখন ভারতীয় গুপ্তচর। ভারত থেকে লোক আনিয়ে মছিল করানো হয়েছে ঢাকার পথে পথে।” পাকিস্তান সেনা বাহিনীকে উদ্দেশ্য করে বলা হয় “ সময় এসেছে নড়েছড়ে বসার। পুরো পাকিস্তানকে ভারতীয় চর মুক্ত করতে হবে।”

২০ এপ্রিল
“জামায়াতে ইসলামী এবং মুসলিম লীগ আগেই সতর্ক করে আসছিলো” নামের উপসম্পাদকীয়তে উল্লেখিত দল সমূহের আগাম সতর্কবাণী সম্পর্কে একটি হায়! হায়!! লেখা ছাপা হয়।
প্রাক নির্বাচনী সতর্কবাণীর বিবরণ দিতে গিয়ে বলা হয়, “জামায়াত এবং মুসলিম লীগ নির্বাচনের আগেই ভারতের ষড়যন্ত্রের বিষয়ে জনগনকে সতর্ক করে আসছিলো। কিন্তু জনগন তাতে কান দেয়নি। এখন কেন পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর সামনে এমনভাবে কাতরাচ্ছে? দু’শ বছর ব্রিটিশ শাসনে থেকেও জনগন ভাবতে পারেনি যে, এই পূর্ব পাকিস্তানে শেখ মুজিবের মতো আরো এক মীরজাফরের জন্ম হয়েছে। এই মূহুর্তে পূর্ব পাকিস্তানের উচিত হবে ভারতীয় অনুপ্রবেশকারী এবং দেশীয় দালাল, মীরজাফরদের ধরে ধরে সেনাবাহিনীর হাতে তুলে দেওয়া। আমরা গত পহেলা মার্চ থেকে তাদের জয় বাংলা শ্লোগান শুনতেছি এবং তাদের লুন্ঠন, অত্যাচার, রাহাজানি স্বচক্ষে দেখতেছি”

২১ এপ্রিল
এদিন সম্পাদকীয়তে বেশ জোরালো ভাবে বাংলাদেশীদের ধ্বংসের পক্ষে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর নিকট আহবান জানানো হয়। “প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে সেনাবাহিনীকে ছড়িয়ে দেয়ার সময় এসেছে” টাইটেলে শক্তভাবে এবং অত্যন্ত প্রয়োজনীয় উল্লেখ করে লেখা হয় “ একটি দেশ জন্ম নিতে এবং পরাধীনতা স্বাধীন হতে কয়েকশ বছর লেগে যায়, কিন্তু সে দেশ পরাধীন হতে যেন একদিনও লাগে না। ব্রিটিশরা বিদায় নেয়ার পর এখন নতুন করে ভারতীয়রা চাচ্ছে পূর্ব পাকিস্তানকে দখল করে তাদের দাস বানাতে। কারণ পূর্ব পাকিস্তানের জনগন অধিক পরিশ্রমী এবং মেধাবী। আমাদের আছে সুদক্ষ সেনাবাহিনী। তারা এবার ছড়িয়ে পড়ুক পূর্ব পাকিস্তানের প্রত্যন্ত অঞ্ছলে, যেখানে তাদেরকে সাহায্য করবে এ প্রদেশের দেশপ্রেমিক জনগন।”

তথ্যসূত্র: সামহোয়ারইনব্লগ

জনপ্রিয় পোস্টসমূহ